২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

সাংবাদিকদের কাজ হলো নীরব করে রাখা মানুষদের সরব করে তোলা : ডেনা টাকরুরি ভিন দেশ

-

ডেনা টাকরুরি। জন্ম তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে। থাকেনও যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে। টাকরুরি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান একজন প্রথিতযশা নারী সাংবাদিক। পেশাগতভাবে তাকে সবাই চেনে উপস্থাপক, প্রযোজক প্রভৃতি হিসেবেও। পড়ালেখা শেষ করে পেশাগত কাজে নেমেছেন সেই ২০০৬ সালে। একনিষ্ঠা কাজ করে কাজের দক্ষতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেশ আগেই ডেনা টাকরুরি মনোনিবেশ করেছেন এজে প্লাস (এজে+) এর ফিল্ড ডকুমেন্টারি দলের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্রেকিং নিউজ, সামাজিক ন্যায়বিচারমূলক আন্দোলন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি। এজে প্লাস হচ্ছে আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক বা এজেএমএন নামক প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সংবাদ এবং চলমান ঘটনাবলি সম্প্রচারের চ্যানেল। এর সেবা মেলে ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম এবং টুইটারে লিখিত আকারে। তা প্রচার করা হয় আরবি ¯প্যানিশ, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায়। এর সদর দফতর দোহা এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে। তিনি পুরস্কার বিজয়ী ডকুসিরিজ, টিভি ডকুমেন্টারি ‘ডাইরেক্ট ফ্রম উইথ ডেনা টাকরুরি’ এর নিমন্ত্রিত বা স্বাগতিক ব্যক্তিত্ব। এ শোর মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে পানির দুষ্প্রাপতা, কোরিয়ান ডেমিলিটারাইজড জোন বা ডিএমজেড এর নানা সমস্যা, ক্যাটালান স্বাধীনতা আন্দোলন (যা স্পেনের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন এটিকে ক্যাটালান জাতীয়তাবাদও বলা হয়), লস এঞ্জেলসের স্কিড রো এর গৃহহীনদের নানা সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কাজ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ স্থানের গৃহহীনের সংখ্যা হবে পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার।
‘ডাইরেক্ট ফ্রম উইথ ডেনা টাকরুরি ব্যাপক পরিচিত পায় এর নানা পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাডওয়ার্ড আর মুরো অ্যাওয়ার্ড (রেডিও টেলিভিশন ডিজিটাল নিউজ অ্যাসোসিয়েশন), ওয়েরি অ্যাওয়ার্ড (ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ডিজিটাল আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস কর্তৃক বার্ষিক চমৎকার ইন্টারনেট উপস্থাপন), শর্টি অ্যাওয়ার্ডস (উপস্থাপিত বিষয়কে টিক টক, সুইচ, টুইটার, ফেসবুক ইত্যাদি সামাজিক মাধ্যমে সংক্ষেপে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা) এবং ক্ল্যারিয়ন অ্যাওয়ার্ডস। ক্ল্যারিয়নের কাজ হলো যোগাযোগের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য কাজ করা। এডব্লিউসি এর কাজ হলো কমিউনিকেশন্স ইন্ডাস্ট্রিগুলোর দক্ষতা নিরূপণ করা।
ডেনা টাকরুরির ব্যাপক পরিচিত ঘটে আহেদ তামিমির প্রথম সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। তামিমি একজন ফিলিস্তিনি প্রতিবাদী মেয়ে। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তামিমি একজন ইসরাইলি সৈন্যকে চড়-থাপ্পড় মারায় তিনি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন। ডেনা টাকরুরি এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন এবং পরে তা ভাইরাল হয়। টাকরুরি ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব, ইউএস পুলিশি নিষ্ঠুরতার ব্ল্যাক লিভসমেটার আন্দোলন (আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের), গণ কারারুদ্ধ করা, ২০১৬ ইউএস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংবাদ করেন। ২০০৮ সালে টাকরুরি একটি ডকুমেন্টারি ছবি ‘বুদরুছ’ এর আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন। ইরাকে সেনাবাহিনীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন (যারা আমেরিকান সেনাসদস্য)। পাশাপাশি ইরাকি সংস্কৃতির উন্নয়নে কাজ করেন তিনি। সবাইকে নিয়ে তিনি ‘এনথ্রপলজি অ্যান্ড গ্লোবাল কাউন্টার ইনসারজেন্সি’ শীর্ষক একটি গ্রন্থে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যায় প্রকাশ করেন। সেটিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে পাঠক মহলে। বিশ্বের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎকার প্রযোজনা করেন সাফল্যের সাথে। এর মধ্যে রয়েছেন মাহমুদ আহমেদিনেজাদ, রবার্ট গেটস প্রভৃতি। এটি সম্ভব হয়েছে বিভিন্ন ভাষা যেমন আরবি, ইংরেজি, স্প্যানিশ, হিব্রু প্রভৃতিতে বিশেষ দখল থাকার কারণে। টাকরুরি বলেন, ‘আমি আল জাজিরা এরাবিক এর সিন ওয়াশিংটন শোতে অতিথিদের সাথে আলাপে আরবি ব্যবহার করি। শোর জন্য পাণ্ডলিপি রচনা করি আরবিতে। আমাদের দোহা সদর দফতরে সহকর্মীদের সঙ্গে আরবিতে কথা বলি। এমনকি ওয়াশিংটন ব্যুরোর সহকর্র্মীদের সাথেও আরবি চালাই। কেননা আরবি আমার প্রথম ভাষা। তবে মাঝে মধ্যে অন্য ভাষা ব্যবহারের কারণে ইংরেজি চর্চা কিছুটা কম হতো। আমাদের বাসায় বাবা-মায়েরা আরবিতেই কথা বলতেন।
তার উচ্চশিক্ষা এবং আরবি পড়াশোনা ব্যক্তিগত এবং পেশাগত কাজে ব্যাপক কাজ দিয়েছে। নানা সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ভাষাভাষীদের সাথেও আরবিতে কথা বলেন। আধুনিক মানসম্পন্ন আরবির প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল টাকরুরির। এ জন্য তিনি আরবি শব্দ তালিকা তৈরি করতেন। এত সব গুণের কারণে আল জাজিরাই তাকে কাজের উদ্দেশ্যে চাকরির প্রস্তাব দেয়।
টাকরুরি ইউসি বারকেলেতে টানা দুই বছর আরবি পড়েন তার আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সওয়ার্ক হিসেবে। জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ চলাকালে আরো গভীর জ্ঞান লাভ করেন আরবিতে। ভাষা শিক্ষা সম্বন্ধে তিনি বলেন, কিছু লিখতে বা বলতে গেলে কিছু ভুল হতেই পারে, যা একেবারেই দোষের ভাবা যাবে না। নতুন করে জানতে জানতে তা এক সময়ে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, তোমরা আরবিতে বলতে ও লিখতে চেষ্টা করো। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে এবং তা টিকিয়ে রাখতে এটা জরুরি প্রয়োজন।
টাকরুরি বলেন, আমার অতীত ও বর্তমান কাজকর্মই বলে দেয়, বাকস্বাধীনতা হরণকারীদের সব ধরনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার কাজে বদ্ধপরিকর থাকাই আমাদের কাজ। অর্থাৎ সাংবাদিকদের ক্ষমতা হচ্ছে নীরব করে রাখা মানুষদের সরব করে তোলা। আরো বলেন, আমি সর্বদা আমার স্বত্বা ও পটভূমি সম্পর্কে সব সময়ই প্রথম সারিতে থাকার চেষ্টা করি এবং আমি লেন্সের (ক্যামেরার) মাধ্যমে দেখতে পাই অপরের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামগুলো। একজন মুসলিম ও আরব-আমেরিকান হিসেবে আমি সংবাদ দেখতে দেখতে ও পড়তে পড়তে বেড়ে উঠি এবং দেখি কিভাবে বিভিন্ন বর্ণের এবং প্রান্তিক বা কোণঠাসা সম্প্রদায়ের লোকদের ভুল প্রতিনিধিত্ব ও অবমূল্যায়নের সাথে তুলে ধরা হচ্ছে বিশ্বে। আমার আমেরিকার একজন সংখ্যালঘু হিসেবেও যা দেখছি তা হলো কিভাবে সাধারণ লোকদের সাথে আচরণ করা হচ্ছে এবং কিভাবে তাদের ওপর অমানবিকতা চালিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে অধিকার প্রাপ্তি থেকে ঝেড়ে ফেলা হচ্ছে। অথচ অনেক দেশ সাংবিধানিকভাবে নানা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দিয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে ইউরোপে শরণার্থী সঙ্কট নিয়ে সরাসরি প্রতিবেদন তৈরি করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংবাদের উৎস খুঁজে বের করে সংবাদপাঠকদের সাথে নানাভাবে মিলিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। প্রকৃত পক্ষে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিওই দর্শক শ্রোতাদের চলতি ঘটনার দিকে ফেরাতে পারে।
তিনি সব সময়ই ভাবতেন, কিভাবে সাংবাদিক হওয়া যায়, তা ভেবে পরে রোল মডেল হওয়ার জন্য পরিশ্রম ও সংগ্রাম করতে থাকেন। এ সবই তাকে বর্তমান অবস্থানে (পেশাগত) নিয়ে আসে। এখন অনেকেই বলছেন, ডেনা টাকরুরি বর্তমানে ইসলামেরও রোল মডেল। তা দেখলে বোঝা যাবে, দ্য সেকরেট লাইফ অব মুসলিম নামক স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের একটি সিরিজে। তাদের নানা বিষয় সম্বন্ধে আলাপ করতে গেলে হিজাবের বিষয়টিও আপনা-আপনি চলে আসে। তিনি দেখতে চেয়েছেন মিডল ইস্ট বিষয়াবলি এবং অভ্যন্তরীণ সিভিল লিবারটির ঘটনাবলি, বিশেষ করে আরব আমেরিকান এবং মুসলিম আমেরিকান সম্প্রদায়। তার বহু ঘটনার চিত্র রীতিমতো ভাইরাল হয়, যা থেকে প্রচুর অর্থ আয় হয়। তার মধ্যেই সর্বপ্রথম এ সংক্রান্ত ডিজিটাল ফার্স্ট আইডিওলজি লক্ষ করা গেছে। সংবাদ পাঠকদের সাথেও একটা যোগসূত্রতা স্থাপনে সক্ষম হন টাকরুরি। তিনি বলেন, আমার আসল পরিচয় আমি একজন মুসলিম নারী। চেহারা নয়, কাজ দিয়েই একজন মানুষকে ওপরে উঠতে হয়। থাকতে পারে অনেক বাধা-বিপত্তি। এগুলোকে বুদ্ধি ও ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ পানির সদ্ব্যবহার নিয়ে টাকরুরি সংবাদ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শাওয়ার ছেড়ে দুই মিনিট গোলস করা মানে প্রায় ৩০ লিটার পানি ব্যয় করা। বিশ্বের অনেক স্থানে মাথাপিছু দৈনিক ৫০ লিটার পানি খরচের নিয়ম করা হয়েছে প্রশাসনিকভাবে। কিন্তু আমেরিকানরা গড়ে দৈনিক পানি খরচ করে ৮০ থেকে ১০০ গ্যালন। অথচ একটি বাথটাব পূর্ণ করতে প্রায় ৩৬ গ্যালন (১৪৪ লিটার) পানি লাগে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর যাতে চাপ কম পড়ে, সে জন্য তিনি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব বাড়াতে পরামর্শ দেন। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে অনেকে পানি ধরে রাখার প্রতি মনোযোগ বাড়িয়েছেন।


আরো সংবাদ




portugal golden visa
paykwik