ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১১ ফাল্গুন ১৪১৮, ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩

লেখক কর্নার

ফিলিস্তিনি প্রস্তাবে ভেটো ওয়াশিংটনের জন্য অশুভ পরিণতি বয়ে আনবে

২০১১-০৯-২৩

দুই হাজার এক সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারজন দুর্ধর্ষ পাইলট চারখানি জেট যাত্রী বিমান ছিনতাই করেন। দু’খানি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উভয় টাওয়ারে আঘাত করে। তৃতীয় বিমানখানি ওয়াশিংটনে প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনে আঘাত হানে। চতুর্থ বিমানখানিও যাচ্ছিল ওয়াশিংটনের দিকে। কিন্তু সে বিমানের যাত্রীরা পাইলটের সাথে ধস্তাধস্তি করে এবং বিমানখানি ফিলাডেলফিয়ার এক মাঠে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। সব মিলিয়ে তিন হাজারের কম লোকের প্রাণহানি হয়েছে সে দিনের এসব সন্ত্রাসী ঘটনায়। কিন্তু সে ঘটনার জের ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়েক লাখ মানুষ মারা গেছে।
নাইন-ইলেভেন (ইংরেজি নবম মাসের ১১ তারিখ) নামে বর্ণিত সে ঘটনার দশম বার্ষিকী উদযাপন বেশ ঘটা করেই হয়েছে আমেরিকায় এবারে। কিন্তু বিষয়টাকে নিয়ে সূক্ষ্ম চালে রাজনীতিও কম হয়নি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনের অনুষ্ঠানে সস্ত্র¿ীক শরিক হয়েছিলেন। সেটা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আগামী বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা পাওয়ার জন্য তাকে কঠিন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথম দফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করবেন। চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে কম্যান্ডো পাঠিয়ে সে প্রতিশ্রুতি যে তিনি পালন করেছেন সে ব্যাপারটা মার্কিন ভোটারদের পরোক্ষে হলেও স্মরণ করিয়ে দেয়া অবশ্যই তার একটা উদ্দেশ্য ছিল।
নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারাভিযান শুরু করেন যে ‘সন্ত্রাসী ইসলাম জুডিয়ো-খ্রিষ্টান সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। তার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং তার অনুগত বন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ‘ইসলামি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এবারের ১১ সেপ্টেম্বর ব্যাপকভাবে প্রশ্ন উঠেছে : সে যুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিনিদের জয় কতখানি হয়েছে? প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই জবাব ছিলÑ খুব বেশি নয়।
বেশি যে নয় সেটা সাদা চোখেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নাইন-ইলেভেনের এক মাসের মধ্যেই (৭ অক্টোবর ২০০১) জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ার আফগানিস্তান আক্রমণ করেন। পরে উত্তর অতলান্তিক চুক্তি সংস্থা নেটোকেও সে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রথমে ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল বিন লাদেনকে হত্যা ও আলকায়েদাকে ধ্বংস করা। পরে যুদ্ধের লক্ষ্য সম্প্রসারিত করে তালেবান দলের (যারা কিছুকাল সে দেশের শাসকদল ছিল এবং বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল) বিরুদ্ধেও আক্রমণ শুরু হয়। কাদামাটিতে আটকে যাওয়া পায়ের মতো সে যুদ্ধ আটকে গেছে। নাইন-ইলেভেনের দশম বার্ষিকী উপলক্ষে তালেবানদের হামলায় ৮০ জন মার্কিন সৈন্য আহত হয়। তার দু’দিন পর তালেবানরা একযোগে কাবুলের মার্কিন দূতাবাস এবং নেটোর সদর দফতরে হামলা চালায়। একটানা ২০ ঘণ্টা চলেছিল বোমা, রাইফেল আর মর্টারের সে যুদ্ধ। এ যুদ্ধের জের ধরে মার্কিনিরা তাদের বিঘোষিত মিত্র পাকিস্তানকেও জড়িয়ে ফেলেছে। মার্কিন হেলিকপ্টার ও পাইলটবিহীন ড্রোন বিমান থেকে প্রায়ই পাকিস্তানি ভূমির ওপর আক্রমণ হচ্ছে। মার্কিন কম্যান্ডোরাও প্রায়ই পাকিস্তানে ঢুকছে। মে মাসে তো তারা অ্যাবোটাবাদে (যেখানে পাকিস্তানের প্রধান সামরিক অ্যাকাডেমি অবস্থিত) এসে বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল।
আফগানিস্তানের দেড় বছর পরে (২০০৩ সালের ২০ মার্চ) আমেরিকা আর ব্রিটেন ইরাক আক্রমণ করে। বুশ ও ব্লেয়ার অজুহাত দিয়েছিলেন যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন আলকায়েদাকে মদদ দিচ্ছিলেন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক মারণাস্ত্র মজুদ করেছেন এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন। টনি ব্লেয়ার তো পার্লামেন্টে সম্পূর্ণ মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সাদ্দাম হোসেন হুকুম দিলে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির ওপর রাসায়নিক অস্ত্রের আক্রমণ সম্ভব। মার্কিন গোয়েন্দাদেরও কেউ কেউ তখনো বলেছিলেন, সাদ্দাম আলকায়েদাকে সাহায্য দিয়েছেন বলে প্রমাণ নেই। জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারী দল ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারেনি। কোনো কোনো মার্কিন বিশেষজ্ঞসহ বিশ্বব্যাপী অনেকে বলেছিলেন, ইরাকের অস্ত্রের পাহাড়ের অভিযোগ মোটেই সত্যি নয়। কেউ কেউ তো বলেছিলেন যে সে কাল্পনিক অস্ত্রের মজুদের কাহিনী ইসরাইলের গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ ইঙ্গ-মার্কিন গুপ্তচর বাহিনীগুলোর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। সে কথা পরে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল এবং ইরাক দখলের পর মার্কিনিরা তন্নতন্ন অনুসন্ধান করেও কোনো মজুদ অস্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি।

ধরা পড়ে খোঁড়া কৈফিয়ত
জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ার তখন সুর পাল্টালেন। তারা দাবি করলেন যে, আসলে তারা সাদ্দাম হোসেনের কবল থেকে ইরাকের মানুষকে মুক্ত করতে এবং তাদের গণতন্ত্র দিতেই ইরাক আক্রমণ করেছিলেন। মুখে যাই বলুক মার্কিনিরা ইরাক ছেড়ে যাবে না। সে দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা ১৮টি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে, বলছে যে শান্তি রক্ষায় (তাদের হাতে তৈরী) ইরাকি সরকারকে সাহায্য করতেই তারা ‘কিছু’ সংখ্যক সৈন্য সে দেশে রাখবে। ইরাক আর আফগান যুদ্ধে কয়েক হাজার মার্কিন সৈন্যসহ বহু মানুষ মারা গেছে, বিকলাঙ্গ হয়েছে আরো কয়েক লাখ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই ব্যয় হয়েছে কয়েক লাখ কোটি ডলার। বস্তুত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র দেউলিয়া হওয়ার পূর্বাবস্থায় আছে, একমাত্র চীনের কাছেই তার ঋণের পরিমাণ একাধিক ট্রিলিয়ন। কিন্তু কারোই বুঝতে বাকি নেই যে ইরাকের অঢেল খনিজ তেলের একচেটিয়া সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই ওয়াশিংটন সে দেশ আক্রমণ করেছিল। ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তারা মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক পরাশক্তি হতে চায়। সেটা ওয়াশিংটনেরও কাম্য। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে তার স্বার্থ রক্ষার একটা ফাঁড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সাদ্দাম হোসেনকে ইসরাইল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছিল। যুক্তরাষ্ট্র আর ব্রিটেনকে প্রভাবিত করে সে ভয়ের কাঁটা দূর করিয়ে নিয়েছে।
আফগানিস্তানেও ইসরাইলি-মার্কিনি দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ জড়িত আছে। ইসরাইলের দৃষ্টিতে তার অপর শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ ইরান। পারমাণবিক বোমার অধিকারী জঙ্গি পাকিস্তানকেও তাদের ভয়। ইরানের এক দিকে মার্কিন দখলীকৃত ইরাক। অন্য দিকে মার্কিন সমরশক্তি মজুদ আফগানিস্তানে। বাড়তি মার্কিন প্রলোভন আফগানিস্তানের মূল্যবান খনিজ সম্ভাবনা। তা ছাড়া কাস্পিয়ান সাগর থেকে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে আরব সাগর পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন তৈরি করা মার্কিনিদের দীর্ঘকালের পরিকল্পনা। তাই যে ভণিতাই তারা করুক ইরাক আর আফগানিস্তানে ইঙ্গ-মার্কিন যুদ্ধ মোটেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না।

ইসলাম সন্ত্রাসী নয়, মিথ্যা অপবাদ নির্বুদ্ধিতার কাজ ছিল
সন্ত্রাসী ইসলাম জুডিয়ো-খ্রিষ্টান সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেÑ এ দাবি করে ইসরাইল-দোসর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যে কি ভুল করেছে সেটা তারা তখন বুঝতে পারেনি। প্রকৃত প্রস্তাবে বিশেষ একটা গোষ্ঠী ইসরাইলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আন্দোলন শুরু করেছিল। ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করায় সন্ত্রাসীদের আক্রোশ গিয়ে পড়েছে মার্কিনিদের ওপর। ‘সন্ত্রাসী ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে ব্লেয়ার আর বুশ সারা বিশ্বের ১২০ কোটি মুসলমানকে অপমানিত করেছে। ব্রিটেন ও আমেরিকায় বহু দাড়ি-টুপিধারীকে পুলিশি অপমান ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, বহু আদর্শবান মুসলিম তরুণকে অযথা গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ গুয়ানতানামো শিবিরে এখনো আটক আছে। বহু আদর্শবাদী মুসলিম তরুণ ধর্মীয় অপমানের প্রতিশোধ নিতে সত্যি সত্যি সন্ত্রাসের পথ ধরেছে। এটা একটা বিশ্বজনীন চিত্র। যেখানে যে গোষ্ঠী নিজেদের নির্যাতিত মনে করছে তারাই আলকায়েদার অনুকরণে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছে। এর বিরুদ্ধে বিজয় সহজ কথা নয়।
মনে রাখতে হবে নাইন-ইলেভেন আলকায়েদার সন্ত্রাসের প্রারম্ভ নয়। নব্বইয়ের দশকে তারা কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, কয়েক শ’ মার্কিনি তাতে মারা গেছে। আলকায়েদার সংস্থান বলে ভুল করে প্রেসিডেন্ট বিল কিনটনের আমলে সুদানের এক বিরাট ওষুধ নির্মাণ কারখানা মার্কিনিরা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘায়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। আলকায়েদা সন্ত্রাসীরা এডেন বন্দরে নোঙর করা মার্কিন রণতরীতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক ডজনেরও বেশি মার্কিন নৌসেনাকে হত্যা করেছিল। আরো মনে রাখতে হবে যে, ওসামা বিন লাদেনকে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল শিখিয়েছিল মার্কিন বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
তখন স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছে। সোভিয়েতরা আফগানিস্তানের দখলদার শক্তি। ঐতিহাসিককাল থেকে আফগানরা কখনো বিদেশী দখলকার সহ্য করেনি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। আফগানরা উপজাতীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বহু ভাগে বিভক্ত। কিন্তু তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোভিয়েত হানাদারদের বিতাড়নের জন্য গেরিলা যুদ্ধ চালাচ্ছিল। তাদের মদদ দেয়ার জন্য মার্কিনিরা প্রশিক্ষণ দিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইর মাধ্যমে ওসামার গেরিলাদের আধুনিক সমরাস্ত্র পাঠিয়েছিল। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়, তাদের দখলদার বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। বিন লাদেন দেখলেন ইসরাইলকে সমর্থন দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদের নির্যাতনে সহায়তা করছে। মাত্র তখনই তিনি মার্কিনিদের বিরুদ্ধে তৎপর হলেন।

সন্ত্রাসের মূল কারণ ইসরাইল
কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষ করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরবদের সন্ত্রাসী গেরিলা যুদ্ধ আরো পুরনো। আরব-অধ্যুষিত ফিলিস্তিনে মার্কিন-ব্রিটিশ চক্রান্তে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। তার আগে থাকতেই ইউরোপীয় ইহুদি সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ শুরু করে। শেষ অবধি জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবে যে পরিমাণ ভূমি তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল তার অনেক বেশি এলাকা তারা দখল করে নেয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় আট হাজার আরব পরিবার উৎখাত হয়। বংশধরদের মিলিয়ে সাত মিলিয়ন (৭০ লাখ) ফিলিস্তিনি এখন লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাস্তুহারা আরবরা সুযোগ পেলেই নিজেদের ভিটেবাড়িতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তার জের ধরে ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ হয়। পশ্চিমী সাহায্যপুষ্ট ইহুদি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত পূর্ব জেরুসালেম, জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ও গাজা, মিসরের সাইনাই উপদ্বীপ ও সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ একাধিক প্রস্তাবে ইসরাইলকে এসব দখলীকৃত ভূমি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়, সেসব প্রস্তাবে বলা হয় যে দখলীকৃত ভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপন অবৈধ হবে।
কিন্তু ইসরাইল সেসব প্রস্তাব মান্য করেনি। ১৯৮১ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ পন্থায় ইসরাইলের সাথে একতরফা শান্তিচুক্তি করে সাইনাই উপদ্বীপ ফিরে পান। কিন্তু ইসরাইল অন্য দখলিকৃত এলাকাগুলোতে ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু করে। পরিষ্কার হয়ে যায় যে যুক্তরাষ্ট্র সব প্রকারে ইসরাইলকেই সমর্থন দেবে। ফিলিস্তিনি ও আরব সন্ত্রাসের জন্ম তখন থেকে। তাদের প্রথম বড় সাফল্য ছিল ১৯৭২ সালে। মিউনিখ অলিম্পিকে হানা দিয়ে তারা কয়েকজন ইহুদি প্রতিযোগীকে হত্যা করে। পরের বছরে তারা ভূমধ্যসাগরে আকিলে লারু নামে একখানি প্রমোদ জাহাজ ছিনতাই করে একজন মার্কিন ইহুদিকে হত্যা করে।

ইহুদি আধিপত্যবাদ
আগেই বলেছি ওয়াশিংটন ইসরাইলকে আরব বিশ্বে তাদের প্রতিভূ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু আরো বড় কারণ আছে। বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের সংখ্যা বেশি নয়, বৃহত্তর ঢাকা নগরীর জনসংখ্যার সমানও হবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক বুদ্ধি তাদের ঐতিহ্যগত। সে ঐতিহ্য ব্যবহার করে তারা ধনতন্ত্রী বিশ্বের অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। অর্থনৈতিক শক্তি সব সময় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। গোটা পশ্চিম ইউরোপে ইহুদিদের রাজনৈতিক শক্তি সে কারণেই প্রায় দুর্জেয়। যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ইহুদি আছে আড়াই লাখের সামান্য বেশি। কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মোট ৬৫০ জন সদস্যের মধ্যে ইহুদি সদস্যের সংখ্যা আনুমানিক দেড় শ’রও বেশি হবে।
কিন্তু ইহুদিদের দাপট যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি। সে দেশের অর্থনীতি, মিডিয়া, তেল ও অস্ত্রের ব্যবসায় ইত্যাদি বলতে গেলে তাদের কুক্ষিগত। তার ওপর নির্বাচনী ব্যয় ইত্যাদি বাবদ তারা মার্কিন রাজনীতিকদের অর্থ সাহায্য দেয়। সে দেশে বেশ কয়েকটি ইসরাইলি লবির মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছে আমেরিকান-ইসরাইলি পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি, আইপ্যাক। বলা হয়ে থাকে যে আইপ্যাকের বিরোধিতা করে মার্কিন কংগ্রেসে কোনো আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। বিচিত্র নয় যে মার্কিন কংগ্রেস, এমনকি প্রেসিডেন্টও ইসরাইলের অঙ্গুলি তাড়নে পরিচালিত হন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আরব-ইসরাইলি বিরোধ মীমাংসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের চার মাস পর ২০০৯ সালের মে মাসে কায়রোয় এক বক্তৃতায় ওবামা শান্তি আলোচনা শুরু করার পূর্বশর্ত হিসেবে ইসরাইলকে অবৈধ ইহুদি বসতি নির্মাণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন, বসতি নির্মাণ তিনি বন্ধ করবেন না। অর্থাৎ ইসরাইল আর ওয়াশিংটনকে ভয় করে না, ওয়াশিংটন ভয় করে ইসরাইলকে। এ ক্ষেত্রে লেজ কুকুরকে নাচাচ্ছে।
বসতি নির্মাণ এখন পুরোদমে চলছে। পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি এখন দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূমির অধিবাসী। ক্রমেই বেশি ফিলিস্তিনি ভূমি ইহুদিরা দখল করে নিচ্ছে। শিগগিরই অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জমি অবশিষ্ট থাকবে না। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ঘোষণা করেছেন, চলতি সপ্তাহে (খুব সম্ভবত শুক্রবার ২৩ সেপ্টেম্বর) তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিদানের জন্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আবেদন পেশ করবেন। ইসরাইল এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র তার তীব্র বিরোধী। নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিনিরা জাতিসঙ্ঘে আবেদন করলে তার পরিণাম খুবই খারাপ হবে। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন এবং জাতিসঙ্ঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুজান রাইস বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদে সে রকম কোনো আবেদন হলে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেবে।

ওয়াশিংটন ন্যায়ের পক্ষে নয়
ওয়াশিংটন আর তেলআবিব বলছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন হতে হবে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের দ্বিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার ভিত্তিতে। সমস্যা হচ্ছে অবৈধ বসতি নির্মাণ চালু রেখে এবং অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি করে তেলআবিব শান্তি আলোচনা অর্থহীন কিংবা অসম্ভব করে রেখেছে। গত এক বছরে কোনো শান্তি আলোচনা হয়নি। এ সময়ের মধ্যে ইসরাইল আরো কয়েক হাজার অবৈধ বাড়ি তৈরি করেছে ফিলিস্তিনিদের জমিতে। মাহমুদ আব্বাসের কৌশল নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে মনে হ


সকল সংবাদ