২৬ নভেম্বর ২০২০

সাইপ্রাসে হার না মানা এক কৃতি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর গল্প!

সাইপ্রাসে হার না মানা এক কৃতি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর গল্প! - ছবি : নয়া দিগন্ত

ইউরোপ ও এশিয়ার সমঙ্গস্থলে অবস্থিত ভূ-মধ্যসাগরীয় দ্বীপ দেশ সাইপ্রাস। প্রায় ৩,৫৭২ বর্গমাইলবিশিষ্ট ও বারো লক্ষ জনসংখ্যা বিশিষ্ট এ দেশটি বিখ্যাত বিভিন্ন ধরণের নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য। গ্রিক পুরানে বর্ণিত ভালোবাসার দেবী হিসেবে খ্যাত অ্যাফ্রোদিতির জন্মস্থান পূর্ব ভূ-মধ্যসাগরীয় এ দ্বীপ দেশ সাইপ্রাসে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য অনেক দেশের মতো সাইপ্রাসেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে। এক সময় উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষত ট্যুরিজম ও হোটেল ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে পড়াশুনার জন্য বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল ছিলও সাইপ্রাস।

একে নিরব খান একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যিনি ২০১৫ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় সাইপ্রাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে তার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। সাইপ্রাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনি একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তিনি দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে ইতোমধ্যে নয়নের মণি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তবে তার এ সাফল্যের অগ্রযাত্রার পথটি মোটেও মসৃণ ছিলও না। তবে সকল ধরণের প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাঁটিয়ে আজকের এ অবস্থানে পৌঁছাতে পারায় তিনি গর্ব অনুভব করছেন। সাইপ্রাসে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কারণে বিশেষত নর্থ সাইপ্রাস থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের কারণে সামগ্রিকভাবে সেখানে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি অনেকটা মিয়ম্রাণ হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বর্তমানে সাইপ্রাসে স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অনেকে এলেও শেষ পর্যন্ত কেউই সেভাবে আর লেখাপড়া করছেন না। অনেকে দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন ধরণের অণুঘটকের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগালসহ ইউরোপের অন্য দেশে পৌঁছানোর একটি রুট হিসেবে সাইপ্রাসকে বেছে নিচ্ছে।

এ কে নিরব খানের সাথে কথা বলে জানা যায় যে সাইপ্রাসে আসার পূর্বে তিনি বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি সম্পন্ন করছিলেন তবে তিনি তার সে এলএলবি কোর্সটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারে নি। তার জীবনের একটি স্বপ্ন ছিলও যুক্তরাজ্য থেকে উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত কোনো কোর্স সম্পন্ন করা। কিন্তু অন্য অনেকের মতো তিনিও কোনো এক অ্যাজেন্সির মিথ্যা আশ্বাসের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। তিনি তার এলএলবি কোর্সকে অর্ধসমাপ্ত রেখে সাইপ্রাসে পাড়ি জমান।

রাজধানী নিকোশিয়া বা লেফকোশিয়ার উপকণ্ঠে স্ট্রোভলস এলাকায় লিদ্রা কলেজে তিনি আইনশাস্ত্রের ওপর ব্যাচেলর কোর্স করার জন্য আসেন। তার ইচ্ছা ছিলও লিদ্রা কলেজ থেকে পরে গ্রেট ব্রিটেনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাড়ি জমানো একই বিষয়ে পড়াশুনা করার জন্য এবং অ্যাজেন্সিও তাকে এমন আশ্বাস দিয়েছিলও বলে তিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন। কিন্তু সাইপ্রাসে পৌঁছানোর পর তিনি দেখেন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসলে আমাদের মতো অনেক উঠতি বয়সের যুবকের স্বপ্ন থাকে উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে পা রাখা কিন্তু বিভিন্ন কারণে দেখা যায় সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকে বিভিন্নভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন। তিনিও ব্যতিক্রমি নন সেক্ষেত্রে।

শুরুতে সাইপ্রাসে পা রাখার পর তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তবে অদম্য মনোবলের কারণে তিনি সকল প্রতিকূলতাকে জয় করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন। ব্যাচেলর অব ল-এর পরিবর্তে তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ব্যাচেলর অব সায়েন্স করার জন্য মনস্থির করেন।

প্রথম দিকে সকল প্রতিকূলতাকে সামাল দিতে পারাটা ছিলও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং ছিলও বলে তিনি জানান। বিশেষত তিনি বলেন, এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন সেটি হলো মানসিকভাবে দৃঢ় থাকা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা। নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর অবিচল থাকা। তার লক্ষ্য ছিলও যেকোনো মূল্যে তিনি ব্যাচেলর শেষ করবেন এবং তিনি তার এ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি কখনো। যেহেতু তিনি নিজের ইচ্ছাতে সাইপ্রাসে পা রেখেছিলেন এবং তার কাছে দেশে ফিরে যাওয়ারও কোনও অপশন ছিলও না সে সময় পারিপার্শ্বিকতার বিবেচনায় তাই যতটা সম্ভব শ্রম ব্যয় করেছেন তিনি তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য। বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোতে ল্যাব ক্লাস ও থিসিসের অনেক সময় বাড়তি চাপ থাকে, তাই তিনি পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে কষ্ট হলেও চেষ্টা করেছেন পার্টটাইম চাকরি করে নিজের টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর জন্য।
বিশেষত সাইপ্রাস যেহেতু ট্যুরিস্ট নির্ভর অর্থনীতির দেশ এবং সামারে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে ও এ সময় ভার্সিটিও বন্ধ থাকে তাই এ সময়টাকে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন টিউশন ফিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ তোলার জন্য। এমনকি কয়েক মাস আগে ট্যুরিস্ট ভিসায় তিনি ইংল্যান্ডও ঘুরে এসেছেন। অর্থাৎ তার স্বপ্ন ছিলও ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করা তিনি সেটা পূরণ করতে সমর্থ হয়েছেন এবং ইংল্যান্ডে যাতায়াত থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজনীয় খরচ তিনি এ পার্টটাইম চাকুরির মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন।

এখন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে আপাতত তিনি কিছুদিন একটু বিশ্রাম নিতে চান। পাশপাশি এ সময় তার সাবজেক্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কোনও জব খুঁজতে চান। যেহেতু তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ব্যাচেলর সম্পন্ন করেছেন এবং সাইপ্রাসসহ পৃথিবীর যে কোনও দেশে এ ফিল্ডের ওপর জব সেক্টর অনেক ভালো তাই এ জন্য তিনি অনেকটা স্বস্তিতে রয়েছেন। এছাড়াও তার মাস্টার্স করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্প্রতি তিনি সাইপ্রাসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশের সংগঠন বাংলাদেশ কমিউনিটি অব সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। মূলত সাইপ্রাসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন অবদান রাখায় তিনি এ সম্মাননা অর্জন করেছেন। ভবিষ্যতেও তিনি এভাবে দেশটিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাশে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান।

সর্বশেষ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তার থেকে পরামর্শ চাওয়া হলে তিনি একটি কথা বারবার বলেন যে সবাইকে তার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকতে হবে। জীবনে দুঃসময় আসবে কিন্তু কখনো ভেঙ্গে পড়া যাবে না। নিজের প্রতি আস্থাশীল থাকতে হবে। এছাড়াও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা অনেক মানুষকে দেখি হয়তো বা নির্ধারিত বয়সের মধ্যে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে না পারলে অনেকে হতাশায় মুষড়ে পড়েন। এছাড়াও পারিপার্শ্বিকতার চাপ তো রয়েছে। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন যে বয়সটা মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে আপনার স্পৃহা আর আপনার কাজের দক্ষতা। আপনি যদি নিজেকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারেন তাহলে বয়সের থেকে আপনার কাজ কিংবা অর্জিত জ্ঞানকে মানুষ বেশি মূল্যায়ন করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এছাড়াও আমাদের দেশ থেকে অনেকে দেখা যায় স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আসলেও পরে লেখাপড়া শেষ করতে চায় না। তার উদ্দেশ্য তখন হয়ে যায় হয় কোনো একটি উন্নত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করা অথবা কাজের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করা। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন যে তার জীবনে যতো বাধা-বিঘ্ন থাকুক লেখাপড়া যেনও শেষ না করা পর্যন্ত তিনি যেনও থেমে না যান। শিক্ষার শেকড় তেঁতো হলেও ফল মিষ্টি। তাই তিনি বলেছেন যে যতো কষ্ট হোক যদি সঠিকভাবে কেউ তার ডিগ্রি সমাপ্ত করতে পারেন তার জন্য ক্যারিয়ার গঠনের যতোগুলো রাস্তা খোলা থাকবে অন্য কোনও পদ্ধতিতে তা কোনও দিন সম্ভব হবে না। এজন্য তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দেন এবং অন্য কোনও ব্যক্তি সেটা হতে পারে কোনও দালাল বা অ্যাজেন্সি কিংবা তৃতীয় কোনও পক্ষ কারও দ্বারা যেনও কেউ প্ররোচিত না হন সে বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন তিনি।

পরিশেষে তিনি সাইপ্রাসে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে তার পাশে থাকার জন্য এবং তাকে বাংলাদেশ কমিউনিটি অব সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্য থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ,
ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স,
ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা,স্লোভেনিয়া

 


আরো সংবাদ