১৭ আগস্ট ২০২২
`

অঝোরে কাঁদলেন যে জল্লাদ

-

‘জল্লাদ’ শব্দটি খুব ভয়ঙ্কর। জল্লাদদের খুব নির্মম, অমানবিক, পাষাণ ও ভয়ঙ্কর হিসেবে কল্পনা করতাম। কিন্তু ভুলটা ভেঙে গেল বাংলাদেশের সবচেয়ে এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জল্লাদ, যে এরই মধ্যে ৫৩টি ফাঁসি কার্যকর করেছে এবং যে সবচেয়ে আলোচিত দীর্ঘমেয়াদি ৪০ বছর ধরে কয়েদি হিসেবে কারাবন্দী, সেই শাহজাহানকে দেখে। পাশের বাড়ির মেয়েকে ভালোবেসে ব্যর্থ হয়ে গ্রাম ছেড়ে পা বাড়িয়েছিল অপরাধ জগতে। অস্ত্র¿, খুন, ডাকাতি খুব অল্পসময়ে সব জায়গায় বিচরণ ছিল তার। যুবক বয়সের অপরাধ এখনো কুরে কুরে খায় তাকে। কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী শাহজাহান জানান, অপরাধ করেছি সত্য কিন্তু কখনো নৈতিকতা বিচ্যুতি হয়নি। দীর্ঘ কারাবন্দী জীবনে চরম অভাব অনটনের মধ্যেও কোনো হাজতির কাছ থেকে অন্যায় সুবিধা নেইনি, বরং নিজের প্রাপ্ত খাদ্যের অংশ হতদরিদ্র অসহায় বন্দীদের মাঝে মধ্যে বণ্টন করে দেই। খোঁজ নিয়ে দেখুন, কয়েদিদের বিশেষ সুবিধা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলেই আছে কিন্তু আমি তা কখনো গ্রহণ করেনি। এর দরুন আমার শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ৭১ বছর বয়সে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘ বন্দিজীবনে বহুল আলোচিত, কুখ্যাত খুনি, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি, মানবতাবিরোধী অপরাধী, জেএমবি জঙ্গিসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ফাঁসিগুলো আমিই কার্যকর করেছি। ধর্ষণ হত্যা মামলার আসামি পুলিশ কর্মকর্তা মইনুল হক ও আবদুল সাত্তারের ফাঁসি, কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের ফাঁসি, এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলোচিত ফাঁসি সাংবাদিক কন্যা শারমীন রিমার হত্যাকারী মুনিরের ফাঁসি কার্যকর করেছি। এখন আর ভালো লাগে না। এই পাথর জল্লাদ থেকে মুক্তি চাই। মৃত্যুর আগে একটাবার হলেও মুক্তজীবনে ঘুরতে চাই। জেলের ভেতর আমি বাইর থেকে উড়ে আসা দু’টি কবুতর পুষি। কিন্তু কোনো দিন ওদের খাঁচায় আটকাইনি। কারণ বন্দিজীবনের অমানবিক যাতনা নিজে বুঝি।
৪০ বছরের বন্দিজীবনে দু-তিন বছর পরপর আমাকে একবার বের করা হয়, তাও অন্য জেলখানায় কারো ফাঁসি কার্যকর করার জন্য। দু-তিন বছর পরপর যখন একবার বের হই, তখন খুব ভালো লাগে মুক্ত মানুষ দেখতে, বাস-ট্রাক দেখতে, ছোট ছোট শিশু দেখতে, ধান ক্ষেত নদী দেখে, মুক্ত পাখি দেখতে। আমার জীবনে এখন আর কেউই নেই। মা-বাবা মারা গেছেন। ভাইবোনও নেই। যুবক বয়সে আটক হওয়ায় বিয়ে করারও সুযোগ হয়নি। এত বড় পৃথিবীতে আমার ‘আপন’ বলতে কেউ নেই, বন্দী থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ ও ক্লান্ত হয়ে গেছি। শেষ বয়সে এসে মুক্তজীবনে গিয়েই মরতে ইচ্ছা হয়।’
গ্রামে বড় হয়েছি। মাঝে মধ্যে মনটা চায় ধান ক্ষেতের পাশে হাঁটতে, নদীতে সাঁতার কাটতে, গ্রামের হাটে ঘুরে বেড়াতে। সেই ১০ মার্চ ১৯৭৯ সাল থেকে জেলে আটক। মানিকগঞ্জের দু’টি মামলা ৩ (১২) ১৯৯১ ও ২ (১২) ১৯৯১। প্রথমটির সাজা হয় ১২ বছর ছয় মাস এবং দ্বিতীয়টির ৩০ বছর ছয় মাস। মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট যদি লিখে দেন, উভয় সাজা একসাথে চলবে, তা হলে পাঁচ বছর আগে মুক্তি পেতাম। আমার ব্যাপারে মামলা-মোকদ্দমা লড়ার মতো কেউ নেই। সুপ্রিম কোর্টে আমার এ ব্যাপারে একটি আপিল (আপিল নম্বর-৩৮৯/১৭) আছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি কত আসামিদের মাফ করে দেন; আমিও তার কাছে সদয় ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কিছুি দন আগে প্রধানমন্ত্রী বয়স্ক ও প্রতিবন্ধিতা বিবেচনা করে বন্দী মুক্তির কথা বলেছেন।
তাই আমার দীর্ঘ ৪০ বছর এক মাস কারাজীবনের কথা ও বয়সের বিবেচনা করে আমাকে ক্ষমা করে দিলে বাকি জীবন মসজিদে মসজিদে ইবাদত বন্দেগি করে কেটে দিতাম। অপরাধ করার মতো ন্যূনতম শারীরিক ও মানসিক শক্তির কোনোটিই আমার আর নেই। শুধু মুক্তজীবনের আশায় এই পর্যন্ত ৫৩টি ফাঁসি কার্যকর করেছি (প্রতিটি ফাঁসি কার্যকর করলে দুই মাসের কারা রেয়াত দেয়া হয়)। তার পরও মুক্তজীবন কি ফিরে পাবো? নাকি কারাগারেই মৃত্যুবরণ করব? বলেই হাউমাউ করে ছোট শিশুর মতো অঝোরে কাঁদতে থাকলেন শাহজাহান। হ
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
faimfaohan19121@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement