১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

বাবা তোমাকে ভালবাসি : রহিমা আক্তার মৌ, সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

-

প্রায় ১৪-১৫ বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স ২৮-২৯ বছর। দ্বিতীয়বার মা হবো আমি। সন্তান গর্ভে তখন প্রথম দিকেই। বাবার বাসায় বেড়াতে যাই। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন আগে। ’৮৭-’৮৮ সালে এরশাদ সরকার বাবাসহ ৩৫ জনের প্রমোশন বন্ধ করে দেন। বাবাসহ সবাই সেনাবাহিনীর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে যে যার মতো প্রাইভেট চাকরিতে প্রবেশ করেন। বাবা একটা কোম্পানিতে চাকরি নেন, কোম্পানির চেয়ারম্যান বাবাকে চাকরিটা দেন। কোম্পানির এমডিও ছিলেন একজন। এমডি কখনোই বাবাকে ভালো চোখে দেখতেন না। এদিকে চেয়ারম্যানের খুব প্রিয় ব্যক্তি হন বাবা। যাই হোক, জীবনের জন্য চাকরি তো করতেই হবে।
একদিন ভোরে কলিংবেল বেজে উঠে। মা শুনে বলেনÑ
দেখ তো মা এত সকালে কে এসেছে।
দোতলা বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতাম আমরা। বারান্দা দিয়েই বের হওয়ার গেট। গিয়ে দেখি ৪০-৪২ বছর বয়সী একজন লোক, বাবার নাম বললেন। আমি বললাম, বাসায় আছেন। বলেন,
Ñএকটু ডেকে দেবেন।
আমি বাবাকে ডেকে দেই। বাবা বারান্দায় এলেই উনি বলেনÑ
একটু বাইরে আসেন তো, কথা আছে।
বাবা রুমে এলেন, এর মাঝে সে লোক আমায় বলেনÑ
একটু পানি দেবেন।
আমি পানি আনতে ভেতরে যাই। বাবা বলেনÑ
মা টাকা থাকলে ১০০ টাকা দে তো আমায়, আমার পকেটে কোনো টাকা নেই।
আমি বাবাকে টাকা দিয়ে ওই লোকের জন্য পানি নিয়ে যাই। উনি বেশি পানি চাইলেন, মগে করে পানি দিলাম, আর গ্লাসে করেও। মগের পানি দিয়ে মুখ ধুচ্ছেন আর বলছেনÑ
বহুত খাটনি হয়েছে, সারারাত অনেক মশার কামড় খেতে হয়েছে।
কথাটা শুনে তেমন কিছু না বুঝলেও বুঝেছি কিছু একটা হতে চলছে। একটু পরেই দেখি আরো তিন-চারজন লোক। ভেতরে এসে বাবা-মাকে বললাম, বাবা মুখ ধুয়ে শার্ট গায়ে দিয়ে বের হলেন। ওরা বাবাকে সাথে করে গলির মাথায় নিয়ে গাড়িতে উঠতে বললেন। ‘গাড়িতে কেন?’ আমি প্রশ্ন করায় বললেনÑ
উনার নামে ওয়ারেন্ট আছে।
কাগজ দেখালেন, বাবা বললেন,
Ñউনাদের সাথে থানায় যেতে হবে আমায়, চিন্তা করিস না, আমি কোনো অন্যায় করিনি।
ছোট ভাইটি তখন স্কুলে পড়ে। ওর ইমিডিয়েট বড় ভাইটি হোস্টেলে। ওর হোস্টেলে খবর পাঠাই। মা আর ভাই যায় থানায়। সেখান থেকে বাবাকে ঢাকায় পাঠানো হবে। কথা হচ্ছিল যদি ১০-১৫ হাজার টাকা দেয়, বাবাকে ছেড়ে দেবে। বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বাবা এমডি সাহেবের স্বাক্ষর নকল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন।
থানায় বাবা মাকে বলেছেÑ
আমি এ কাজ করিনি, সত্য প্রমাণ হবেই।
সারাদিন অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে মুক্ত করতে পারেনি কেউ। বাবা কারাগারে আছেন, চোর-খুনি, আসামির সাথে বাবাকে রাত কাটাতে হবে। প্রচুর মশা চারপাশে। কী করে বাবা ঘুমাবেন, ঘুমানোর জায়গা পাবেন তো। এসব ভেবে অস্থির হয়ে যাচ্ছি। খাবার মুখে যায় না বাবার কথা মনে হলে। ফ্যানের নিচে বসতে পারি না বাবার কথা মনে হলে। সারারাত ফ্যান বন্ধ করে অজু করে নামাজের বিছানায় ছিলাম, বাবার জন্য দোয়া করছিলাম। সবাই বলেছে, ফ্যান ছাড়তে, খাবার খেতে, ঘুমাতে। কিন্তু পারিনি। বারবার মনে হয়েছে, বাবার জন্য কিছুই করতে পারছি না।
সেদিনই বুঝতে পেরেছি, বাবাকে কতটা ভালোবাসি। আমি বাবার পাগলি মেয়ে, পাগলি বলে ডাকলেই মা বাবাকে বকা দেন, বলেনÑ
আপনিই ওকে মাথায় তুলছেন।
বাবার সাথে আমার অনেক অভিমান। আমার জন্মের দুই বছর পর বাবা জীবনে এমন একটা ভুল করেছেন যার জন্য অনেক কথা শুনিয়েছি। বাবা চুপ করে বকা শুনেছেন। কখনই বাবাকে সামনে থেকে বলিনি ‘বাবা ভালোবাসি তোমায়’। বাবা জানে পাগলি মেয়েটা বাবাকে ভালোবাসে, যতই অভিমান করুক, বকা দিক, ভালো ঠিক বাসে।
সেদিনের পর প্রায় ১৫ দিন বাবা হাজতে ছিলেন। কারাগারে কর্মরত প্রায় অনেকেই বাবাকে চিনতেন, সবার একটাই কথা, ‘স্যার আপনার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ?’
১৫ দিন পর বাবার জামিন হয়, সত্য প্রকাশ পায়, বাবা এই কাজ করেননি। ১০-২০ এমনকি একমাসও বাবার সাথে দেখা না করে ছিলাম, কিন্তু সেই ১৫ দিনে বুঝেছি, বাবা আসলে কতটা কী? বাবাকে কতটা ভালোবাসি। বাবার এখন অনেক বয়স হয়েছে। আজ বলিÑ ‘ভালো থাকুন বাবা, পাগলিটা অনেক ভালোবাসে আপনাকে। বকা যতই দেই না কেন, ভালোবাসি এটাই ঠিক। মানুষ মাত্রই ভুল করে। যে ভুল করেছেন তা তো নির্মূল করা সম্ভব নয়।’


আরো সংবাদ

সকল




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik