২৪ আগস্ট ২০১৯
ভিন দেশ

সময় এখন জেগে ওঠার, পরিবর্তন ঘটানোর : গ্রেটা থানবার্গ

-


গ্রেটা থানবার্গ। পুরো নাম গ্রেটা টিনটিন ইলিওনোরা আর্নম্যান থানবার্গ। নামটি বেশ বড় হলেও মানুষ কিন্তু প্রায় পুঁচকে। ২০০৩ সালের ৩ জুন জন্মগ্রহণ করলেও বয়স এখন তার মাত্র ১৬-১৭ বছর। এই ষোড়শী কিন্তু জলবায়ু কর্মী। শুধু নিজ দেশের নয়, রীতিমতো আন্তর্জাতিক কর্মী। পড়াশোনাও করছেন বিদ্যালয়ে। সুইডিশ এই কিশোরী জলবায়ু পরিবর্তন রোধে রীতিমতো সোচ্চার। সারা বিশ্বে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বৈশ্বিক ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার বিপদ সম্পর্কে। তার কর্মসূচির নাম ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’। এর অর্থ ভবিষ্যতের জন্য শুক্রবার। আর তার আন্দোলনের নাম ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর চিলড্রেন’। এর মানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রতিবাদ বা আন্দোলন। এর আরেক অর্থ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে স্কুলে অবরোধের ডাক। তার ডাকে সাড়া দিয়ে ১১২টি দেশের প্রায় ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন শিক্ষার্থী জোর সাড়া দিয়ে জলবায়ু প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয় ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ। থানবার্গের এ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সফলতা দেখে গত ৭ জুন (২০১৯) অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাকে ‘অ্যাম্বাসেডর অব কনসায়েন্স অ্যাওয়ার্ড’ নামক সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করে।
গ্রেটা থানবার্গ জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনতে পান তার প্রায় আট বছর বয়সে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে কেন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি আন্তর্জাতিকভাবে। তারপর থেকে তিনি এ সংক্রান্ত ব্যর্থতা বা হতাশার কথা বা খবর শুনতে পান। যে কারণে একপর্যায়ে রীতিমতো নিজেই হতাশ হয়ে যান এবং কথা বলা কমিয়ে দেন। তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে এক সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেজন্য চিকিৎসাও দেয়া হয়। তিনি বলেন, আমার বয়স কম বলে এ নিয়ে কিভাবে প্রতিবাদ করব বা সোচ্চার হব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই দমবন্ধের মতো অবস্থায় ছিলাম। মনের দিক থেকে সেই প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থা এখন আর নেই। কারণ, এ ব্যাপারে আমি আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া পেয়েছি। বিশ্বের অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। পাশাপাশি সাধারণ জনগণ তো রয়েছেই। তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হন ২০১৯ সালের মার্চে। এসব সংক্রান্ত আরো অনেক সফল কাহিনী আছে তার।
থানবার্গের মা ম্যালিনা একজন অপেরা বা গীতিনাট্য শিল্পী। আর বাবা ভান্তে থানবার্গ অভিনেতা। তাদের পূর্বপুরুষও এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে থানবার্গ তাদের জগতে প্রবেশ করবে, এমনটিই হতে পারত। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদেই থানবার্গ জলবায়ু কর্মী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। কেননা এসব নিয়ে কাজ করতে ভালোই লাগে তার। তিনি মনে করেন, সবাই মিলে যদি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে না পারি তবে সুন্দর এ পৃথিবী শিগগিরই মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর বসবাস অযোগ্য একটি গ্রহে পরিণত হবে, যা আমরা মোটেই প্রত্যাশা করতে পারি না। অর্থাৎ স্কুলছাত্রী থানবার্গ এখন একজন সফল তরুণ নেতৃত্ব।
বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তব্য রাখার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তা নিয়েও এখন তিনি ব্যস্ত। সম্মেলনগুলোতে মানুষের কী ক্ষতি হয়েছে (জলবায়ু পরিবর্তনে), কী ক্ষতি হচ্ছে, আর কী ক্ষতি হতে পারে সে বক্তব্যই দিচ্ছেন; যাতে বিশ্বের মানুষ তা শুনে কাজে লাগায় এ সংক্রান্ত নানা উপদেশ-পরামর্শ। সম্প্রতি অস্ট্রিয়ায় এক সম্মেলনে জলবায়ু বিষয়ক আলোচনায় অভিনেতা ও রাজনীতিবিদদের পাশেও দেখা গেছে তাকে। এর লক্ষ্য হচ্ছে এ দিকে যাতে সুদৃষ্টি আসে মানুষের, জেগে ওঠে বিশ্ববিবেক। জলবায়ু কর্মী হিসেবে নাম লেখানোর পর তিনি এখন এতটাই ব্যস্ত যে, স্কুলেও ঠিকমতো উপস্থিত থাকতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ এক বছর স্কুলে যাবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সময় আমি কাজ করব উত্তর, দক্ষিণ আমেরিকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে। কেননা, এসব স্থানে সম্প্রতি আমন্ত্রণ পেয়েছি কয়েকটি বৈঠক ও সম্মেলনে অংশ নেয়ার। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে আমার। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনে এসব জায়গায় যাবো বিমান ছাড়া। কেননা বিমান কার্বন ছড়ায়।
সুইডেন সংসদের বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসংক্রান্ত প্রতিবাদ জানান। ২০১৮-এর আগস্টে স্টকহোমে “ঝশড়ষংঃৎবলশ ভড়ৎ কষরসধঃঃঃ” লেখা ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় থানবার্গকে। একটি বাইসাইকেলকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কাজে লাগানো যায় এমন দৃশ্যও প্রকাশ পায় ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর বার্লিনে “ঋড়ষষড়ি এৎবঃধ! ঝঃৎরশব ভড়ৎ পষরসধঃব” লেখা ব্যানার নিয়েও এর পক্ষে প্রচারণা চালান সচেতন নাগরিকেরা। এসব প্রচার-প্রচারণা যথাযথ গুরুত্ব পায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। গণমাধ্যমও এ ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। থানবার্গ বলেন, কাজ করতে হবে নিজের বিবেক অনুসারে। সেটা সবার জন্য মঙ্গলজনকও হতে হবে। এ ভাবেই এগিয়ে যেতে হবে।
পুরস্কারের ঘোষণায় এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান কুমি নাইডু বলেন, এ ধরনের সাহসী কাজের জন্য থানবার্গ প্রচুর প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। জলবায়ু বিপর্যয় রোধে সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যেতে হবে, যা আমাদের শিখিয়ে দিলো খোদ তরুণেরা। বিশেষ করে সুইডেন সংসদের বাইরে প্রতিবাদ শুরু করার পর থেকে জলবায়ু কর্মী হিসেবে একটু বেশিই পরিচিতি পান থানবার্গ। একপর্যায়ে তিনি অবরোধের ডাক দেন স্কুলে। তার আন্দোলনে আরো বেগ আসতে থাকে জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলনের পর। ক্রমে তার ব্যক্তিগত আন্দোলন বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নেয়। সম্প্রতি জলবায়ু প্রতিবাদীরা জার্মানের গার্জওয়েলার কয়লাখনিতে হামলা চালায়। হাজার হাজার কর্মী (প্রতিবাদী) ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের বিরুদ্ধে সেøাগান দেয়। ২০৫০ সাল নাগাদ জার্মান কার্বন নিঃসরণ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনবে বলে প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু প্রতিবাদীরা বলেন, এটা দীর্ঘ সময়। এ দিকে গ্রেটা থানবার্গের ডাকে সারা দেন ইউকের সাগরপাড়ের তেল এবং গ্যাস খাতের কর্মকর্তারা। তারা এক সম্মেলনে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে আমাদের। তারা বলেন, আমরা চাই বিশ্ব একটি ভালো অবস্থানে ফিরে আসুক। থানবার্গ এবং অন্য শিক্ষার্থীদের দাবি, আপনারা যারা রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী তাদের বৈশ্বিক উন্নয়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। থানবার্গ একাই ইউরোপ, ইউএস, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে নানা ধরনের আন্দোলন সফলভাবে করেন। তার একটি আন্দোলনের শিরোনাম ‘ভবিষ্যৎ অথবা স্কুল অবরোধ জলবায়ুর জন্য’। তার বক্তব্যে সুর মিলিয়ে অনেকে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মানে জলবায়ু বিপর্যয়। ওপেকও (অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কানট্রিজ) এতে এগিয়ে এসে বলে, জীবাশ্ম জ্বালানি কারখানা যেন ‘বড় হুমকি’।
মে ২০১৮ সালে থানবার্গ এসভেনকা ড্যাগব্লাডেড নামক সুইডিশ পত্রিকা আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশের ওপর আর্টিক্যাল লিখে পুরস্কার পান। তা পত্রিকায় ছাপা হলে খুবই প্রশংসিত হয় নানা মহলে। তিনি বলেন, আমি কোনো জলবায়ুবিজ্ঞানী নই, আমি শুধুই ম্যাসেঞ্জার বা দূত। আমি চাই, সুইডিশ সরকার প্যারিস চুক্তি মেনে কার্বন নিঃসরণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনবে। সময় এখন জেগে ওঠার, পরিবর্তন ঘটানোর। না হলে বিপর্যয় অনিবার্য।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet