২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ভেনিসে বড় অংকের বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন এক প্রবাসী বাংলাদেশী

মোঃ ডাবলু চৌধুরী - ছবি - বিবিসি

সম্প্রতি ইতালির ভেনিসে এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন একজন বাংলাদেশী। ইতালির মিলানে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে ভেনিসের মেয়র অফিসে অনুমতি চেয়েছেন তিনি।

যদিও এখনো তিনি অনুমতি পাননি। তবে তার পরিকল্পিত বিনিয়োগের অঙ্কটি বড় হওয়ায় ইতোমধ্যেই তাকে নিয়ে ইতালির গণমাধ্যমে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

কে এই বিনিয়োগকারী?
এই বিনিয়োগকারীর নাম মোঃ ডাবলু চৌধুরী। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন। পড়াশোনা করেছেন সুইজারল্যান্ডে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যেরও নাগরিকত্ব রয়েছে ডাবলু চৌধুরীর। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তার গাড়ির ব্যবসা রয়েছে।

বিবিসিকে ডাবলু চৌধুরী বলেছেন, তার কয়েকজন ব্যবসায়িক অংশীদারের সাথে মিলে এ বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে এপসিলন মোটরস ইনকর্পোরেশন নামে একটি বিদ্যুৎচালিত গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন।

এখন এই প্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রিক বা বিদ্যুৎচালিত গাড়ি নির্মাণের কারখানা তৈরির জন্য তারা ভেনিসে বিনিয়োগ করার আবেদন করেছেন।

ভেনিসের পোর্তো মারঘেরা নামক বন্দর নগরী, যেটি মূলত একটি শিল্পাঞ্চল, সেখানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে এতে প্রায় এক হাজার কর্মীর চাকরির ব্যবস্থা হবে।

ডাবলু চৌধুরী বলেছেন, এপসিলন মোটরস ইনকর্পোরেশনের উদ্যোক্তাদের বড় অংশ বাংলাদেশী এবং তাদের বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যদের বড় অংশই এক সময় জার্মানি এবং চীনে জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মার্সিডিজ বেঞ্জের কারখানায় কাজ করতেন।

অনুমতি পেলে ২০২৩ ভেনিসে এ কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

যদিও কবে নাগাদ উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা সে বিষয়ে এক্ষুনি ধারণা দিতে পারেননি ডাবলু চৌধুরী।

তবে এই বিদ্যুৎচালিত গাড়ির কারখানার পাশাপাশি লিথিনিয়াম ব্যাটারি তৈরির কারখানা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে মূল পরিকল্পনায়।

বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে
ডাবলু চৌধুরী বলেছেন, ‘ব্যতিক্রমী এবং সাসটেইনেবল কিছু করার জন্য আমরা এপসিলন মোটরস করেছি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল যে যদি এমন কিছু করা যায় ভবিষ্যতে যার ব্যাপক চাহিদা হবে এবং যেটি পরিবেশবান্ধব হবে তাহলে আমাদের কাজটি সাসটেইনেবল হবে।’ সে কারণে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

ডাবলু চৌধুরী বলেছেন, পরিকল্পিত কারখানার জন্য বিনিয়োগ আসবে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের একদল ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের কাছ থেকে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বলতে সাধারণত বড় বিনিয়োগকারী, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত বিনিয়োগকে বোঝানো হয়, যারা সম্ভাবনাময় এবং ভবিষ্যতে লাভজনক হতে পারে এমন স্টার্টআপ বা ছোট কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে থাকে।

তিনি বলছিলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো রাজ্যে, ইংল্যান্ডে এবং অন্যান্য বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎচালিত গাড়ির প্রাধান্য থাকবে।

‘এবং এজন্য চীনসহ বিভিন্ন দেশের সরকার এখন যারা ইলেকট্রিক গাড়ি বানাচ্ছে এবং বিক্রি করছে তাদের ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।

‘এখন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা টাকা বিনিয়োগ করবে, আর আমাদের হচ্ছে প্রযুক্তি এবং কারিগরি দিক, এই দুই মিলে আমরা এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি,’ মি. চৌধুরী বলেছেন।

ইতালিতে বিনিয়োগের প্রস্তাবটি মার্কিন কোম্পানি হিসেবে দেয়া হয়েছে, কিন্তু এপসিলন মোটরসের প্রধান এবং একজন বাংলাদেশী হিসেবে তিনি বাংলাদেশী দূতাবাসের সাহায্য চেয়েছেন।

কেন আর কিভাবে ইতালিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা?
মিলানে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এমজেএইচ জাবেদ বিবিসিকে বলেছেন, মূলত তার মাধ্যমে ডাবলু চৌধুরী ভেনিসে কারখানা খোলার অনুমতি চেয়েছেন কর্তৃপক্ষের কাছে।

জাবেদ বলেছেন, কিছুদিন আগে মোঃ ডাবলু মিলানে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কার্যালয়ে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে উপযুক্ত জমির খোঁজ এবং অনুমতির জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের সাহায্য চেয়েছিলেন।

এরপর ভেনিস কমিউনের অ্যাসেসরি কমার্সিও মানে বাণিজ্য দফতর, যার প্রধান ডেপুটি মেয়র সিবাস্টিয়ান কস্টালোঙ্গার, তার কাছে ডাবলুর হাতে লেখা একটি চিঠি যেখানে তিনি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটি পৌঁছে দিয়েছেন জাবেদ।

কর্তৃপক্ষের কাছে লেখা চিঠিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৯২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাবেদ। এক হাজার মিলিয়নে এক বিলিয়ন হয়।

জাবেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে বিনিয়োগের প্রস্তাব যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি আমাদের সাহায্য চেয়েছিলেন। আমি নিজে যখন ভেনিসে গেছি সেসময় আমি নিজ হাতেই তার আবেদনপত্রটি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।’

ভেনিসের মেয়র কার্যালয় এখন সেটি পর্যালোচনা করছে। বুধবার কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করেছেন ডাবলু চৌধুরী।

জাবেদ বলেছেন, এই কারখানা হলে ইতালিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে, এমন বিবেচনায় তারা ডাবলু চৌধুরীকে সাহায্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভেনিসে বহু সংখ্যক বাংলাদেশী চাকরি-পড়াশুনার সূত্রে বসবাস করছেন।

এদিকে, ডাবলু চৌধুরী বলেছেন, কারখানা স্থাপনের জন্য তার বিনিয়োগকারীরা আইনশৃঙ্খলা ভালো এমন কোনো দেশে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন এবং ভেনিসের পোর্তো মারঘেরায় কর্তৃপক্ষ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পকারখানাকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। এই দুই কারণে আফ্রিকা বা এশিয়ার কোনো দেশের বদলে ইতালিকে বেছে নেয়া হয়েছে।

“বিনিয়োগকারীরা চায় যেন ওই দেশে ল’ অ্যান্ড অর্ডারটা ভালো হয়, আর বিনিয়োগটা যেন সিকিওরড থাকে, মানে রিটার্নটা যাতে আসে। সেজন্য আমরা ইতালিকে বেছে নিলাম,” বলেছেন তিনি।

এছাড়া ইতালিতে ইতোমধ্যে ফিয়াটসহ বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মী রয়েছেন, ফলে দক্ষ শ্রমিক পাওয়া কঠিন হবে না, সেটি আরেকটি বিবেচনা ছিল এপসিলনের উদ্যোক্তাদের জন্য।

ইতালিতে এত বড় বিনিয়োগ এর আগে কোনো বাংলাদেশী কি করেছে?
মিলানে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল জাবেদ বলেছেন, ইতালিতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মধ্যে অনেকেই দেশটিতে বিনিয়োগ করেছেন।

কিন্তু সেসব বিনিয়োগের আকার বেশি বড় নয়। মূলত দেশটির কৃষি ও সেবাখাতে সেসব বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ডাবলু চৌধুরী তার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে কনসাল জেনারেলের কার্যালয়কে বলেছেন, অনুমতি পেলে যে কারখানা তিনি স্থাপন করবেন, তাতে বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমিক হিসেবে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

ডাবলু চৌধুরী বিবিসিকে বলেছেন, ইতালিতে থাকা অটোমোটিভ খাতে পড়াশুনা করছেন বা বর্তমানে যুক্ত আছেন এমন মানুষেরা তাদের প্রস্তাবিত কারখানায় কাজ করতে পারবেন।

এজন্য তিনি ইমিগ্রেশন সলিসিটারের (আইনজীবী) সাথে আলোচনা করছেন।

কারণ ইতালির আইন অনুযায়ী কোনো বিশেষায়িত খাতে কাজ করার জন্য একজন ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা ও কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ


premium cement