১৭ জুন ২০১৯

মেলায় নারী লেখক

-

ফেব্রুয়ারি মানেই আমাদের অস্তিত্ব, ফেব্রুয়ারি মানেই মায়ের ভাষা, ফেব্রুয়ারি মানেই আমাদের মুখের বুলি অ আ ই ঈ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাহাত্তর সালেই গ্রন্থমেলার আয়োজন হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তবে এখন আমরা যে অমর একুশে গ্রন্থমেলা দেখছি তার আনুষ্ঠানিক সূচনা ১৯৮৪ সালে। ’৭২ ধরে হিসাব করলে ৪৭ বছর, আর ’৮৪ ধরলে ৩৬ বছর বয়সী আমাদের প্রাণের এই মেলা, ভাষার মেলা। একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে বইমেলার পরিসর ছড়িয়ে পড়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। একই সাথে বেড়েছে পাঠক ও লেখকের সংখ্যা। প্রতি বছর বই বিক্রির হারও বাড়ছে, এত এত বাড়ার মাঝে নারী লেখকদের সংখ্যা কিন্তু সেই হারে বাড়েনি। মেলায় আসা মোট বইয়ের ২৫ শতাংশের বেশি হবে না নারী লেখকদের বই, এমনটাই অনেকের মতামত। তাহলে পুরো ৭০-৭৫ শতাংশ বই পুরুষদের। হাতেগোনা কিছু নারী লেখকদের বই চললে ও প্রচারের দিক দিয়ে নারীরা অনেক পেছনে। তার কারণ নারীদের পদে পদে বাধা। বই প্রকাশের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। যত প্রকাশনী তত নিয়ম, যত লেখক তত নিয়ম। নারী লেখকদের ক্ষেত্রে একটু নিয়ম বেশিই। প্রকাশকরা বলেন, ভালো পাণ্ডুলিপি পেলে আমরা বই করব। তবে নারী লেখকদের বইয়ের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে।
প্রবীণ লেখিকার সাথে অনেক নতুন নারী লেখকের বইও বইমেলায় আসছে। এমনই একজন রহিমা আক্তার মৌ। এবারের বইমেলায় তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। অনুগল্পের বই ‘অল্প স্বল্প গল্প’ শিশুতোষ গল্পের বই ‘প্রিয়ন্তির সারাবেলা’ এই বই দু’টি প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা কর মৌ। ‘বেলা শেষের গদ্য’ বইটি ১৪টি গল্পকে এক মলাটে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছে ঊষার দুয়ার প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছেন রাজিব চৌধুরী। শিশুতোষ গল্পের বই ‘গল্পগুলো তুলতুলির’ বইটি প্রকাশ করেছে দাঁড়িকমা প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছেন ফকির আল মামুন। দ্বীপজ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’ নামে দু’টি চিঠির বই সম্পাদনা করেছেন রহিমা আক্তার মৌ। বই দু’টিতে রয়েছে ৮৫টি চিঠি।
রানী সিদ্দিকা ইয়াসমিন পেশায় শিক্ষক, শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি করেন। ‘বৃত্তভাঙা চাঁদের জোছনা’ তার গল্পগ্রন্থ। মহাকাল প্রকাশনীর বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। নিজের বই সম্পর্কে ইয়াসমিন বলেন, ‘সময়ের সাথে সামাজিক প্রেক্ষাপট পাল্টেছে, কিন্তু আমাদের মন ও মানসিকতা তেমন একটা পাল্টায়নি। আর এই দুর্বল মানসিকতার জন্য আমরা নিজেরাই যেন কিছুটা দায়ী। আমরা প্রতিবাদ করতে শিখিনি। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে উঠলে সমস্বরে তাকেই দোষী সাব্যস্ত করার জন্য উঠেপড়ে তার পেছনে লাগি। ‘বৃত্তভাঙা চাঁদের জোছনা’ গল্পের বইটি, সমাজের সেসব ঘটনার প্রতিচ্ছবি।
মেহেরুন নেছা রুমা, পেশায় লেখক ও সাংবাদিক। নালন্দা প্রকাশনী থেকে আসছে তার গল্পগ্রন্থ ‘রাত্রি শেষের নির্জনতা’ প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।
নিজের বই নিয়ে রুমা বলেন, ‘গল্পের প্রতি ভালোবাসা, আর ভালোবাসার গল্প আমার। সময়ের ভালো কিংবা মন্দ দিক নয়। সময় তো কেবল গল্প বয়ে বেড়ায়।
তাহমিনা তানির পেশা সাংবাদিকতা, পাশাপাশি নাটকের স্ক্রিপ্ট ও চিত্রনাট্য লিখেন। তার গল্পগ্রন্থ, ‘নীলরঙ ভালোবাসা’ বইটি প্রকাশ করেছে প্রিয়মুখ প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছেন মো: রায়হান উদ্দিন ফকির। লেখক তানি বলেন, ‘নীলরঙ ভালোবাসা’ আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ, লেখক হয়ে উঠার প্রথম স্মারক বলা যায়। গল্প লিখতাম, তবে আমি আসলে ভাবিনি, বই বের করব। ‘লিখব যা বলতে চাই’ নামে একটা গ্রুপে লিখতাম, সেখানেই আমার পাঠক তৈরি হয়। গ্রুপের এডমিনসহ অন্য সদস্যরা বেশ পছন্দ করেন আমার গল্পগুলো। পূর্ব ঘোষিত গ্রুপে বছরের সেরা গল্পকারের এবং সেরা কবির বই বের করবে প্রিয়মুখ প্রকাশনী। প্রকাশকের ঘোষণায় নিজের নাম দেখে বিশ্বাস করতে পারিনি। যাক, আল্লাহর অশেষ রহমত আর পাঠকদের ভালোবাসায় সম্ভব হলো বইটি প্রকাশ করা। কৃতজ্ঞতা প্রিয়মুখ প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদ ফারুক ভাইকে।
সারমিন ইসলাম রতœার শিশুতোষ গল্পের বই ‘তাহিয়ানের যত মজার কাণ্ড। সাতভাই চম্পা প্রকাশনীর বইটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন সোহেল আশরাফ। চারটি মজার গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘তাহিয়ানের যত মজার কাণ্ড’।
২০১৯ বইমেলায় পাঠকের জন্য শেখ সুমাইয়া সুলতানার বই ‘কিছু বলতে চাই’। বইটির এই ম্যাগনেটাইট নামকরণ করেছেন শ্রদ্ধেয় কবি ও আবৃত্তিশিল্পী একান্ত চৌধুরী রানা। বাবুই প্রকাশনীর বইটির প্রচ্ছদ করেছেন সুলাইমান সাদী। বই সম্পর্কে সুমাইয়া বলেন, ‘বইটিতে ধর্ম, রাষ্ট্র এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে ছোট ছোট বাণী লেখা। শত ব্যস্ততার ভিড়ে বিবেকের তাড়নায় লেখা কিছু বাণী তুলে ধরেছি।’
সাহিদা সাম্য লীনা, পেশায় সাংবাদিক। অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম কবিতার বই ‘একবার বলে দাও’। সাহিত্যদেশ প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশ পাচ্ছে, প্রচ্ছদ করেছেন প্রিন্স ঠাকুর। বই সম্পর্কে লীনা বলেন, ‘বইটা প্রকাশ করতে অনেক সময় লেগে গেল নানা সঙ্কটে। সব লেখকই তার বইকে সন্তান বলে অবহিত করেন। আমারো একটি সন্তান আছে। তবে এ বইটাকে আমি বন্ধু বলছি।’
মেহবুবা হক রুমার কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সতেরো’ আসছে অমর একুশে বইমেলায়। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী মায়িশা ফওজিয়া হক। নিজের কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সতেরো’ নিয়ে রুমা বলেন, ‘ষোলো সালের কিছু নির্বাচিত কবিতা নিয়ে বইটি মলাটবন্দী করা। সাত সতেরো বইটিতে আছে আমার সতের সালের লেখা ১৫০টি কবিতা থেকে বাছাইকৃত কিছু উল্লেখযোগ্য প্রিয় কবিতা।
জাতীয় পত্রিকা ও শিশুতোষ মাসিক পত্রিকা নবারুণে প্রকাশিত মোট আটটি গল্পের সমন্বয়ে ‘ওদের পাশে আমরা’ নামে বই আসছে ফারিহা আহসান অভ্রর। পাতা প্রকাশনীর বইটির প্রচ্ছদ করেছেন আলেয়া বেগম আলো। নিজের বই নিয়ে অভ্র বলে, ‘গল্পের বই পড়তে পড়তে লিখতে ইচ্ছে করে। স্কুল ম্যাগাজিনে লিখছি দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে। মজার কিছু সময়কে নিয়ে লেখা আমার গল্পগুলো।
সাদিয়া তাজিন, চট্টগ্রামের এনজিও সংস্থা ‘ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনÑ ইপসা’য় কর্মরত। ছোট বড়, অনুগল্পসহ ১৪টি গল্পের সমাহারে অমর একুশে বইমেলা ২০১৯-এ প্রকাশিত হয়েছে তার বই ‘গল্পগ্রন্থ দহন বেলা’। বই সম্পর্কে সাদিয়া বলেন, ‘সমাজে অনেক পরিবার আছে যারা মেয়েকে প্রবাসী পাত্রের কাছে পাত্রস্থ করতে পারলে খুশি হন। অনেকে প্রবাসীর বিত্তের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে। বিয়ের পর পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে স্বামীর শারীরিক, মানসিক সহিংসতার শিকারে মেয়েটি হতবিহ্বল, হতাশা, বিভক্তি আর অজানা আশঙ্কায় বিপর্যস্ত হয়। সে কঠিন দুঃসময়ে একজন নারী নিজেকে চৌহদ্দির অন্তরাল থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে, পূর্ব প্রেমিকের কাছে ফিরে যেতে চায়, তার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে দহনবেলা গল্পগ্রন্থে।

 


আরো সংবাদ