২২ নভেম্বর ২০১৯

খাদ্যনীতিতে ভালো দিকগুলো পরিপূর্ণভাবে পুনর্বিবেচনা করা উচিত : এস্থার ডুফলো

ভিন দেশ
-

এস্থার ডুফলো। তিনি একজন ফরাসি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। সম্প্রতি তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। তিনি এ নোবেল পান বিশ্বের দ্বিতীয় নারী হিসেবে। এমনকি অর্থনীতিতে পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ নোবেল জয়ীও তিনি। মজার বিষয় হচ্ছে, তার স্বামী অভিজিৎ বিনায়কও পান অর্থনীতিতে নোবেল। নোবেল জয়ীদের তালিকায় আরো একজন মাইকেল ক্রেমারও ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। সম্প্রতি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া তিনজনের নাম ঘোষণা করল দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমি।
এস্থার ডুফলোকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ বা প্রশংসনীয় পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের কারণে। গত ১৬ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের সেক্রেটারি গোরান হ্যানসন বলেছেন, ‘সারা বিশ্বে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এর আগে অর্জন করা দক্ষতাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছে ডুফলোর এসংক্রান্ত গবেষণা। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে সারা বিশ্বে গবেষণার সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে তার পরীক্ষামূলক পদ্ধতিগত উন্নয়ন। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়ে এর কী ফল আসতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালান এস্থার ডুফলো। ডুফলো এসংক্রান্ত ভালো ফল পাওয়ার জন্য তার কার্যক্রমকে অনেক সময় ছোট ছোট অংশে ভাগ করেও দেখেন কী ফল আসতে পারে। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, তার এসংক্রান্ত কমবেশি ভালো ফল আমরা দেখতে পেরেছি। মাঝে মধ্যে তার ইস্যুভিত্তিক গবেষণাগুলো প্রয়োগ করেন নানা দেশে। দেখা গেছে দারিদ্র্য দূর বা বিমোচনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ভালো ফল মিলেছে তার গবেষণার পদ্ধতি অনুসরণের কারণে। বহু মানুষ তাতে সরাসরিও উপকৃত হয়েছে। ডুফলো মনে করেন, যথাযথ পরিমাণে ভর্তুকির ব্যবস্থা নিতে হবে আগাম প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে। অবশ্য সম্প্রতি অনেক দেশ এ ধরনের সুন্দর পদক্ষেপ নিয়ে আশানুরূপ ফল পাচ্ছে। পৃথিবীর দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণার জন্য ২০১৩ সালে ‘আবদুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’ গড়ে তোলেন যুগ্মভাবে স্বামী অভিজিৎ ও এস্থার।
জাতীয় ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বা এনবিইআর-এর গবেষণা সহযোগী এস্থার ডুফলো। পাশাপাশি ব্যুরো ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যানালাইসিস অব ডেভেলপমেন্ট বা বিআরএডি বোর্ড সদস্য। এমনকি অর্থনীতি ও নীতি গবেষণা কেন্দ্রের (উন্নয়ন অর্থনীতি কর্মসূচির) সাথেও জড়িত আছেন। ডুফলোর গবেষণাটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এসব দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবারের আচরণ ইত্যাদি অধিকার নিয়ে কাজ করেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন বিশ্ব অর্থনীতিতে কার্যকরণীয় সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা খঁজে পাওয়ার জন্য।
এস্থার ডুফলোর জন্ম ফ্রান্সের প্যারিসে ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর। সেই হিসেবে তার বয়স এখন প্রায় ৪৬ বছর। ইকোলে নরমলে সুপরিওরে, প্যারিস (ফরাসি উচ্চারণ) নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিএ করেন। স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্স (সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগে উন্নত জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) থেকে ডিইএ ডিগ্রি অর্জন করেন। আর পিএইচডি করেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে।
এস্থার ডুফলো হাসপাতাল চিকিৎসক (শিশুবিশেষজ্ঞ) ভায়োলাইন ডুফলো এবং মিশেল ডুপলো (গণিতের অধ্যাপক)-এর মেয়ে। এস্থার ডুফলোর শৈশবে তার মা মাঝে মধ্যেই অংশ নিতেন চিকিৎসা মানবিক প্রকল্পে। ডুফলো ক্যারিয়ার বিবেচনা শুরু করেন রাজনীতিতেও। এটাকে সিভিল সার্ভিসও বলা হয়। তিনি মস্কোতে প্রায় ১০ মাস কাটান ১৯৯৩ সালে। ফরাসি ভাষা ভালো জানতেন বলে মানুষকে ফরাসি ভাষা শেখাতেন। কাজ করেছিলেন ইতিহাসের বিষয়েও। মস্কোতে তিনি যুক্ত ছিলেন ফরাসি অর্থনীতিবিদ হিসেবে। পরবর্তীকালে যুক্ত হন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমের সাথে। গবেষণা সহায়ক হিসেবেও কাজ করেন অর্থমন্ত্রীর পরামর্শের জন্য। গবেষণাগুলো তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে আসে যে, পৃথিবীতে ক্রিয়াশীল হিসেবে কাজ করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি একাডেমিক উচ্চাকাক্সক্ষাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। একপর্যায়ে মনোযোগ দেন ইন্দোনেশিয়ার স্কুল সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সাথে। তিনি বলেন, উন্নয়নশীল কোনো দেশে শিক্ষা বিস্তার মানে উচ্চ বেতনের নিশ্চয়তা পাওয়া। ২০০১ সালের দিকে এমআইটিতে যোগ দেন। এমআইটি মানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউ অব টেকনোলজি। ২০০২ সালে সহযোগী অধ্যাপকের পদ পাওয়ার পর বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁকপ্রবণতা আরো বৃদ্ধি পায় তার। সর্বকনিষ্ঠ অনুষদের সদস্য হন এমআইটিতে।
তিনি অলাভজনক (সেবামূলক) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথেও জড়িত ছিলেন। ২০০৩ সালে এ রকমই প্রায় ১২০টি বিদ্যালয়ে একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান শিক্ষক অনুপস্থিতি সম্পর্কে। প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ছবি তুলে তাদের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস করাতে সক্ষম হন ডুফলো। অর্থাৎ তাতে হ্রাস পেতে থাকে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির হার। এর ইতিবাচক প্রভাব আসে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও। প্রচুরসংখ্যক অভিজ্ঞতামূলক উন্নয়ন পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত অনুশীলনকারীদের দায়িত্বও নেন। এ সংক্রান্ত ল্যাবের শাখা আছে প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং ভারতের চেন্নাইয়ে।
এ দিকে সমাজকল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। আর উন্নয়ন সহযোগিতার জন্য তিনি লাভ করেন ফ্রন্টিয়ার অব নলেজ অ্যাওয়ার্ড। ডুফলো বুঝতে পারেন, বেশির ভাগ নারী আশা বাড়াতে থাকে তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধাগুলোর ব্যাপারে।
আমেরিকান অর্থনৈতিক জার্নাল : প্রায়োগিকয়ে অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ডুফলো। পাশাপাশি সহসম্পাদক ছিলেন অর্থনীতি ও পরিসংখ্যান এবং জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স (বিকাশ অর্থনীতি জার্নাল)-এর। একই সাথে অর্থনীতির বার্ষিক পর্যালোচনার সম্পাদকীয় কমিটির মেম্বার ছিলেন। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আন্তর্জাতিক বৃদ্ধি কেন্দ্র) অন্তর্গত হিউম্যান ক্যাপিটাল রিসার্চ প্রোগ্রামের অন্যতম সদস্য। তিনি দৈনিক পত্রিকাতেও লেখালেখি করেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি বক্তৃতার প্রধান বক্তা হিসেবেও বহুল পরিচিত। ডুফলো প্রচুরসংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেছেন ২০১৭ সালে। সেগুলো থেকে শীর্ষ কয়েকটি লেখা প্রকাশ পেয়েছে অর্থনৈতিক জার্নালে।
ফরাসি রাষ্ট্রপতি ডুফলোকে তার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, ‘এস্থার ডুফলোর নোবেল পুরস্কারটি রীতিমতো একটি ‘দুর্দান্ত নোবেল পুরস্কার’। তা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এখন পৃথিবীর সেরাদের মধ্যে রয়েছেন ফরাসি অর্থনীতিবিদেরা। তিনি এটাও বলেছেন, মানবকল্যাণে প্রশংসনীয় প্রভাব রাখতে পারে তার সব গবেষণাকর্ম।
ডুফলোকে এলেন বেনেট গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন; যা সম্মানিত করে ৪০ বছরের নিচের এ নারী অর্থনীতিবিদকে। বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক গবেষণার এমন কোনো দিক নেই যেখানে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ দিকে ২০০৫ সালে থিঙ্কট্যাঙ্ক সের্কেল ডেস ইকোনমিকাইটিস তাকে প্রদান করে সেরা তরুণ ফরাসি অর্থনীতিবিদ পুরস্কার। ২০০৮ সালে ম্যাগাজিন ফরেন পলিসি তাকে নাম দিয়েছে পৃথিবীর শীর্ষ ১০০ জনের একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে। ২০০৯ সালে পান ম্যাক আর্থার ফাউন্ডেশন ফেলো। ওই একই বছরে নির্বাচিত হন কালভি-আর্মেঙ্গল আন্তর্জাতিক পুরস্কারের প্রথম প্রাপ্তি হিসেবে। যা তিনি পান ২০১০ সালের ৪ জুন। বলা হয়েছে, তিনি যেন অর্থনীতি বা সামাজিক বিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় এক তরুণ গবেষক। এক পর্যায়ে তিনি পান জন বেটস ক্লার্ক পদক। বলা হয়েছে, তিনি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে। ২০১০ সালে নাম লেখান ফরচুন ম্যাগাজিনের ফরটি আন্ডার তালিকায়। একপর্যায়ে অর্থনীতিবিদ ডুফলোকে তালিকাভুক্ত করা হয় পৃতিবীর শীর্ষ আট তরুণ অর্থনীতিবিদ হিসেবে। ২০১০ সালে সম্মানিত হন ফরাসি অর্ডার অব মেরিটের সুযোগ্য অফিসার হিসেবে। ২০১৪ সালে সামাজিক বিজ্ঞান-অর্থনীতিতে ইনফোসিস পুরস্কার পান ‘উন্নয়ন অর্থনীতিতে একটি বড় পদক্ষেপ’ শীর্ষক কার্যক্রমের জন্য। ডুফলো পান স্পেনের প্রিন্সেস অব আস্ত রিয়াস সোস্যাল সায়েন্সের অ্যাডওয়ার্ড। ২০১৫ সালের দিকে ডব্লিউজেডবি বার্লিন সোস্যাল সায়েন্স সেন্টার থেকে পান এএসকে সামাজিক বিজ্ঞান পুরস্কার, যা সামাজিক বিজ্ঞানের অতি উঁচু মানের পুরস্কার; যার মূল্য প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার সমমানের। বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এখনো চরম দারিদ্র্যে বসবাস করছে বিশ্বের ৭০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। উন্নয়নকে অনেক সময় স্থবির করে বৈদেশিক সাহায্য। ডুফলো বলেন, বেশির ভাগ সময়ে জ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না দরিদ্রদের সমস্যাগুলো। এমনকি আকর্ষণীয় তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না তাদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব বিষয়ে। অনেক সময় তাৎক্ষণিক অলৌকিক বাজে ঘটনাবলি দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে দারিদ্র্যবিরোধী নীতির ক্ষেত্র বা বিষয়টি। আর সে কারণেই বিশ্বের বাজার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের জন্য কিভাবে কাজ করবে, তার দিকনির্দেশনা ঠিক করা দরকার। হতদরিদ্রদের জীবনকে লক্ষ্য করে একটি ১৮ দেশীয় উপাত্ত ব্যবহারের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, গ্রামীণ অঞ্চলে হতদরিদ্র বাসিন্দাদের ৩৬ থেকে ৭০ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৫৩ থেকে ৭৪ শতাংশ মোটামুটি পরিমাণে খাদ্য জোগাড়ে সক্ষম। এস্থার ডুফলো বলেন, খাদ্যনীতিতে ভালো দিকগুলো সম্পূর্ণভাবে পুনর্বিবেচনা করা উচিত সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে। খাদ্য সুরক্ষা প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে পর্যান্ত খাদ্যশস্য সরবরাহ করা উচিত।

 

 


আরো সংবাদ