২৩ আগস্ট ২০১৯

শুধু ভাষার মাসেই কদর বাড়ে আমাদের Ñ গুলেনুর বেগম

শহীদ রফিকের ভাবী গুলেনুর বেগম -

১৯৫২ সালে যাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম মাতৃভাষা। তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ রফিক। তার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে যারা বেঁচে আছেন, কেমন আছেন তারা? রফিকের স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটার খবর নিতে সরেজমিন সিঙ্গাইরের পারিল (বর্তমানে রফিক নগর) গিয়ে দেখা গেল প্রকৃত অবস্থা।
বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করতে শহীদ রফিকের ছোট ভাই মৃত আবদুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম বসবাস করছেন এখানে। বাড়ির আঙিনায় দেখা হয় গুলেনুর বেগমের সাথে। কথা হয়, তার ভাসুর প্রথম ভাষা শহীদ রফিককে নিয়ে। অভাব অনটনে তার বেঁচে থাকা, জীবনের প্রত্যাশা-প্রতিশ্রুতি আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নানা বিষয়ে। সালাম ও কুশলাদি বিনিময়ের পর তার মুখোমুখি বসলাম শহীদ রফিক স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারের বারান্দায়। নানা কথার একপর্যায়ে যখন জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন? শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন, ভালো নেই রে বাবা। এরপর স্মীত হাসির অন্তরালে গুলেনুর বেগমের দীর্ঘ আক্ষেপের সুর, ভাষার মাস এলেই আপনারা আসেন, সারা বছর কত কষ্টে আমাদের দিন কাটে, সে খবর কেউ রাখে না।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ৭৫ বছর বয়সী এই নারী নানা রোগে-শোকে আক্রান্ত। লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয় তাকে। দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে গেছে। বয়সী চোখের উদাসী চাহনীতে পুরাতন স্মৃতি রোমন্থনের চেষ্টা। কাঁপন ধরা কণ্ঠেও যেন, হঠাৎ সতেজতা। আমার বাবার বাড়ি হরিরামপুরের দাঁদরুখী গ্রামে। তখন আমার বয়স ১৫ কি ১৬ বছর হবে। শহীদ রফিকের প্রয়াত ছোট ভাই আবদুল খালেকের সাথে আনুমানিক ১৯৬০ সালে বিয়ে হয়। স্বামী মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগেই। এরপর ছেলে শাহজালাল (বাবু) ও পুত্রবধূ নিয়েই আঁকড়ে আছি স্বামীর ভিটায়। অভাব-অনটনের সংসারে এখন আমাদের বেঁচে থাকার সম্বল স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার টাকা।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিককে তিনি চোখে দেখেননি। অর্থাৎ গুলেনুর বেগম এই বাড়ির বউ হয়ে আসার আট বছর আগেই তার শ্রদ্ধেয় ভাসুর রফিক উদ্দিন আহমদ শহীদ হন।
তার স্বামী ও শাশুড়ির কাছে শোনা কথার বরাত দিয়ে গুলেনুর বেগম জানান, বাল্যকাল থেকেই তিনি (শহীদ রফিক) ছিলেন চঞ্চল প্রাণোচ্ছল। ছিল গাছে চড়ার প্রচণ্ড শখ। গাছে চড়তে গিয়ে তো একবার তার পা ভাঙে। চিকিৎসার জন্য সে সময় তাকে কলকাতা পর্যন্ত পাঠানো হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি সাহিত্য ছড়া রচনা, সেলাই সূচিশিল্পে তিনি ছিলেন বেশ পারদর্শী। এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্টে সবসময় তিনি নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতেন। সমাজকল্যাণমূলক কাজে তিনি থাকতেন সবার আগে। সিঙ্গাইর উপজেলার বায়রা স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি ঢাকার জগন্নাতে লেখাপড়া করেন। ঢাকায় থাকাকালীন লেখাপড়ার পাশাপাশি শহীদ রফিক বাবার সাথে প্রেসের ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। এ সময় তার বিয়ের কথা চলছিল গ্রামে। গ্রামের নাসির উদ্দিনের কন্যা পানু বিবির সাথে বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়। কিন্তু তার আর বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি।
গুলেনুর বেগম আরো জানান, শহীদ রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে এই বাড়িটিতে থাকি। ভালো ঘর-দরজা নেই। কেউ এলে বসতে দিতে পারি না। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে তিনি আরো জানালেন, শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা জেলা শহর ও ঢাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা স্মৃতি জাদুঘর এবং রফিকের বাড়ি দেখতে আসেন। থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা না থাকায় এখানে এসে বিপাকে পড়েন অনেক দর্শনার্থী। শহীদ রফিকের বাড়ির দুরাবস্থা দেখে অনেকেই সাহায্যের আশ্বাস দেন। কিন্তু যাওয়ার পর কেউ আর ফিরে আসে না।
যে ঘরে রফিকের জন্ম সে ঘরটি এখন জরাজীর্ণ। সে ঘরে জ্বালানি কাঠ রাখা হয়। বাড়িটিতে আত্মীয়স্বজন ও দর্শনার্থীদের থাকার উপযোগী কোনো ঘর নেই। নেই স্বাস্থ্যসম্মত একটি শৌচাগারও।
শহীদ রফিকের ভাতিজা ‘স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার’-এর তত্ত্বাবধায়ক শাহজালাল বাবু বলেন, ভাষা আন্দোলনের পর দেশ স্বাধীন হলো ৪৮ বছর। স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ছাড়া সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ও সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। দূর-দূরান্তের ভাষাপ্রেমিক দর্শনার্থীরা এসে শহীদ রফিকের বাড়ি ও গ্রন্থাগারের বেহাল অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যান। এ ছাড়া এখানে থাকা খাওয়ার কোনো হোটেল ব্যবস্থা না থাকায় ক্রমেই দর্শনার্থীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মাজেদ খান বলেন, সারা বছর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে যান তারা। এ কারণে দিন দিন দর্শনার্থীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। দর্শনার্থীদের থাকা-খাওয়ার জন্য একটি ডাক বাংলো নির্মাণ ও শহীদ রফিকের বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।
সিঙ্গাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাহেলা রহমতুল্লাহ বলেন, এই উপজেলায় আসার পর ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। খোঁজখবর নিয়েছি ভাষাশহীদের পরিবারটির। শহীদ রফিকের ভাতিজা শাহজালালকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
ওই পরিবারে চাকরি করার আরো কেউ থাকলে যোগ্যতানুসারে তাদেরও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হবে। এখন পর্যন্ত আমার কাছে ভাষাশহীদ পরিবারের কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে আসেনি। এলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া শহীদ রফিকের বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet