১৬ আগস্ট ২০২২
`

প্রসঙ্গ : বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

-

অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যেখানে শিক্ষাজীবনে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কারে মনোনিবেশ করছেন, সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বইয়ে লেখা বিভিন্ন দেশের মুদ্রার নাম ও রাজধানী মুখস্থ করছেন সরকারি চাকরির আশায়! এর পেছনে রয়েছে গবেষণার প্রতি অনীহা। নতুন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যখন যৌক্তিক অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না; তখন স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীরা গবেষণা ছেড়ে পুরোদস্তুর চাকরিজীবী হতে চাইবেন, এটিই স্বাভাবিক।
দেশে গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে খুব কমই ব্যয় করা হয় বিদেশের চেয়ে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বাজেট দেয়া হয় এর বেশির ভাগ খরচ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ঠিকাদারের সাময়িক উন্নয়ন হলেও গবেষণাবিহীন প্রজন্ম উপহার! পাচ্ছে দেশ। বরাবরের মতোই এবারো শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেশি দেখানোর জন্য অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে সম্পৃক্ত করে শিক্ষা ও প্রযুক্তি মিলিয়ে ৮৫ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট বাজেটের ১৫.১০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তলিয়ে দেখলে চিত্রটি ভিন্নভাবে ধরা দেবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ মিলিয়ে মোট ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা খাতে প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ১১.৬৯ শতাংশ, যা গত বছরের চেয়ে ০.০১ শতাংশ বেশি। এ বরাদ্দ করোনাকালে বাড়ার জরুরি ছিল। কিন্তু সে রকমভাবে বাড়েনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ করা বাজেটের চিত্র যদি দেখি তা হলে প্রায় সব স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র ফুটে উঠবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বাজেট প্রণয়ন করা হলেও গবেষণা খাতে বরাদ্দ কমেছে আগের চেয়ে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে গবেষণা খাতে মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ৪০ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮১০ কোটি ৪২ লাখ বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বাজেটে বরাদ্দ কমতে থাকলে ভালোমানের গবেষক তৈরি হবে না। গবেষণায় বরাদ্দ কম নিয়ে অভিযোগ থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতের বরাদ্দ শেষ করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ অর্থবছর বাজেটে গবেষণা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে গবেষণা খাতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ কোটি ৭২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ গবেষণা-বরাদ্দের পুরো টাকা ব্যয় করতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে দুটো ভিন্ন পরিসংখ্যান সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রথমটিতে অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। দ্বিতীয়টিতে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার না হওয়া।
দ্বিতীয় পরিসংখ্যানকে একমাত্র সূত্র হিসেবে নিলে ভাবতে হবে যা বরাদ্দ দেয়া হয়; তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তাই গবেষণা খাতে বরাদ্দ কমছে! ঘটনা সে রকম নয়। বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তির খবর গণমাধ্যমে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফকোর প্রবন্ধ থেকে চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে প্রবন্ধ প্রকাশ করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ঘটনা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আগেও এরকম ঘটনার নজির রয়েছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, খোঁজ নিলে এরকম অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককেই পাওয়া যাবে। এই চৌর্যবৃত্তির ঘটনা থেকেই দেখতে পারি একজন শিক্ষকেরই গবেষণা নিয়ে আগ্রহ নেই! তা হলে তার থেকে আরেকজন শিক্ষার্থী কিভাবে গবেষণার প্রতি আগ্রহী হবেন! এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন এসে যায়, তা হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই কি এমন? শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া না গেলেও বলা যায়, কিছুসংখ্যক শিক্ষক চৌর্যবৃত্তির সাথে জড়িত। গবেষণা যে একেবারেই হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে খুব কম। প্রতি বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে জায়গা করতে পারছে না, এর প্রধান কারণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রিসার্চ পেপার না থাকা।
গবেষণা চুরি করা, গবেষণায় অনীহার ঘটনা শিক্ষকদের কাছে আশা করা যায় না। তবু প্রতি বছর এরকম ঘটনা ফাঁস হচ্ছে। কারণ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কত ভালো রেজাল্ট বা কী পরিমাণ গবেষণাধর্মী কাজ রয়েছে এর চেয়েও জোর দেয়া হয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রতি। ফলে যার জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই সে রকম মানুষের জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং তাকে দেখে আরো শিক্ষার্থীর মনে ধারণা জন্মে; গবেষণা ছাড়াই যদি শিক্ষক হওয়া যায় তা হলে কেন অযথা পরিশ্রম!
বাংলাদেশে হরহামেশাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জাতীয় সংসদে বিল পাস হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল পাস হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগতমান বেড়েছে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি গড়ে উঠছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগের নির্দিষ্ট ক্যাম্পাস নেই, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। এতে প্রতি বছর চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যাই বাড়ছে; দক্ষ মানবসম্পদ বাড়ছে না!
শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদণ্ড, তেমনি এ মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে গবেষণাহীন একটি প্রজন্মই যথেষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদকে একটি চাকরির নিশ্চয়তা না ভেবে, গৎবাঁধা জীবনের বাইরে চিন্তা করতে হবে। নতুন একটি প্রজন্মকে তৈরি করতে হলে গবেষণা অত্যাবশ্যক। গবেষক তৈরি করতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়াও অন্যান্য কাঠামোগত সুযোগ সুবিধা থাকতে হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে তৎপর হতে হবে। জরুরি মানসিকতা ও আমাদের শিক্ষা কাঠামোয় পরিবর্তন আনা। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
mdikbalhassansajib29@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement