০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বাংলাদেশে খ্রিস্টান তরুণ-তরুণী : প্রেমের টান নাকি ধর্মান্তরের মিশন

বাংলাদেশে খ্রিস্টান তরুণ-তরুণী : প্রেমের টান নাকি ধর্মান্তরের মিশন - ছবি : সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেম। সেই প্রেমের টানে দুই-এক মাস, কখনো ৬ মাস কিংবা এক বছরের মাথায় হুট করে বাংলাদেশে ছুটে আসছে ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ-তরুণীরা। কখনো দিনমজুর, কখনো নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছেলে কিংবা মেয়েকে ঘটা করে বিয়ে করছে প্রেমেপড়া এসব ভিনদেশীরা। গণমাধ্যম বলছে, চলতি বছর পনেরোটির বেশি এমন ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ভিন্নধর্মের। তারা ধর্ম বদল করে বাংলাদশী মুসলিম যুবকদের বিয়ে করছে।

চলতি বছর এসব ঘটনা বেড়ে যাবার পর নড়েচড়ে বসেছে সচেতন মহল। তারা বলেছেন, প্রচলিত আইনে এ ধরনের বিয়েতে কোনো বাধা না থাকায় কেউ কেউ আবেগের টানে প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন। এর পেছনে অসৎ কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে। জানা গেছে, ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়েছে।

 খ্রিস্টান মিশনারীদের ঘ্রাণ!
প্রেমের টানে বিয়ে করার জন্য এদেশে যেসব বিদেশী নাগরিক আসে তাদের মধ্যে দুটি ক্যাটাগরি দেখা যায়। একশ্রেণি বাংলাদেশে এসে বিয়ে করে স্বামী বা স্ত্রীকে নিয়ে আবার নিজ দেশে চলে যায়। এরা বেশিরভাগ মুসলিম হয়ে ইসলামিক বিধান মোতাবেক বিবাহের মাধ্যমে সংসার করে। অন্য এক শ্রেণি, এদেশে বসবাস করার জন্যই পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে বাংলাদেশে আসছে। বিয়ে করার মাধ্যমে এদেশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করাটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

সেভ বাংলাদেশ মিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব বিদেশী প্রেমের টানে বাংলাদেশে আসে তারা অধিকাংশই খৃস্টান রাষ্ট্রের নাগরিক। আপাতদৃষ্টিতে প্রেমের টান হলেও তাদের আছে দীর্ঘমেয়াদী কিছু গোপন ‍পরিকল্পনা। তারা তাদের ধর্মান্তরের মিশন বাস্তবায়নের জন্য মূলত বাংলাদেশসহ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহে যাচ্ছে। তারা অনেকেই খ্রিস্টান মিশনারী কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। খৃস্টান ধর্মতত্ত্ব ও আধুনিক শিক্ষায় তারা উচ্চশিক্ষিত। খৃস্টান মিশনারী সংস্থা কর্তৃক নিযুক্ত।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘খ্রিস্টান মিশনারীরা এদেশে আসার পর তারা এখানকার গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতির আলোকে মিশে যায়। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হলেও তারা বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে। অনেক সময় মুসলিম নাম ও লেবাস ব্যবহার করে। মানুষকে সাহায্য ও বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসা ও শিক্ষা সেবা, লোন প্রদান, কর্মসংস্থানের সৃষ্টিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা। এসব করতে করতে এক পর্যায়ে মানুষদেরকে খ্রিস্টান ধর্মের দিকে আহ্বান জানায়। এবং অনেক মানুষকে খৃস্টান বানায়।

খ্রিস্টান ধর্মে আহ্বান ও খ্রিস্টান বানানোতে তাদের আছে হরেক রকমের কলাকৌশল। তারা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ধর্ম, প্রথা-মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির আলোকে তাদের মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে ধর্মান্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যেমন- বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলা ভাষায়, ইসলামিক টার্ম, লেবাস, রেফারেন্স ব্যবহার করে ইসলামের মতো করে ধর্মপ্রচার ও ধর্মান্তর করে থাকে। বাঙালি হিন্দুদের ক্ষেত্রেও হিন্দু ধর্ম, ও সংস্কৃতির মতো করে তারা ধর্মপ্রচার করে থাকে। উপজাতিদের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ভাষায় তাদের প্রথা ও মূল্যবোধের সাথে সমন্বয় করে খ্রিস্টান বানায়।’

প্রতিবেদনে যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার রহিমার প্রেমের টানে আসা আমেরিকার ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস্ট মার্কের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, রহিমা মুসলিম হয়েও তার বুকে ক্রুশের চিহ্নের প্রতীক ব্যবহার করছে। এক ইউটিউবার তার বুকের ক্রুশ চিহ্ন দেখিয়ে সে খ্রিস্টান হয়েছে কি না জানতে চাইলে রহিমা বললো, ‘সে খ্রিস্টান হয়নি। তবে, যীশু খ্রিষ্টকে ভালোবাসে। সে তার অনুসারী। তার ভালোবাসার অংশ হিসেবে তিনি ক্রুশ চিহ্ন বুকে ধারণ করেন।’ এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, উপরে মুসলিম দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে কিংবা তাকে ভুল কিছু বোঝানো হয়েছে।

গোয়েন্দা বিভাগের বক্তব্য
এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার বিভাগ সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং মনিটর করছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার তারেক বিন রশিদ। তিনি বলেন, ‘ভিনদেশী অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে প্রেমের টানে বাংলাদেশে আসেন। বিয়ে করেন। প্রাথমিকভাবে এটাকে ইতিবাচক মনে হলেও এর পেছনে অনেক সময় প্রতারণা কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার বিভাগ সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং মনিটর করছে।’

কী বলছে দাওয়াহ বিভাগগুলো?
ভিন্নধর্মীকে বিয়ে করে তার বংশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সুযোগ নেয়া মিশনারীদের একটি দাওয়াতি কৌশল বলে মনে করেন ইসলামিক দাওয়াহ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি যোবায়ের আহমাদ। তিনি বলেন, ‘মুসলমান থেকে খৃস্টান হয়েছিল একটা লোক। আমাদের দাওয়াতের মাধ্যমে সে আবার মুসলমান হয়েছে। লোকটি আমাকে মিশনারীদের দাওয়াতের কৌশল সম্বলিত একটি শিট দিয়েছিল। তাতে দাওয়াতের একটি কৌশল হিসেবে ভিন্নধর্মীকে বিয়ে করার প্রসঙ্গটিও ছিল।’

বাংলাদেশের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝিনাইদহের ভগবাননগরে একজন লোক নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে আলিয়া মাদরাসার এক শিক্ষকের মেয়েকে বিয়ে করে। পরে দেখা গেলো, লোকটি মুসলমান নয়, খ্রিস্টান। সে তার স্ত্রীকেও খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলে। এভাবে অনেকে প্রতারণাও করে।’

প্রেমের টানে ছুটে আসাদের প্রসঙ্গে প্রখ্যাত এই দাঈ বলেন, বাংলাদেশেও অনেকে এসে এখন মুসলিম হয়ে বিয়ে করছে। এখানে একটি আশঙ্কা থেকেই যায়, তারা মিশনারীদের হয়ে কাজ করছে কি না। এক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা বিয়ে করে স্ত্রীর বংশের মধ্যে কৌশলে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজ করে। অনেকে বাংলাদেশ থেকে যখন বিয়ে করে নিয়ে যায়, তাদের দেশে গিয়ে খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলে। অধিকাংশ সময় এটাই হয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুরের আন নূর মাদরাসার উচ্চতর দাওয়াহ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক ও দাঈ মাওলানা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে প্রেমের ছড়াছড়ির কারণেই মূলত এমন হচ্ছে। ঢালাওভাবে বলা যাবে না, যারা এদেশে এসে বিয়ে করছে, তারা সবাই খ্রিস্টানদের হয়ে কাজ করছে। তবে এটা ঠিক, এদের মধ্যে অনেকে খ্রিস্টান মিশনারী এজেন্ডা নিয়ে আসে। নতুবা বিদেশ থেকে যারা প্রেমের টানে আসছে, তাদের মধ্যে হিন্দুও আছে। যেমন কদিন আগে ভারত থেকে আসা এক হিন্দু মেয়েকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

খ্রিস্টান মিশনারীর ব্যাপারটি একদম নাই তা বলা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এদেশে খৃস্টান মিশনারীর দৌরাত্ম দিনদিন বাড়ছে। তারা অনেকভাবে অনেক উপায়ে খৃস্টান মতবাদ ছড়ায়। সেই অনেক উপায়ের একটি মাধ্যম এটাও হতে পারে। তবে ঢালাওভাবে বলা যাবে না।’


আরো সংবাদ


premium cement