০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

সাহরি-ইফতারের সময় জানাতে ‘তোপধ্বনি’ সংস্কৃতি

সাহরি-ইফতারের সময় জানাতে তোপধ্বনি দেয়ার সংস্কৃতি বেশ পুরনো। - ছবি : সংগৃহীত

সৌদি আরব, মিসর, দুবাইসহ একাধিক আরব রাষ্ট্রে সাহরি-ইফতারের সময় জানাতে ‘তোপধ্বনি’র রেওয়াজ প্রচলিত আছে। ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার পরও এসব দেশে কামানে গোলা নিক্ষেপ করে শব্দ করা হয়। রমজানের বিশেষ ঐতিহ্য হিসেবে আরব মুসলিমদের কাছে এ পদ্ধতিটি বেশ জনপ্রিয়। বিগত কয়েক শতাব্দী যাবত নিয়মিতই ‘তোপধ্বনি’ করা অন্তত তাই জানান দিচ্ছে।

রমজানে ‘তোপধ্বনি’র শুরু
১৪৬০ সালে মামলুক সুলতান খাসকাদুমকে একজন জার্মান একটি তোপ উপহার হিসেবে প্রদান করেন। ১৪৬৭ সালে পরীক্ষার জন্য সূর্যাস্তের সময় তা দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ঠিক ওই সময়টি ছিল মাগরিবের সময়, যখন রোজা শেষ হয়। রোজার সময় সমাপ্তির নির্দেশক হিসেবে ‘তোপধ্বনি’র প্রক্রিয়াটি শহরবাসীর পছন্দ হয়। পরের সময়ে রমজানের সাহরি ও ইফতারের সময় জানাতে মাসব্যাপী এ কার্যক্রম চালাতে স্থানীয় আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সুলতানকে পরামর্শ দেন। সুলতানও এ পরামর্শ মেনে নেন। পরে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার পরও ‘তোপধ্বনি’ দেয়া শুরু হওয়া। আর এভাবেই সাহরি-ইফতারের সময় জানাতে সুন্দর এ পদ্ধতিটির যাত্রা শুরু করে। মিসরের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক সালাহ উদ্দিন দুর্গে সুলতান খাসকাদুমের তোপটি আজও ব্যবহৃত হচ্ছে। জানা যায়, ১৯৯২ সাল থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ ৩০ বছর এটির ব্যবহার বন্ধ ছিল। তবে গত রমজানে ফের তোপটি চালু করা হয়েছে।

‘তোপধ্বনি’ শুরুর ভিন্ন ইতিহাস
আরেকটি ঐতিহাসিক সূত্রমতে ‘তোপধ্বনি’ শুরুর ইতিহাস হলো- সালাহ উদ্দিন দুর্গে এ তোপটি রেখেছিল মিসরের তৎকালীন শাসক ইসমাইল পাশার (১৮৩০-১৮৯৫) সৈন্যরা। তারা এটি দিয়ে অনুশীলন করত। একদিন মাগরিবের আজানের সময় তোপটিতে একটি গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ঘটনাক্রমে তখন পবিত্র রমজান মাস ছিল। এ সময় ইসমাইল পাশার কন্যা শাহজাদী আল হাজ্জাহ ফাতেমা ইফতারের সময় জানাতে ‘তোপধ্বনি’ করার প্রস্তাব দেন। পরে তার প্রস্তাব বর্ধিত হয়ে গৃহীত হয় এবং একইসাথে সাহরি ও ঈদের চাঁদ দেখার পরও তোপধ্বনির প্রচলন ঘটে।

আরো ‘তোপধ্বনি’
মিসরে প্রচলন হওয়া সাহরি-ইফতারের তোপধ্বনি অনেক দেশের মুসলিমদের কাছেও বেশ পছন্দ হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কসহ আরো কয়েকটি আরব দেশে তোপধ্বনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া পরবর্তীকালে মিসরের অনুসরণ করে সাহরি ও ইফতারের সময় জানাতে বিভিন্ন দেশে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মুজাহিদদের সাহরিতে জাগাতে ফাঁকা গুলিসহ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করার রেওয়াজ শুরু হয়।

সৌদিতে তোপধ্বনি
সৌদি আরবে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামের অদূরে উত্তর দিকে একটি তোপ সংরক্ষিত আছে। প্রতি রমজানে সাহরি-ইফতারের সময় মক্কায় সমাগত ওমরাহযাত্রীদের সম্মানে তোপটিতে গোলা নিক্ষেপ করা হত। ঈদের চাঁদ দেখার পরও উৎসবের আমেজে এটি ব্যবহার করা হত, তবে ছয়-সাত বছর যাবত মক্কার তোপধ্বনি বন্ধ আছে। তা ছাড়া ১৯৩১ সাল থেকে তাবুকেও তোপধ্বনি রীতির চর্চা শুরু হয়। সৌদি ঐতিহাসিক আব্দুল্লাহ আল উমরানি বলেন, বিংশ শতাব্দীর শুরুর কিছুটা পরে সৌদি রাষ্ট্রের স্থপতি শাহ আব্দুল আজিজ তায়েফে একটি সেনাছাউনি স্থাপন করেন। সেখানের এক কর্মকর্তা সৈন্যদের সাহরি-ইফতারের সময় জানাতে তোপধ্বনি কার্যক্রম চালু করেন।

তুরস্কেও আছে
রমজান আসলেই তুরস্কে একটি রাজকীয় আমেজ শুরু হয়। দেশটিতে পবিত্র রমজান মাসে সাহরি-ইফতারের সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে তোপধ্বনি দেয়া হয়। একইসাথে ড্রাম বাজিয়ে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর সংস্কৃতিও তুরস্কে পুরনো। তাছাড়া রমজানকে স্বাগত জানিয়ে এখানে যে তোপধ্বনি দেয়া হয় তখন সেখানকার মসজিদের মিনারগুলোতে জ্বালানো হয় কানদিল নামের বিশেষ বাতি। আর এই বাতিগুলো জ্বলতে থাকে সূর্যোদয় পর্যন্ত। তুরস্কে কানদিল জ্বালানোর এই ঐতিহ্য শত বছর পুরনো।

‘তোপধ্বনি’ রোজার আনন্দ ও মুসলিমদের আধিপত্যের প্রতীক
মুসলিম সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, মুসলিম বিশ্বে পবিত্র রমজানে ‘তোপধ্বনি’ রোজার আনন্দ ও মুসলিমদের আধিপত্যের প্রাচীন প্রতীক। আরব সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য একটি অংশে রূপ নিয়েছে এ পদ্ধতি। রমজানে তোপের ব্যবহার এতটাই সমাদৃত হয়েছে যে, সৌদি আরবের পাহাড়-মরুভূমি, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এর সমান জনপ্রিয়তা। আধুনিক যুগের অসংখ্য প্রযুক্তির উপস্থিতি সত্ত্বেও তোপে গোলা দাগিয়ে শব্দ করার রেওয়াজ আজও রয়ে গেছে; বরং কোনো কোনো দেশ নতুনকরে তোপধ্বনি শুরুরও পরিকল্পনা করছে।

‘তোপধ্বনি’র আগে সাহরি-ইফতারের সময় জানার পদ্ধতি
তোপধ্বনি করার আগের সময়ে সাহরি ও ইফতারের সময় জানতে বিচিত্র ধরণের পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হত। সাহরি-ইফতারের সম্পর্ক যেহেতু সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্তের সাথে তাই ইসলামের শুরুর সময়ে সাহাবাদের মধ্যে যারা জ্যোতির্বিদ্যায় জ্ঞান রাখতেন তারা তারকার অবস্থান দেখে সাহরির সময় এবং বিকেলে দিগন্তের লালিমা দেখে ইফতারির সময় নির্ণয় করতেন। অত:পর সবাইকে সমকালীন প্রথা অনুযায়ী জানিয়ে দিতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে পাহাড়ে উঠে সময় ঘোষণা করা হত। অনেক জায়গায় ঘণ্টা বাজিয়েও জানানো হত সময়। পরে মিনার তৈরি হলে তার উপরে উঠে মানুষকে ডাকা হত। ঘড়ির ব্যবহার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আরবসহ গোটা বিশ্বেই সাহরি-ইফতারের সময় জানতে এরকম আরো নানারকম উপায় অবলম্বন করা হত। ফুল ফোঁটার পরিমাণ, পাখি ও মোরগের ডাক শুনেও মানুষ সাহরির সময় জানত এবং প্রযুক্তির অভাবে সেসময় রমজানসহ অন্যান্য মাসেও সময় নির্ধারণে বিভ্রান্তির শিকার হত। একবার দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে রমজান মাসের কোনো একদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সাহাবায়ে কেরাম সূর্যাস্ত হয়ে গেছে ভেবে ইফতার করে ফেলেন। সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার আকাশ মেঘমুক্ত হলে তারা বুঝতে পারেন যে এখনো ইফতারের সময় হয়নি।

সূত্র : আলআরাবিয়া 


আরো সংবাদ


premium cement