১৬ আগস্ট ২০২২
`

শিশুশিক্ষার্থীদের প্রতি নির্দয় না হই

-

কিছু দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পত্রিকার ভেরিফাইড আইডিতে রাজধানীর আশুলিয়ায় একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে খালি গায়ে এক শিক্ষককে একটি শিশুকে বেত দিয়ে বেদম প্রহার করতে দেখা যায়; যা দেখলে যে কারো গা শিউরে ওঠার কথা। নির্মম প্রহারে শিশুটি মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে চিৎকার করেÑ তবু নির্যাতন অব্যাহত থাকে! এরকম অমানবিক দৃশ্য মাসখানেক আগেও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। এগুলো কোনো ধরনের শাসন? কোনো ধরনের আচরণ বুঝে আসে না। শিশুদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন কিংবা বেধড়ক আঘাত কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়।
অনেক শিক্ষকের নির্মমতার শিকার হওয়া অবুঝ শিশুরা মুখ খুলতে পারে না। কঠোর শাস্তির ভয়ে। বহু শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। তাই এরকম বহু নির্যাতনের নির্মম দৃশ্য অগোচরেই থেকে যায়। শিশুশিক্ষার্থীরা হয়তো থানায় যেতে সাহস পায় না, সাংবাদিককের ঠিকানা জানে না; তাই বছরের পর বছর নীরবে আঘাত সহ্য করে যায়। তার জন্য কিছু শিক্ষক নামধারীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। যে বয়সে শিশুকে তার মা-বাবা কোলে নিয়ে ভাত খাইয়ে দেয়ার কথা, আদর করে ঘুম পাড়ানোর কথা, যে বয়সে মনের আনন্দে শিশুরা খেলা করবে, সে বয়সে মা-বাবা সন্তানকে শিক্ষকদের অভিভাবক মনে করে স্কুল-মাদরাসায় ভর্তি করেন। কিন্তু যাদের কাছে অর্পণ করেন তারা যদি অমানুষিক আচরণ করেন, তবে সেই শিশু বড় হয়ে সমাজের সাথে কি কোমল আচরণ করবে?
দেশে একটি প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে, ঠুনকো অজুহাতে কোমলমতি শিশুদের বেধড়ক মারধর করা। এটি কোন নৈতিকতায় পড়ে? আট-দশ বছরের একটা শিশু কী অপরাধ করতে পারে? সেটা কি সহ্য করা যায় না? শিশুদের একটু-আধটু দুষ্টুমি সহ্য করার ক্ষমতা যদি না থাকে, তবে শিশুকে পাঠদান কিংবা লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়াটা উচিত বলে মনে করি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক আগেই বেত-লাঠি নিষিদ্ধ করেছে করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১ নামে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিল; যাতে এগারো ধরনের শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়। এর পর থেকে শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে শিশুদের শাস্তি দেয়ার প্রবণতা বেশ কমেও গিয়েছিল। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি নজরদারির অভাবে আবার তা শুরু হয়েছে। অবিলম্বে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেত-লাঠির ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা মনে করি, শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি রাখা দরকার; যাতে বেত, লাঠি, বাঁশের কঞ্চি প্রভৃতি দিয়ে যেন শিশুদের গায়ে আঘাত করতে না পারেন শিক্ষকরা। পাশাপাশি অভিভাবকেরও খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে; যাতে শিশুদের সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্মম অত্যাচার নেমে না আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন, মানুষকে উপদেশ দেন, তাদের কাছে থেকে সবাই মোলায়েম ব্যবহারই আশা করেন। শিশুরাও তাদের অভিভাবকতুল্য শিক্ষকদের কাছ থেকে স্নেহময় শাসন ও ভালোবাসা আশা করে। কিন্তু বিপরীত আচরণ পেলে অন্তরে ঘৃণা ও তেজের উদয় হয়। শিক্ষককে আর শিক্ষক মনে করে না। বস্তুত এখন আর সেই মান্ধাতা আমলের মতো পিটিয়ে মানুষ বানানো কিংবা শিক্ষাদান পদ্ধতি নেই। এখন শিক্ষা, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া হয় আনন্দের মাধ্যমে। যারা শিক্ষা দানের মতো মহৎ পেশায় নিজেদের নিয়জিত করেন, তারা এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান রাখবেন। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যেন শিশুদের গগনবিদারী চিৎকার ভেসে না আসে; শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেত্রাঘাতসহ সব রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা হোক। একই সাথে শিশু নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করাও অতীব জরুরি। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
saifulislamhafeez3185@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement