২২ জুন ২০২১
`

ডাক্তার-পুলিশ মুখোমুখি

ডাক্তার-পুলিশ মুখোমুখি - ছবি : সংগৃহীত

করোনার বিস্তার রোধে চলমান সর্বাত্মক লকডাউনে পুলিশ চেকপোস্টে পরিচয়পত্র দেখা নিয়ে নারী চিকিৎসককে হয়রানি এবং পুলিশ সদস্য ও ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বাগি¦তণ্ডায় জড়ানোকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে এখন ডাক্তার-পুলিশ।

পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়ায় পুলিশ সদস্য ও ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বাগি¦তণ্ডায় জড়ানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদা শওকত জেনিকেই দায়ী করেছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ডা: জেনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অন্য দিকে চেকপোস্টে নারী চিকিৎসক ডা: জেনিকে সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে হেনস্তার ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দাবি করেছে সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। গতকাল সোমবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক বিবৃতিতে পরস্পরবিরোধী দাবি জানায় সংগঠন দু’টি।

জানা গেছে, গত রোববার লকডাউনের পঞ্চম দিনে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে বাগি¦তণ্ডায় জড়ান নারী চিকিৎসক ডা: সাঈদা শওকত জেনি। বাগি¦তণ্ডার সেই ভিডিওটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। জানা গেছে, এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যালে ওই নারী চিকিৎসকের গাড়ি আটকে তার পরিচয়পত্র চান নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এ কাইয়ুম। ওই গাড়িতে জেনির কর্মস্থল বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের স্টিকার সাঁটানো ছিল, তার গায়েও চিকিৎসকের অ্যাপ্রোন ছিল। তারপরেও কেন পরিচয়পত্র দেখাতে হবেÑ এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে জেনি তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ও বলেন। ওসি কাইয়ুমও জানান, তিনিও মুক্তিযোদ্ধার ছেলে। এই তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন। আধা ঘণ্টা পর তিনি ঘটনাটির মীমাংসা করতে সক্ষম হন।

ডা: জেনির অভিযোগ, তাকে ভুয়া ডাক্তার বলেছেন ওসি কাইয়ুম, একপর্যায়ে যৌন ব্যবসার অভিযোগে গ্রেফতার শামীমা নূর পাপিয়ার সাথে তাকে তুলনা করেন।

ডা: জেনি একজন রেডিওলজিস্ট এবং বাংলাদেশে রেডিওলজিস্টদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিজ-এফডিএসআর এক বিবৃতিতে ওসি কাইয়ুমের শাস্তি দাবি করেছে। তারা বলেছে, পতিতাবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে গ্রেফতার করা পাপিয়ার সাথে পুলিশ ডা: জেনির তুলনা করেছে, যা একজন নারী চিকিৎসকের জন্য চরম অবমাননাকর। তবে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি (জেনি) নিজ পেশার পরিচয় বাদ দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক পরিচয় তুলে ধরে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন এবং জাতির সামনে পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছেন।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ওই নারী চিকিৎসক যেসব শব্দ প্রয়োগ করেছেন তা অরুচিকর ও লজ্জাজনক। তিনি কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের প্রতি একজন চিকিৎসকের অপেশাদার ও অরুচিকর আচরণে পুলিশের প্রতিটি সদস্য মর্মাহত।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। নিজ মন্ত্রণালয়ের বৈধ আদেশ লঙ্ঘন ও কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জোর দাবি জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত ১৪ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবাসহ অন্যান্য কার্যক্রমে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাফতরিক পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) অবশ্যিকভাবে ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তিনি তা অমান্য করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তার পরিচয় প্রদান না করে নিজ মন্ত্রণালয়ের আদেশ লঙ্ঘন করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ওই চিকিৎসক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে বাদানুবাদকালে যে শব্দ প্রয়োগ করেছেন তা অত্যন্ত অরুচিকর ও লজ্জাজনক। এক পেশার সদস্য হয়ে আরেক পেশার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি কী ভাষা প্রয়োগ করেছেন তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেছেন এবং ‘আর আমি কী, সেটা এখন তোদের দেখাচ্ছি হারামজাদা’ বলে হুমকি দিয়েছেন।

বৈশ্বিক মহামারীর এই দুঃসময়ে পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ সর্বজনস্বীকৃত উল্লেখ করে বিবৃতিতে জানানো হয়, কোভিডে আক্রান্ত হয়ে ৯১ জন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন, ২০ বিশ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এর পরেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা তীব্র দাবদাহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। পেশাগত বৈচিত্র্যের কারণে পুলিশের এ চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালনকালে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, দেশের স্বার্থে ও মানুষের জীবন রক্ষা ও করোনার বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেতে পুলিশের কাজে সবাই সহযোগিতা করবে, এটাই তাদের প্রত্যাশা।

এ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় রেডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার সাঈদা শওকত জেনি কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে এলিফ্যান্ট রোড চেকপয়েন্টে পুলিশ সদস্যদের হেনস্তার শিকার হন। আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য এবং বিএসএমএমইউ স্বাচিপ শাখার এই সদস্য সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে হেনস্তার শিকার হওয়ার প্রতিবাদে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। ঘটনার দিন রাতেই স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক অধ্যাপক আবু নাসার রিজভী ও সচিব ডাক্তার আরিফুল ইসলাম জোয়ারদার টিটো যৌথভাবে এক স্মারকলিপির মাধ্যমে এ দাবি জানান।

এতে বলা হয়, আমরা পুলিশ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের এমন গর্হিত আচরণের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাই। এই দুঃসময়ে চিকিৎসক হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। বর্তমানে কোভিডের এ সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ডাক্তাররা যখন সম্মুখ সারিতে ঝুঁকি নিয়ে লড়ে যাচ্ছে তখন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফেরার পথে পুলিশ ডা: জেনির গাড়ি থামিয়ে তার কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চায়। এ সময় নিজের পরিচয় ও গাড়িতে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের লোগো সম্বলিত স্টিকার, পরিচালক ইস্যু করা পাস ও বিএসএমএমইউর লোগোসহ ডাক্তারের নামাঙ্কিত অ্যাপ্রন দেখালেও সবকিছুকে ভুয়া বলে পুলিশ তাকে চরম হেনস্তা করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ডাক্তারদের মুভমেন্ট পাস লাগবে না বলে ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হলেও পুলিশ ডা: জেনির কাছে অন্যায়ভাবে মুভমেন্ট পাস চায়। আমরা আরো বিস্ময়ের সাথে দেখলাম, বিতর্কের একপর্যায়ে পুলিশ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার পাপিয়ার সাথে তাকে তুলনা করেছে; যা একজন নারী চিকিৎসকের জন্য চরম অপমানের। আমরা মনে করি এর মাধ্যমে পুলিশ শুধু ডা: জেনিকে নয়, বরং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসককে এবং সর্বোপরি একজন সম্মানিত নারীকে হেয় করেছে। এই দুঃসময়ে চিকিৎসক হেনস্তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

পাশাপাশি বিষয়টি সংবেদনশীল বিবেচনায় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানানো হয় বিবৃতিতে।



আরো সংবাদ