২০ জুলাই ২০১৯

দায়িত্ব থেকেই আসে সচেতনতা : উইম আল দাখিল

ভিন দেশ
-

আট বছর বয়স থেকেই প্রতিদিন সকালে তার বাবা বাসার জন্য যে সংবাদপত্র কিনতেন তা এক নজর দেখার জন্য দৌড়ে নিচে নামতেন। শিশুকাল থেকে সংবাদপত্র পড়ার ক্ষেত্রে অবাক করা এমন ঝোঁকপ্রবণতা যার ছিল, তিনি হচ্ছেন সৌদিতে সংবাদ উপস্থাপনায় প্রথম নারী উইম আল দাখিল। তিনি এখন দেশটির গণমাধ্যম জগতের অন্যতম পেশাদার নারী অ্যাংকর হিসেবেও পরিচিত। পড়াশোনাও করেছেন সাংবাদিকতা বিষয়ে। তিনি মনে করেন, মহান এই পেশার দায়িত্বে থেকে মানবহিতৈষী কাজও করা যায় অনায়াসে। উদ্বাস্তুদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও উঠে আসে তার নাম। তিনি বলেন, এই পেশা যেমন চ্যালেঞ্জিং তেমনি ঝুঁকিরও। সমস্যাপীড়িতদের জন্য কিছু করতে পেরে আজ নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। তার এই সাহসী সফলতা সৌদি আরবে নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সম্প্রতি যোগ হলো আরো একটি মাইলফলক। অর্থাৎ এই প্রথম সরকারি টেলিভিশনে কোনো নারী রাতের প্রধান বা মূল সংবাদ পাঠ করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তাকে দেখা গেল ‘সৌদি টিভি চ্যানেল-১’ এ। অবশ্য তিনি আরেক পুরুষ সহকর্মী ওমাস আল নাসওয়ানের সাথে সংবাদ পাঠ করেছেন। এর আগে ২০১৬ সালে জুমানা আল জামি নামের এক নারীকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সকালের দিকে খবর পড়তে দেখা গিয়েছিল। সেদিক থেকে অবশ্য জুমানার নাম প্রথম টিভি অ্যাংকর হিসেবে থাকলেও যোগ্যতার মাপকাঠিতে উইমই সংবাদ পাঠের জগতে প্রথম পেশাদার নারী অ্যাংকর হিসেবে পরিচিতি পান।
উইম পর্দায় কেবলই একজন উচ্চমার্গীয় ব্যক্তিত্বই নন, পাশাপাশি সৌদি টিভির অপারেশন ম্যানেজার। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে দেশটিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরাই তার কাজ। একটি বয়সে তিনি বলতেন, ‘আমি আমার জীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে রাখব এবং সংবাদগুলোর পুরোটাই পড়ে যাবো।’ যখন সময় এলো তার ক্যারিয়ার বেছে নেয়ার, তখনই তিনি তার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে থাকেন।
মরক্কোতে জন্ম, জেদ্দায় বেড়ে ওঠেন এবং লেবাননে লেখাপড়া করেন আল দাখিল। এখন রিয়াদে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘অতীত ক্রিয়াকলাপ আমার জীবনকে একটি সুন্দর আকার দিয়েছে। তাই আমি হৃদয় দিয়ে কাজ করি। নতুন ইতিহাস গড়ে কাজ করার আনন্দই অন্য রকম। এটা হতে পারে এক সতেজ শুরু, যার সাথে বড় আকারের দায়িত্ব সম্পর্কিত। আমি আমার আবেগ সম্বন্ধে সচেতন এবং দায়িত্ব থেকেই আসে সচেতনতা। এই কাজ বা পেশায় কোনো অযাচিত চাপ অনুভব করি না।’
তার দৃষ্টি প্রখরভাবে কাজ করছে। তিনি নিজেকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেনÑ এমন বিষয়ে। সৌদি টিভিতে বর্তমান উচ্চতায় আসার আগে সংবাদজগতের অনেক শাখা প্রশাখায় বিচরণ করেছেন তার প্রকৃত আবেগকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। আল-হায়াত নামের একটি আরব দৈনিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর বাহরাইনে আল আরব নিউজ চ্যানেলে সংবাদ পাঠিকার কাজ করেন। সেপ্টেম্বর ২০১২ থেকে নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত সৌদিতে সিএনবিসি টিভিতে রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করতে আমার বেশি ভালো লাগে। দাখিল ২০১১তে সাংবাদিকতা বিষয়ে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে। ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউট ফর উইমেনস স্টাডিজ ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড কোর্স থেকে জেন্ডার ইন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্সে ডিপ্লোমা করেন। এ ছাড়া ভিটি প্রেজেন্টার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন ফোকাস একাডেমি এবং আলজাজিরা মিডিয়া ট্রেনিং সেন্টার থেকে। তিনি বলেন, পেশাগত কাজে ভালো করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণেরও বিকল্প নেই।
বৈরুতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে একটি ছাত্র প্রকাশনায় উইম প্রধান সম্পাদক ছিলেন। শিক্ষানবিস সাংবাদিকেরা দেখতে পেতেন বিভিন্ন ধরনের গল্প বলা লোকজন। তাদেরকে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় বা প্রকাশের সুযোগ করে দিতেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় তিনি দেখেন, গাল্পিকরা তাকে একেবারে হৃদয় যেন ঢেলে দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, শিক্ষানবিসদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হলে তাদের মনের সুপ্ত বাসনাকে বের করে আনতে হবে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে।
উইম গৃহহারা এক ব্যক্তির গল্প প্রায়ই স্মরণ করেন, যে লোকটিকে তিনি প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় দেখতে পেতেন। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তার (দাখিলের) মনকে দোলা দিয়েছে তা হচ্ছে, ওই লোকটির বুদ্ধি ও লাগসই শব্দ। এ থেকে তিনি মনে করেন, নিজের চোখে যা দেখছেন তার অনেক বেশিই আছে ওই গৃহহারা লোকটির মধ্যে। একদিন এমনো জানতে পারেন, গৃহহারা লোকটি একজন চিকিৎসক। তার সাক্ষাৎকার নিতে গেলে দাখিল তাকে আর খুঁজে পাননি। এই অভিজ্ঞতাও তাকে একটি বিশেষ শিক্ষা দিয়েছে। তিনি বলেন, মুখমণ্ডল দেখে কোনো মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করা যাবে না।
দাখিল বেড়ে ওঠেন বুদ্ধিজীবী পরিবারে। তার বাবা প্রচুর লেখাপড়া করতেন। সারা বিশ্বে কী ঘটছে তা বিশদভাবে জানার চেষ্টা করতেন। পরিবারের সদস্যরা বড় হলে সেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়। এসব নিয়ে সদস্যরা মতবিনিময় করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ইসরাইল লেবানন আক্রমণ করলে তার বাবা দাখিলের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন ও তাকে সৌদিতে ফিরে আসার কথা বলেন। কিন্তু দাখিল ধৈর্য ধরেন এবং পরিবারকে বোঝান যে, তাকে সেখানেই থাকতে হবে লেখাপড়ার জন্য। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘লেবাননে বসবাস ও পড়ালেখা বিভিন্নভাবে আমার জীবনকে একটি সুন্দর আকার দিয়েছে। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি। আমার বাবা-মা আমাকে দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য সাহস দিয়েছেন। আমাকে নানা উপদেশও দিতেন। মা-বাবার পাশাপাশি উইমও বলেন, একজন দায়িত্ববান লোক যেকোনো প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বেশ শক্তিশালী। তিনি নিজেকে একজন সাংবাদিক হিসেবে ভাবেন। তার কাজ হচ্ছে নিজ ভূমিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনশীল জিনিসগুলো তুলে ধরা। সাংবাদ পাঠিকা কিংবা সাংবাদিক হিসেবে তিনি মনে করেন, পৃথিবী পরিবর্তনশীল। কোনো কিছুর পরিবর্তন ঘটছে সেই জিনিসের মূল থেকে, সেটা শিক্ষা, সমাজ, সংস্কার এবং অপরের মতামত গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়। তিনি পুরুষশাসিত কর্মক্ষেত্রে কাজ করলেও তার মতামত ব্যক্ত করতে লজ্জায় সঙ্কুচিত হন না মোটেই। খুবই শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তির এক নারী তিনি। যার বক্তব্যে উঠে আসে, ভালো বা নিরাপদ কর্মক্ষেত্র যেন একটি নিষ্কলুষ স্থান। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে ভীত সন্ত্রস্তও করে না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি নীরবে কাজ করি এবং আমার কৃতকার্যতার গর্জন মানুষ শুনতে পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতা আমার পেশা হলেও হৃদয়জুড়ে আছে মানবহিতৈষী বা জনহিতকর কাজের ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণা। ২০১৬তে তিনি জর্দান গিয়ে গাজা ক্যাম্পে জেরাস উদ্বাস্তুদের সাহায্য করেন। মানব কল্যাণের জন্য আরো কিছু করার প্রেরণা তাকে তাড়া করে। ক্যামেরা নিয়ে মানুষের কী হচ্ছে তার ছবি নেন। তার নানা কাজকর্ম সৌদি ভিশন ২০৩০-এরও অংশ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও তিনি তার কাজের সফলতার জন্য নানাভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন।


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi