১৩ জুলাই ২০২০

ডুবে যাওয়ার ২৬ ঘন্টা পর লঞ্চ উদ্ধার

নিহতের স্বজনের আহাজারি - ছবি : নাসিম সিকদার

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ফরাশগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের চর খেজুরবাগ বেবি সাবের ডক ইয়ার্ড বরাবর মাঝ নদীতে এমভি ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী এমএল মর্নিং বার্ড লঞ্চটি উদ্ধার হয়েছে। প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল বিআইডব্লিউটিএর জাহাজ ভাসমান বেলুন ও অন্য একটি জাহাজের মাধ্যমে লঞ্চ উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে উদ্ধারের সময় লঞ্চটি ধুমরে মুচরে গেছে এবং উদ্ধারকৃত লঞ্চটি সদরঘাট নৌ থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে জানান নৌ পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম।

লঞ্চটি উদ্ধারের পর দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটের সময় লঞ্চের ইঞ্জিন রুম থেকে আরো এক জনের লাশ উদ্বার করা হয়েছে। লাশটি এমএল মর্নিং বার্ড লঞ্চটির ইঞ্জিন চালক আশিকের। এ নিয়ে গত দুই দিনে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় ৪ শিশু ৮ নারী ও ২২ পুরুষসহ মোট ৩৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো। এছাড়া পানির নিচে ১৩ ঘণ্টা আটকে থাকা অবস্থায় সুজন বেপারীকে এবং এর আগে মো: রিফাতকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গত সোমবার সকালে ‘এমভি ময়ূর-২’ লঞ্চটি ফরাশগঞ্জ থেকে লালকুটি ঘাটে যাওয়ার প্রস্ততি নিতে গিয়ে লঞ্চটি ব্যাকে যাওয়ার সময় ধাক্কায় ডুবে যায় যাত্রীবাহী ছোট লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’। চালকের অসতর্কতায় এই ঘটনা ঘটে। এতে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান ৩৩ জন নিরীহ যাত্রী। তাদের মধ্যে ২১জন পুরুষ ৮ জন নারী ও ৪ শিশু রয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৯জনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

সোমবারদিন সন্ধ্যার মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সব ৩২টি লাশ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে সেদিন শত চেষ্টা করেও ডুবুরি দল জাহাজটি উদ্ধার করতে পারেনি। পরে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এতে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের ১৪জন ডুবুরিসহ মোট ৮০ জন উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করে। তারা ৩৩জনের লাশ উদ্ধার ছাড়াও দুজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। জীবিতদের মধ্যে রয়েছে মো. রিফাত (২৪) ও সুজন বেপারী (৪৩)। সুজন বেপারীকে উদ্ধার করা হয়েছে লঞ্চ ডুবি ঘটনার প্রায় ১৩ ঘন্টা পর। এ দুর্ঘটনায় দুটি লঞ্চের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সনদ স্থগিত করেছে নৌপরিবহন অধিদফতর। ময়ূর-২ লঞ্চটিকে আটক করা হয়েছে। তবে লঞ্চের মালিক ও চালকসহ সব আসামী পালাতক রয়েছে।

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ডুবি ঘটনায় ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি মর্নিং বার্ড লঞ্চ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সোমবার রাতে নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামছুল আলম বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলা এজহার সূত্রে জানা যায়, এমভি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়া লঞ্চ ময়ূর-২’র মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াত, কর্মচারি আবুল বাশার ও মো. জাকির হোসেন, ইঞ্জিন চালক ড্রাইভার শিপন হাওলাদার, ড্রাইভার শাকিল, সুকানি নাসির মৃধা ও কর্মচারী মো. রিদয় এই ৭ জনের নাম উল্লেখ করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়েছে। যার মামলা নং ৩৪ মামলাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

১৩ ঘণ্টা পর একজনকে জীবিত উদ্ধার
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র ষ্টেশন অফিসার মোহাম্মদ আরী জানান, সোমবার রাত দশটার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ মর্নিং বার্ড লঞ্চের ভেতর থেকে মধ্যবয়সি একজনকে জীবিত উদ্ধার করে ডুবুরিরা। প্রায় ১২ ঘন্টা পানির নিচে থাকার কারণে তার তাপমাত্রা কমে গিয়েছে। উপরে উঠিয়ে তাকে লাইফ জ্যাকেট দিয়ে শরীর মেসেজ করে শরীর গরম করার চেষ্টা করেন কোস্টগার্ড ফায়ারসার্ভিস নৌবাহিনীর সদস্যরা সহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।কোস্টগার্ড ও নেভির কর্মকর্তারা জানান, তারা যখন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিটিকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলেন তিনি চোখের ইশারায় কথার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। পানির নিচে তলিয়ে গেলেও এ ব্যক্তি কীভাবে বেঁচে গেলেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে উপস্থিত সকলের মধ্যে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি যেখানে আটকা পড়েছিলেন সেখানে হয়তো সেভাবে পানি প্রবেশ করেনি। যখন টিউবের মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় লঞ্চটি তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল তখন লঞ্চটি সামান্য ভেসে ওঠার পর ওই ব্যক্তি নিজের প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসেন এবং উদ্ধার কর্মীরা তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে নৌকায় তুলেন। উদ্ধারকৃত ব্যক্তির নাম সজন বেপারী বলে জানা যায়।

উদ্ধারকারী জাহাজের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গা সেতুতে ফাটল গাড়ি চলাচল বন্ধ

সোমবার সকালে বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করতে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি উদ্ধারকারী জাহাজ। জাহাজটি পোস্তগোলায় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুতে নিচ দিয়ে আসার সময় ধাক্কা লেগে সেতুতে ফাটল তৈরি হয়েছে। ফলে বুড়িগঙ্গা সেতু দিয়ে সোমবার সন্ধ্যা থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা অঞ্চল) সবুজ উদ্দিন খান জানান, সেতুর একটি জায়গায় ফাটল দেখা দেয়ায় যানবাহন চলাচল স্থগিত করেছি। মঙ্গলবার আমাদের বিশেষজ্ঞরা পরিদর্শন করার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজের মাস্টার দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে চাইছিলেন। তার ভুলে সেতুতে আঘাত লাগতে পারে। সেতুতে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা তেমন মারাত্মক নয় বলে তিনি মনে করেন।

উদ্ধারকারী জাহাজটি সেতু পার হতে না পারায় বিকল্প উপায়ে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে পোস্তগোলা সেতু দিয়ে পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে দক্ষিন বাংলা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী পরিবহনসহ সকল প্রকার যানবাহন। পোস্তগোলায় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু বন্ধ থাকায় দক্ষিন বাংলা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখি সকল প্রকার গাড়ি চলাচল করছে বাবু বাজার দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু দিয়ে। একারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা মাওয়া রোডের প্রায় আট কিলোমিটার রাস্তায় যানজট লেগে আছে।

আরো এক জনের লাশ উদ্ধার

বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ থেকে আরো এক জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৩ জন। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির ইঞ্জিন রুম থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। লাশটি ডুবন্ত লঞ্চটির ইঞ্জিন চালক আশিকের (১৮)। আশিকের বাবা মো: ইসমাইল জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের কাটপট্টি বিকির বাজার এলাকায়। তার ছেলে ডুবে যাওয়া মনিং বার্ড লঞ্চটির ইঞ্জিন চালক হিসেবে কাজ করতো । প্রতিদিনের মতো কালকেও সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলো তার ছেলে । ১২ টার দিকে টিভিতে দেখতে পায় মনিং বার্ড লঞ্চ ডুবির খবর।

সোমবার সারাদিন ঘটনা স্থলে এসে ছেলেকে খুজতে থাকে একে একে ৩২টি লাশ উঠলেও আমার ছেলেকে জীবিত বা মৃত কোনো ভাবেই পাইনি। ছেলের অপেক্ষায় সারারাত টার্মিনালেই স্ত্রীসহ বসে ছিলাম। মঙ্গলবার ১২ টার দিকে একটি লাশ ভেসে উঠলে পুলিশ পাড়ে নিয়ে আসলে আমার ছেলে বলে নিশ্চিত হই।

উদ্ধার কাজের সমাপ্তি ঘোষণা
বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় দুইদিনে ৩৩ জনের লাশ উদ্ধারের পর তল্লাশি অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে এমভি মর্নিং বার্ড উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক। এ সময় ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও নৌপুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতথ্য নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা মো. রায়হান। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে একটি ডুবুরি টিম সার্বক্ষণিক অবস্থান করে উদ্ধার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি নদীর পাড়ে টেনে নিয়ে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে পরবর্তীকালে ডকইয়ার্ডে টেনে তোলা হবে। এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, সোমবার সকালে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের এমভি ময়ূর ২ লঞ্চের ধাক্কায় ঢাকা- কাটপট্রি (মুন্সিগঞ্জ) রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চ প্রায় ৭০জন যাত্রী নিয়ে তুবে যায়।


আরো সংবাদ