চাষী নজরুলকে মনে পড়ে

মো: রফিকুল ইসলাম

পৃথিবীতে কেউই চিরস্থায়ী নয়, নিয়মের পথ ধরে একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। এমন বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। ১১ জানুয়ারি ২০১৫ সালে কালজয়ী চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দূরে, বহু দূরে, না ফেরার দেশেÑ এটাই সত্য। আর এটাও সত্য যে, সৃষ্টিশীল ভালো মানুষের কখনো মৃত্যু হয় না। তার সৃষ্ট কর্মই তাকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের মধ্যে, মানুষের হৃদয়ে, যুগ থেকে যুগান্তর। কালজয়ী চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম এমনই একটি নাম। দীর্ঘ দিনের সহযাত্রী হিসেবে চাষী ভাইয়ের সাথে আমার এত স্মৃতি রয়েছে যে, যা এই স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবু কিছু স্মৃতি কথা, চাষী ভাইয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
যত দূর মনে পড়ে ১৯৯০ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র অঙ্গনের শক্তিশালী একটি প্রতিনিধিদল এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য তৎকালীন ধানমন্ডি ২৭ নম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসেছিল। আমি তখন একজন তরুণ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী। জাসাস জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। ম্যাডাম আসতে একটু বিলম্ব হওয়ায় আমরা জাসাসের নেতারা চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের সঙ্গ দিচ্ছিলাম এবং আগত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের সাথে এরশাদবিরোধী আন্দোলন নিয়ে কথাবার্তা ও পরিচিত হচ্ছিলাম। একপর্যায়ে আমি আমার প্রিয় মানুষ, প্রিয় চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলামের সাথে পরিচিত হলাম।
চাষী নজরুল ইসলাম তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি। এমনিতে তিনি খ্যাতিমান মানুষ, বয়সে তিনি আমার চেয়ে প্রবীণ, তার সাথে একজন তরুণ সাংস্কৃতিক সংগঠকের কথাবার্তা কী ধরনের হওয়া উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অন্য দিকে আমি তার আজীবন ভক্ত। প্রিয় মানুষকে এত কাছে পেয়ে সে দিন আমার গর্বে বুক ভরে উঠেছিল। অল্প সময়ের পরিচয়ে তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। মনে হলো তিনি আমার অনেক যুগের, অনেক চেনা-জানা অতি আপনজন। চাষী ভাই এমনই একজন মানুষ যিনি পরিচিত-অপরিচিত সবারই পরমাত্মীয় হয়ে যেতেন নিজের অজান্তেই।
১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ গণতন্ত্র মঞ্চ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চাষী নজরুল ইসলামের অসামান্য অবদানের কথা কেউ জানুক আর না জানুক আমরা যারা জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সাথে জড়িত, আমরা সবাই খুব কাছে থেকে জানি এবং দেখেছি। এ ব্যাপারে চাষী ভাইয়ের ভূমিকা দেখে আমরা অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, যে মানুষটি রাজনীতির প্রতি এত অনীহা প্রকাশ করেছেন সব সময়ই, সেই মানুষকে বিএনপির দুঃসময়ে গণতন্ত্র মঞ্চে উঠে একজন সাহসী রাজনীতিবিদের মতোই ভূমিকা পালন করতে দেখে। এরপর চাষী ভাই কখন কিভাবে নিজের অজান্তেই জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের একজন সক্রিয় বন্ধুতে পরিণত হয়েছেন- তা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না।
চাষী নজরুল ইসলাম ছিলেন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি, জোটের মহাসচিব হিসেবে চাষী ভাইকে অনেক কাছে থেকে দেখার, জানার এবং বোঝার সুযোগ আমার হয়েছিল। কালজয়ী চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম ছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের অন্যতম নেতা। পেশাজীবীসহ ন্যায়সঙ্গত প্রতিটি গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সব সময়ই তিনি ছিলেন সক্রিয়। চলচ্চিত্রের অশ্লীলতার বিরুদ্ধে তার সোচ্চার ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে চাষী ভাইয়ের দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড, সামাজিক মূল্যবোধ, পরোপকারী মনোভাব ছিল অবাক হওয়ার মতো। তিনি অন্যায়ের সাথে কখনো আপস করতেন না। চাষী নজরুল ইসলাম হয়তো তাই হতে পেরেছিলেন একজন কালজয়ী মানুষ।
ক্যান্সার আক্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী চাষী নজরুল ইসলামের চিকিৎসার বিষয়টি ছিল খুবই ব্যয়বহুল। এই ব্যয় বহন করার মতো টাকা চাষী ভাইয়ের ছিল না। তবু চিকিৎসার কোনো কমতি ছিল না। কারণ চাষী ভাইয়ের মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত ভক্ত-অনুরাগী, আত্মীয়-পরিজন তার পাশে ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর নির্মাতা একই সাথে স্বাধীন দেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম ১১ জানুয়ারি ২০১৫ ভোর ৫টা ৫২ মিনিটে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের পর দেশব্যাপী চরম শোকের ছায়া নেমে আসে।
লেখক : মহাসচিব, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.