১৭ জুন ২০১৯

অমনি শিশুটি কেঁদে উঠল

-

মুক্তিযুদ্ধ। মিলিটারি আসছে। এসেছে। আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ দিশেহারা, দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য। যে দিকে পারছে ছুটে চলছে জীবন নিয়ে বাঁচার আশায়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। বাঁচার সে কী চেষ্টা! একদিন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত। আশ্রয় নিলাম এক বাড়ির পুকুরপাড়ে। হঠাৎ মিলিটারির পায়ের আওয়াজ। আমি ছিলাম আমার মামার পরিবারের সাথে। এ পরিবারে মামা-মামী ও তাদের ছয় সন্তান। সবচেয়ে ছোট সন্তানটির বয়স মাত্র আট মাস। আমাদের কাছেই আরো কয়েকজন ঘাপটি মেরে আছে। ওরাও আমাদের মতোই হবে, তবে রাতের আঁধারে চেনা যাচ্ছে না। সব নিয়ে ১৪-১৫ জন মানুষ হবে। বিপদের ওপরে মহাবিপদ হলো ওই আট মাসের শিশুটি নিয়ে। অবুঝ শিশু কাঁদছে আর কাঁদছে। আমার মামী মুখে দুধ দিয়ে কান্নার আওয়াজ আটকানোর চেষ্টা করছেন। সম্ভব নয়। কান্নার আওয়াজ বেরিয়েই আসছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মামা আমার শিশুটিকে মামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন ও ফিসফিস করে বলছেন, ‘ওকে দে, পুকুরে ডুবিয়ে মারি, নয়তো এতগুলো মানুষকে মরতে হবে।’
মামী বারবার হাত ছুটিয়ে নিয়ে শিশুটিকে বুকের ভেতর আঁকড়ে রাখার ও কান্না বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নাড়িছেঁড়া ধন মায়ের সন্তান। ক্রমেই কান্নার আওয়াজ স্তিমিত হয়ে আসছে। এক সময় আওয়াজ শেষ।
পুরো শরীর হিম হয়ে গেল আমার। শিশুটিকে গলা টিপে মেরে ফেলল নাকি মা নিজেই। হঠাৎ একজন এসে জানাল, ‘মিলিটারি এখান থেকে সরে গেছে, চলেন আমরা পালাই।’ দৌড়ে একটু নিরাপদ স্থানে এসে দেখা গেল শিশুটি নেতিয়ে নিস্তব্ধ। তাহলে মরেই গেল! মা সন্তানের মুখে দুধ পুরে দিলো হারিকেনের আলোতে আমি তা দেখছি, কিন্তু দুধ মুখে ঢুকছে না। ভাবছি বিধাতা এ কী দেখছি!
হঠাৎ শিশুটি ‘অ্যাঁ’ করে কেঁদে উঠল। মামী নাকি ওর মুখে নিজের আঁচল পুরে দিয়েছিলেন আওয়াজ বন্ধ করার জন্য। নিজেও ভেবেছিলেন সন্তান আর হয়তো বেঁচে নেই।
তখন আল্লাহর কাছে নাকি বলেছিলেনÑ ‘আমি নারী, আমি মা, আমি বাচ্চার কান্না থামাতে চেয়েছি, মারতে চাইনি। অমনি শিশুটি ‘অ্যাঁ’ করে উঠল। সেই শিশুটি এখন কলেজের প্রফেসর। সে তার ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ায়।


আরো সংবাদ