২০ জুলাই ২০১৯

বাবা আমার স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটার আত্মবিশ্বাস : শামীমা বেগম শিউলী, সিনিয়র রিসার্চ অফিসার (বন অধিদফতর)

বাবা -মায়ের সাথে শামীমা বেগম শিউলী -

আমার জন্মÑ বেড়ে ওঠা সবই ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ ক্যাম্পাস এলাকায়। সেটা ৬০-৭০ দশকের কথা। যেদিন আমার জন্ম, আমি তো দেখিনি সবাই বলেছেÑ বাবা আমার মুখখানি দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন। আর তখনই আমার নাম রাখেন ‘শিউলী’ অর্থাৎ ভোরের ঝড়ে পড়া ধব ধবে সাদা- কমলা, মিশেলের শিউলী ফুলের নামে। জন্মের পর থেকেই বাবাকে দেখেছি ভীষণ রাশভারী, ব্যস্ততম একজন মানুষ। মা ছিলেন ঠিক তার উল্টো। মা আমাদের ছয় ভাইবোনকে খাওয়া-গোসল, যতœ-আত্মিতে খেয়াল রাখতেন আর বাবা লেখাপড়ার প্রতি। বাবা খুব যতœ করে আমাদের পড়াতেন। সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় স্টুডেন্টদের পড়িয়েও বাবা আমাদের পড়াতে বসে এতটুকু বিরক্ত হতেন না। একজনের পর একজনের পড়া বুঝিয়ে দিতেন।
আমার সেই স্নেহময় বাবার নাম প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস। বাবার জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরে। ১৯৫৯ সালে বাবা মৃত্তিকাবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে প্রথম ব্যাচের শিক্ষক হিসেবে তৎকালীন ইস্ট-পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন ও উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএস ও পিএইচডি অর্জন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ২০০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ বছর সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। ওই সময়ের মধ্যে বাবা মৃত্তিকাবিজ্ঞানে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দুইবার, কৃষি অনুষদের ডিন হিসেবে একবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা (এমএস, পিএইচডি) ও গবেষণা কমিটির কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দুইবার ও শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে বহুবার দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ২০০৮-২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত হন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির জন্য কাজ করেন। বাবা জীবনের এই কর্মমুখর জীবনে নেগেটিভ শব্দটি শুনিনি। জীবনকে জয় করার সব রকম রসদ ও মন্ত্র তার জানা ছিল। তাই তো এখনো ৮০-৯০ বছরের টগবগে তরুণ হিসেবে বাবা আমার এখনো রাত ১০টায় ঘুমিয়ে পড়েনÑ ভোরবেলা নামাজ সেরে মর্নিং ওয়ার্কে যান। তারপর নাশতা খান, বাজার করেন। এখনো মা মজার মজার খাবার রান্না করলেও বাবা কিন্তু নিয়মমাফিক পরিমিত আহার করেন। নিজের কাজটুকু নিজেই সারেন। চা-কফি বানিয়ে খান। বাবার এই ডিসিপ্লিন জীবনের কারণে আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি আজো সুস্থ-সবল জীবনযাপন করছেন। শুধু চোখে কম দেখেন।
২০১৬ সালের জুন মাসে ‘শিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কৃষি অনুষদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ বাবাকে বিশেষ সম্মাননা দেয়।’
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকাটি ছিল ব্রহ্মপুত্র নদের পাশ ঘেষে। বিকেল হলেই সমবয়সী খেলার সাথীদের নিয়ে শান-বাঁধানো ঘাটে গিয়ে নদের জলে পা ভেজাতাম। বর্ষায় নদের জল থৈ থৈ করত। ঘাটে ছিল ৩২টি সিঁড়ি। আমরা প্রতিদিন গুনতাম কয়টা করে সিঁড়ি বর্ষার জলে ডুবে গেছে। বাবা খেয়াল করতেন, আমরা খেলতে খেলতে কত দূর চলে যাই। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে আমরা যেতাম না। আমাদের বাসা ছিল ডুপ্লেক্স এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে। বাড়ির পেছনে ছিল সবজিবাগান আর সামনে ফুলের বাগান। বাড়ির চারপাশ ঘেরা ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ও সফেদা গাছে ঘেরা। কী যে অপূর্ব পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম, তা যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়।
আমরা ছয় ভাইবোন। আমি ভাইবোনদের মধ্যে তৃতীয়।
ছোট্ট বেলায় বাবা আমাদের মর্নিং ওয়ার্কে নিয়ে যেতেন। কখনো বিকেলে ঘুরতে যেতেন গাড়ি দিয়ে অনেক দূরে। ঈদের সময় বাবার সাথে গাড়ি দিয়ে ঢাকার নিউমার্কেটে এসে শপিং করতাম। শপিংয়ের সময় সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া-দাওয়া। বিশেষ করে বাবার পছন্দ ছিল চাইনিজ খাবার। সেই সময় চাইনিজ রেস্টুরেন্ট খুব বেশি না থাকলেও বাবা ঠিক খুঁজে বের করে চাইনিজ খাবার খাওয়াতেন আমাদের। বাবা খুব ভালো ড্রাইভ করতে পারতেনÑ কেমন করে যেন এঁকে বেঁকে গাড়ি চালাতেন। ছোট্ট বেলায় বাবার এই চমৎকার ড্রাইভ করাটা দেখে মনে হতো যেন সিনেমার কোনো নায়ক দর্শকপ্রিয়তার জন্য চমকপ্রদ কিছু উপস্থাপন করছেন। তাই আমরা ভাইবোনেরা বাবার সাথে লং ড্রাইভে গেলেই বাবাকে বলতাম ‘বাবা, ও-বাবা একটু সাপের মতো করে গাড়ি চালান তো, বাবাও মজা পেয়ে অমন করে গাড়ি চালাতেন।
একটা খুব ভয়ের ঘটনা মনে পড়ে গেলÑ ১৯৭৪ সালের কথা, দেশে দুর্ভিক্ষ, অভাব-অনটন দেশব্যাপী। তাই চোর-ডাকাতে ভরে গেছে, নিরাপত্তার বড় অভাব। বাবা তখন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গিয়েছিলÑ পথে একদল ডাকাত গাড়ি রোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবা এমন চালাকি করে গাড়ি ড্রাইভ করেছেন যে, সে যাত্রা বাবা তার বুদ্ধিমত্তায় বেঁচে গিয়েছিলেন। তেমনি ১৯৭১ সালে সপরিবারে ময়মনসিংহ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার সময়ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের হাত থেকে বেঁচে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন বাবার তীক্ষè বুদ্ধির জোরে।
ছোট্ট বেলায় বাবা যতটা রাগী ছিলেনÑ কিন্তু আমরা বড় হতে হতে বাবা ততটাই বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে সহজ হয়ে গিয়েছিলেন। এর কারণ হিসেবে বুঝতে পেরেছিলামÑ ছোটবেলায় কঠোর না হলে ছেলেমেয়ে মানুষ করা এত সহজ ছিল না। বাবার শাসন, আদর্শ, স্নেহ-মমতা বিজড়িত আমাদের পুরো জীবনটা ছিল ঘটনাবহুল বৈচিত্র্যময়। সারাটি জীবন বাবা-মা আমাদের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন। আমার দুটো ছোট্ট মেয়েকে রেখে বিদেশে পড়তে যাই। বাবা-মা তাদের দুই বছর যতœআত্তি করেছেন। এমন কি ভাইবোনরা বিদেশে পিএইচডি করার সময় নিজ খরচে বাবা-মা দুইজনই জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে থেকেছেন এবং নাতি-পুতিদের লালন পালন করে দিয়ে এসেছেন।
আমার এই দীর্ঘ জীবনে যে কাজেই হাত দিয়েছি, বাবা আমাকে সাপোর্ট করেছেন। তিনি সবসময় সমর্থন জুুগিয়েছেন আমার লক্ষ্য অর্জনের পথে। তার কাছ থেকে পাওয়া নিরাপত্তা আর নির্ভরতার অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটার আত্মবিশ্বাস। সবাই ভাবে, তার বাবাই শ্রেষ্ঠ বাবা, কিন্তু আমার বাবার চেয়ে ভালো কোনো বাবার কথা ভাবতেই পারি না। বাবা এমন একজন, যাকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আমার বাবা এমন একজন বাবা যিনি উদার, স্নেহময় চিন্তাশীল ও প্রতিভাবান মানুষ। বাবা পরিবারকেই স্থান দিয়েছেন সবকিছুর উপরে। একজন মেয়ে বাবার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কি-ই বা চাইতে পারে? এমন একজন বাবার সন্তান হয়ে জন্ম নিয়েছি বলে নিজেকে অসম্ভব সৌভাগ্যবতী মনে করি। সারা জীবন বাবাই আমাদের মায়া-মমতা, শিক্ষা, আদর্শ, ভালোবাসার ভাণ্ডারে পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমরা তাকে কিছুই দিতে পারিনি। কিন্তু জীবনে যে কথাটি বাবাকে কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারিনিÑ তা আজ আমার এই সামান্য লেখায় ব্যক্ত করতে চাই। ‘বাবা, ও বাবা, তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি।’
অনুলিখন : আঞ্জুমান আরা


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi