২৩ মে ২০১৯

নির্যাতন বাড়ছেই

-

গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেছেন ফরিদপুরের মুক্তা বেগম (৩৫)। তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসেবে। যাওয়ার তিন মাসের মাথায় অমানুষিক নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি দেশে ফেরেন। তার হাত-পায়ে এখনো নির্যাতনের ছাপ। বেতন আর বাড়ি ফেরার কথা বললেই ওরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। সারা দিন পর খেতে দিত একখানা শুকনো রুটি। তিনবেলা খাবার জোটেনি ওখানে। পালাবার উপায় ছিল না। কারণ ভিসাটাও আটকে রাখত। এক ঘরে সপ্তাহখানেক আটক থাকার পর সেখান থেকে পালিয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হন। মুক্তা দেশে ফিরেছেন বটে কিন্তু গত দুই মাসেও তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। ধারদেনা করে সৌদি গিয়ে যে আশা তিনি দেখেছিলেন তাতে গুড়েবালি। যেখানে কোনো টাকা-পয়সা লাগার কথা নয়, সেখানে তিনি দালালের হাতে ৯০ হাজার টাকা দিয়েছেন। বিধবা এই নারীর জীবনের গল্প আর পাঁচজন নারীর মতো নয়।
বিয়ে হওয়ার ছয় বছরের মাথায় তার স্বামী মারা যান। দুই ছেলেকে নিয়ে স্বামীর ভিটেমাটিতেই ছিলেন। স্বামী আবদুল মতিন মারা যাওয়ার বছর তিন পর ভিটেবাড়িটাও নদীভাঙনে হারিয়ে যায়। শেষ সম্বল হারিয়ে ‘সিকস্তি’ মানুষের মতো তিনিও বাপের বাড়ি ওঠেন। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে সিদ্ধান্ত নেন সৌদি যাওয়ার। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনায় তিনি দালালের খপ্পরে পড়েন। ভয়াল পদ্মার মতো বিদেশ যাত্রাতেও জীবনের বাকি সঞ্চয়টুকু খুইয়েছেন। অসম্ভব রকমের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার এই নারীর শরীরে এখনো বড় বড় ক্ষত। বাকি জীবনে তিনি আর কর্মক্ষম হবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মুক্তার মতো হাজার নারী বেঁচে থাকার তাগিদেই বিদেশে গিয়ে জীবনের সর্বস্ব হারিয়েছেন।

মেয়েকে হারিয়ে প্রলাপ আর থামছে না আকলিমা বেগমের
বিয়ের ছয় মাস যেতে না যেতেই তার মেয়ে লাশ হয়েছে। তার আদরের মেয়ে তামান্নাকে খুব ঘটা করে বিয়ে দিয়েছিলেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মেয়ে এখন যৌতুকের বলি।
মেয়ে তামান্না গত ৩ মার্চ স্বামীর পাশবিক নির্যাতনে মারা যান। নিহতের বাবা মিলন মল্লিক ফরিদপুরের একজন ভ্যানচালক। মল্লিকের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তামান্নার সংসারে অশান্তি লেগেই ছিল। জামাতা সুমন মাঝে মধ্যেই টাকার জন্য আমার মেয়েকে চাপ দিত। বেশ কয়েকবার টাকার জন্য মারধরও করেছে। এ নিয়ে একাধিকবার সালিস হয়েছে। টাকার জন্য কয়েক দিন আগেও তামান্নাকে মারধর করেছে। আমি যৌতুক দিতে না পারায় তারা আমার মেয়েকে নির্যাতনের পর শ্বাস রোধ করে হত্যা করেছে।
এমন হাজারো ঘটনা আমাদের চার পাশে প্রতিনিয়ত ঘটছে। কতশত গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে গৃহকর্ত্রীর হাতে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরে অন্তত এক হাজার ৫০০ নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। অন্য এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বাংলাদেশের বিবাহিত মহিলাদের শতকরা ২৪.৪ ভাগ যৌতুকের জন্য স্বামীর নির্যাতনের শিকার।
জীবনে নিদারুণ কষ্ট আর অভাব না থাকলে কোনো মা-বাবা চায় না তার আদরের সন্তানকে, স্বামী তার স্ত্রীকে দূর প্রবাসের অচেনা-অজানায় পাঠাতে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এমনকি যৌন হয়রানির। এ দিকে আমাদের দেশের নারী গৃহকর্মীরা যখন দেশেই ক্রিকেটার, জজ, সেনাকর্মকর্তা, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণীর মানুষের নির্যাতনের শিকার, তখন আমরা গলা ফুলিয়ে নারী অধিকার নিয়ে চিল্লাচ্ছি কেন?
এমন ‘শ্রমদাস’র দৃশ্যটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যায়। আমরা জানি দেশ বা সমাজের সার্বিক উন্নয়নে জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবদান ও অংশগ্রহণের প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে নারী অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া তা সম্ভব নয়। তাই তো তাদের নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের কথা আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। আর কোনো নারী যেন সমাজে যৌতুকের বলি না হয়। আর কোনো নারী বিদেশে নির্যাতনের শিকার না হন সে দিকে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ চাই। চাই সর্বস্তরের সামাজিক প্রতিকার।

 


আরো সংবাদ




agario agario - agario