২৩ মে ২০১৯

মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হতে পেরে গর্বিত ফুলতারা

মুক্তিযোদ্ধা মো: বছির উদ্দিনের স্ত্রী ফুলতারা (ডানে) -

মানিকগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: বছির উদ্দিনের স্ত্রী ফুলতারা। তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন স্বাধীনতাপ্রত্যাশী মুক্তিযোদ্ধাদের অমিত বিক্রম ও আত্মত্যাগের গৌরব। তার স্বামী তাদেরই একজন।
মুক্তিযোদ্ধা বছির উদ্দিনের স্ত্রী ফুলতারার সাথে কথা হয় বানিয়াজুরীর রাথুরা গ্রামে তার বড় মেয়ে রিজিয়া বেগমের বাড়িতে। বয়সের ভারে আর নানা রোগশোকে কাতর সত্তরোর্ধ্ব এই নারী। একাত্তরের অনেক ঘটনা, তার স্বামীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হওয়ায় যুদ্ধের সময় পালিয়ে বেড়ান এবং চরম দারিদ্র্যে শিশু কন্যা নিয়ে তার বেঁচে থাকার সেই কষ্টকর দিনগুলোর কথা স্মরণ করতেই; ঝরঝর করে জল বেয়ে ভিজে গেল তার বয়সী কোটরাগত চোখদুটো।
আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, চার দিকে যুদ্ধ। সবারই মনে অজানা আতঙ্কে। যে যার মতো পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অনেক আগেই মারা গেছেন। বাড়িতে আমার স্বামী আর পাঁচ বছরের মেয়ে রিজিয়া। অভাবের সংসার। অল্প কৃষিজমি আর স্বামীর উপার্জনে কোনোমতে চলছিল সংসার। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। একদিন মাঝরাতে আমার স্বামী কানে ফিসফিস করে বললেনÑ শোনো, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। দেশ স্বাধীন করেই তবে ঘরে ফিরব। কেউ জিজ্ঞেস করলে কিছু বলো না। আর যদি মরে যাই, মনে দুঃখ নিও না। দেশের জন্য জান দেয়ার ভাগ্য সবার হয় না। এরপর ঘুমন্ত মেয়ের কপালে চুমো দিয়ে তিনি আস্তে আস্তে ঘরের বাইরে গেলেন।
আমার কান্না শুনে মেয়েটির ঘুম ভেঙে গেল। গলা জড়িয়ে ধরে মেয়ের সে কি কান্না। আর আমাদের চোখের পানি তার পথ আটকাতে পারেনি। তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন। কয়েক মাস তার কোনো হদিস ছিল না। যখন শুনতাম অমুক জায়গায় এক মুক্তিযোদ্ধার লাশ পাওয়া গেছে। তখন বুক ফেটে কান্না আসত। এই বুঝি তার মৃত্যুর খবর আসে। একবার খবর আসে আমার স্বামী যুদ্ধে মারা গেছে। তখন ওই শিশুকন্যা এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বাবা বাবা বলে কান্না শুরু করে। তিন দিন নাওয়া-খাওয়া করতে পারিনি।
এক দিকে অভাবের তাড়না আর অন্য দিকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। আমার স্বামীর খোঁজে, রাজাকারদের রক্তচক্ষু আর হুমকিতে শিশু মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি দিনের পর দিন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ থাকায় পরিবারে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। কোনো উপায় না পেয়ে আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে ৮-১০ কিলোমিটার দূরে কাটিগ্রামে আমার বাবার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই। দরিদ্র বাবা হাইজা বেপারীর কোনো কাজ ছিল না তখন। পরিবারের সদস্য সংখ্যাও বেশি। অভাব-অনটনে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। অন্যের বাড়ি কাজ করে তাদের একবেলা খাওয়ালেও দুই বেলা না খেয়ে কাটাতে হয়েছে।
হঠাৎ একদিন চার দিকে মানুষ আনন্দ করছে। দেশ স্বাধীন হইছে... ওই দিন গভীর রাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের নাম ধরে ডাক দেয়। হুড়মুড়িয়ে উঠে দেখি তিনি সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার কান্নার আওয়াজে প্রতিবেশীরা আসে তাকে দেখতে। সবার চোখেই পানি। মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে আদর করতে করতে বলতে, মা গো আমরা স্বাধীন হইছি। তার সেই আনন্দ অশ্রুমিশ্রিত কথাটি আমার কানে এখনো ভেসে ওঠে।
ফুলতারার বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ধানকোড়া ইউনিয়নের নয়াডিঙ্গী গ্রামে। চার মেয়ে, আর এক ছেলে। ছেলেমেয়েরা বিয়ে করে সংসার করছে। সবারই সুখের সংসার। তাদের ঘরে সাত নাতি ও দুই নাতিন। তারাও পড়াশোনা করে, চাকরি করে নিজ নিজ স্থানে প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে রিজিয়া বেগমের বাড়ি ঘিওরের রাথুরা গ্রামে আর মেজো মেয়ে ফাতেমার বাড়ি বানিয়াজুরীতে। তিনি বানিয়াজুরী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য। সেজো মেয়ের বিয়ে হয়েছে ঘিওরের রাধাকান্তপুর গ্রামে এবং ছোট মেয়ে রুকসানা আক্তার রুবির শ্বশুরবাড়ি ঢাকায়। পেশায় সে সরকারি হাসপাতালের সেবিকা, আর একমাত্র ছেলে শাহজাহান পেশায় বেসরকারি চাকরিজীবী।
ফুলতারার ছেলে মো: শাহজাহান জানান, আমার বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা মৃত বছির উদ্দিনের মুক্তি বার্তা নম্বর ০১০৭০৫০১২০, গেজেট নম্বর ১৮৪২। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সনদ নম্বর ২০৭৪১। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে আমার বাবা দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এটিই আমাদের অনন্য গর্ব।
শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা বছির উদ্দিন দীর্ঘ দিন রোগে ভুগে ২০০৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মারা যান। স্বামীহারা ফুলতারা জীবনের অনেক কিছু পেয়েছেন, অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েছেন, আর পালিয়ে বেড়িয়েছেন দীর্ঘ সময়। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছেন, কিন্তু তার পরও তার এক ফোঁটা কষ্ট নেই। কারণ সে একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। এটি ভাবতেই গর্বে তার বুক ভরে উঠে।


আরো সংবাদ




agario agario - agario