২৬ জুন ২০১৯

আমার মা, আমার প্রশান্তির ছায়া

পরিবারের সাথে রাজিয়া - ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হলো মা। যার কোনো বিকল্প নেই। মা হলেন আমার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ। মায়া-মমতায় ভরপুর ও সারাক্ষণ চোখে সন্তানের মুখ দেখার আকাক্সক্ষা নিয়ে তৈরি মা। মায়ের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন খুব দামি। পৃথিবীর বুকে আমার অস্তিত্ব শুধু মায়ের জন্য। আমি মনে করি, আমাকে জন্ম দিয়ে মা তার মুখে হাসি ফুটানো ও সেবা করার একটি সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মা হাসলে মনে হতো পৃথিবী হাসছে, মনে হতো আমি জীবনের সব পেয়ে গেছি।

আমার সেই আদরিণী মমতাময়ী মায়ের নাম রাজিয়া খাতুন। আমার নানার সাত সন্তানের মধ্যে মা ছিলেন পঞ্চম। অত্যন্ত ধার্মিক ধর্মভিরু উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারেই মায়ের জন্ম। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ভেলুয়ার চর ছিল মেঘনা নদী বিধৌত একটি প্রত্যন্ত চর এলাকা। ওই এলাকার বেশির ভাগ মানুষই ছিল একটু নিম্নবিত্ত। কারণ, নদী ভাঙন, বর্ষা, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফসল ঘরে তুলতে না পারার কারণে আশ্বিন-কার্তিক ও চৈত্র-বৈশাখের আগের সময়টায় গ্রামে ভীষণ অভাব দেখা দিত- এটা চিরাচরিত। তাই মা আগের মওসুমের ধান-চাল-ডাল মাইকোষের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। আমি মাকে এই কাজে হেল্প করতাম।

মাইকোষ হচ্ছে এমন একটি ফার্নিচার যা দেখতে তিন লেয়ারের বক্স খাট। সেই খাটের দুই লেয়ারে কয়েক মণ ধান-চাল-ডাল ও অন্যান্য আসবাবপত্র তুলে রাখা যেত এবং সবচেয়ে উপরের লেয়ারে বিছানা বিছিয়ে দিব্যি ঘুমানো যায়। সুতরাং না বললে কেউ বুঝতই না কি আছে ওতে। অভাবের সময় বাবা বাজার থেকে দুই কেজি চাল আনলে মা মাইকোষ থেকে চাল-ডাল বের করে কয়েক দিন রান্না করে সবাইকে খাওয়াত, বাবা টের পেতেন না কোত্থেকে চাল আসছে আর সবার খাওয়া হচ্ছে। মায়ের এই দূরদর্শিতা আমাকে অবাক করত। অজোপাড়াগাঁয়ের সাধারণ একজন নারী এত বুদ্ধি কোথা থেকে পেত, ভাবলেই বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। মায়ের এই সাধারণ গুণটি আজ পর্যন্ত আমার জীবনে অনেকবার কাজে লাগিয়েছি।

আমার মায়ের যখন ১৩-১৪ বছর বয়স, তখন বাবার সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। অথচ বাবা তখন ২৫ বছরের তরুণ। এত অল্প বয়সে মা আমার বিশাল একান্নবর্তী সংসারের দায়িত্ব পান, হাসি-তামাশায় মা সব মেনে নিয়েছেন। মার বিয়ের ১৫ বছর পর আমার জন্ম। তার আগে গ্রামের অশিক্ষিত মহিলার মাকে বাজা বলে কানাঘুষা করত। এতে মা ভীষণ কষ্ট পেতেন। অতপর আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার জন্ম। এ যেন মায়ের মুখের হাসি। আমি পুরো পরিবারের কাছে সাত রাজার ধন ছিলাম। যেহেতু আমার বাবা বংশের বড় ছেলে। সুতরাং তার সন্তান বংশের বাতি বলে দাদা-দাদী, ফুফু, চাচা-চাচী সবার আদরের ধন চোখের মনি ছিলাম। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন ঠিক করা হলোÑ আমাকে আর গ্রামে রাখা হবে না। ঢাকা আসতে হবে, যেই কথা সেই কাজ। বংশের একমাত্র ছেলেকে অনেক বড় মানুষ হতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষায় উচ্চতর স্থানে যেতে হবে- বুকের মধ্যে অনেক স্বপ্ন নিয়ে মা আমাকে ঢাকা পাঠালেন। বিদায়ের দিন মার দুচোখ ভরা অশ্রু। মা ক্ষণে ক্ষণে আঁচল টেনে চোখ মুছেন, আমারও বুকের ভেতরটা ফেঁটে যাচ্ছিল, চোখ বেয়ে তপ্ত পানি গড়িয়ে পড়ছিল। চড় চাচা তখন ঢাকায় থাকেন- আমি চাচার বাসায়ই উঠেছিলাম। চাচা-চাচী আমাকে এত্ত আদর করতেন, যা বলে বোঝানো যাবে না। ঢাকায় আমার থাকা খাওয়ার কোনো অসুবিধা হয়নি। তারপরও ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সময়ই আমি টিউশনি করতাম, সেটা ১৯৮৪ সাল মাসে ৫০০ টাকা বেতনে। এর থেকে ৩০০ টাকা বাড়ি পাঠাতাম আর ২০০ টাকায় আমার হাতখরচ চলত। আমি ও আমার আরো ছয় বন্ধু মিলে টাকা জমানো শুরু করলাম। দিনে পাঁচ টাকা অথবা যে যত টাকা জমা করতে পারত, তাও মাটির ব্যাংকে। যেটা আমার এক বন্ধুর মাটির ব্যাংকে রাখা হতো। অনেক বছর পর সেই ব্যাংক ভেঙে ১৯ হাজার টাকা পাওয়া যায়। তা দিয়ে আমরা সাত বন্ধু ২০ কাঠা জমি কিনি ঢাকার অদূরে। পরে অবশ্য বেশি দামে ওটা বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। পরে ওই টাকা আমার অনেক কাজে লেগেছিল। মা ছোট্ট বেলায় আমাকে পড়তে বসতে বলতেন না, তবে ঘরে পড়ার পরিবেশ তৈরি করে দিতেন।

আমি রাত জেগে পড়তে থাকলে মা আমাকে কখনো এক গ্লাস দুধ, কখনো পানি, কখনো মুড়ি মোয়া খেতে দিতেন। মাঝে রাতে ওঠে নিঃশব্দে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমি বেশি উৎসাহ ভরে পড়তে থাকতাম। মায়ের এই প্রেরণা ভরা শক্তিশালী হাতের স্পর্শ আমার জীবনের আশীর্বাদ। তাই আজ এই জায়গাটাতে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ১৮তম বিসিএসে আমি উত্তীর্ণ হলে গ্রামশুদ্ধ আত্মীয় পরিজন যখন বাহবা দিচ্ছিল, তখন মা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলছিলেন- আমি জানতাম বাবা তুই পারবি। আমার ওপর মায়ের এত্ত বেশি আস্থা ছিল যে, তার ছেলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সে সর্বজ্ঞানে গুণী। ছোট্ট বেলায় যখন গ্রামের স্কুলের মাস্টার মশাই বাড়ি এসে মায়ের কাছে আমার প্রশংসা করতেন, মা তখন খুব গর্ব অনুভব করতেন। মুখে কিছু না বললেও অন্তরে তার ছেলের জন্য ছিল অফুরন্ত আশীর্বাদ।

আমরা তিন ভাইবোন বাবা-মাকে নিয়ে গত বছর ঠিক এই সময় ওমরাহ করতে গিয়েছিলাম। হজের সমস্ত কাজ মা তৃপ্তির সাথে করেছেন, কী যে খুশি হয়েছিল একসাথে পুরো পরিবার নিয়ে ওমরাহ করতে। তার আগেও মা দু’বার হজ করেছেন। সেবার ফিরে এসে মা বেশি দিন আর এই পৃথিবীতে থাকতে পারেননি। কী অসুখ মার শরীরে বাসা বেঁধেছিল, বছরের পর বছর চিকিৎসা করেও তা থেকে রক্ষা পাননি মা। মায়ের শেষ সময়টাতে আমি তাকে ভাত মেখে খাইয়ে দিতাম, মা খুব খুশি হতেন। আমি বুঝতাম মা যেন ছোট্ট খুকিটি হয়ে গেছে। মা একেবারেই খেতে পারতেন না। তারপরও কষ্ট করে হলেও খেতেন, যেন আমি কষ্ট না পাই। ছোট্ট বেলায় আমি বাড়ি গেলে মা কত্ত কত্ত রকম খাবার আর পিঠা বানাতেন, যেমন- জিলাপি, ফুলপিঠা, চিতই, ভাপাপিঠা এবং বিরান করা, সবজি দিয়ে মাছ তরকারি। ছোট চিংড়ি শুঁকটির ভর্তা, কী যে মজা সেই সব খাবার, এখনো জিভে পানি চলে আসে।

আমার সমস্ত হৃদয়টা শূন্য করে মা তুমি গত বছর ১২ আগস্ট আমাদের সবাইকে ফেলে চলে গেলে সেই না ফেরার দেশে। মা তুমি নাই ভাবতেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠে। মাঝ রাতে ঘুম থেকে জেগে পড়ার টেবিলে বসে আমার ছাত্রদের জন্য লেকচার শিট রেডি করি, তখন মনে মনে ভাবতে থাকি- হঠাৎ যদি মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠেন- বাবা অনেক রাত হয়েছে ঘুমুতে যা, শরীর খরাপ করবে তো। এখনো অফিসের নানা কাজকর্ম প্রেসারে ব্রেনটা কখনো ‘পাজেল’ হয়ে যায়, তখন মনে মনে ভাবতে থাকি- এই তো আমার মা মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করছেন। সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে বাবা একটুও ভাবিস না। মা মাগো- তুমি কত দূরে। আমি তো তোমার ছোট্ট বাবু সোনা হয়ে আবার তোমার কোলের পড়ে মাথায় রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই। পান-চুনের মিষ্টি গন্ধে ভরা তোমার জং ধরা চুড়ির টুংটাং শব্দ শুনতে শুনতে তোমার রান্না করা তরকারি, ভর্তা দিয়ে পেট পুরে ভাত খেতে চাই। মাগো এত আদর আর মমতা তুমি আমায় ছোট্ট বেলায় দিয়েছ, যা পেয়ে আমার হৃদয়টা আজ তোমার শূন্যতায় হাহাকার করে। আবার ফিরে পেতে মন চায় বাল্যকালের দূরন্ত সময়টা।

অনুলিখন : রুমা আঞ্জুম


আরো সংবাদ