২৩ আগস্ট ২০১৯
ভিন দেশ

ইলহান ওমর এক সংগ্রামী নারী

-

ইলহান ওমর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে দু’জন মুসলিম নারী সম্প্রতি কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরই একজন এই ইলহান ওমর। তিনি হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মধ্য পশ্চিমাঞ্চলীয় মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক অধ্যুষিত এলাকা থেকে। বিশ্বের মানুষ এখন ইলহান ওমরকে বলছেন মিনেপোলিসের (মিনোসোটা অঙ্গরাজ্যের) ‘অগ্রদূত’।
ইলহান ওমর এসেছেন সোমালিয়া থেকে। শিশু বয়সে দীর্ঘ চার বছর কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে ছিলেন সাহসী এই নারী। তাকে সাহসী বলা হচ্ছে এ কারণে যে, হিজাব পরার পক্ষে তর্কযুদ্ধেও তিনি জয়ী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রথম হিজাব পরা সদস্যও তিনি। অথচ ওখানকার অনেক শাসকই তা না পরার পক্ষে যুক্তি দেখান। তিনি কৌশলে এসব যুক্তি খণ্ডন করেন। কংগ্রেসের একটি সভায় তার হিজাব পরার বিষয়ে অভিযোগকারী এক ধর্মীয় নেতাকে কৌশলে নিশ্চুপ করিয়ে দেন। ইলহান বলেন, আমি এখন একজন কংগ্রেস প্রতিনিধি। এ ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তই প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমি মনে করি। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রূপ পাক কংগ্রেস। বিরোধীরাও বলছেন, এখন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মত দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের অধিবেশনে। বলা যেতে পারে, প্রায় ১৮১ বছরের পুরনো গতানুগতিক ভাবধারাকে পাল্টে দিলেন তিনি। ইলহানের পক্ষের লোকেরাও এই আইনের ব্যাখ্যা চেয়ে দাবি করেছেন যে, ধর্মীয়ভাবে শিরাবরণ ব্যবহার করা উচিত হাউজ চেম্বারে। ইলহান ওমর এ সংক্রান্ত যে দাবি করেছেন তা অযৌক্তিক নয় মোটেই।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টার এক হিসাবে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ৩.৪৫ মিলিয়ন। এ অবস্থায় সভা চলাকালে মাথায় হিজাব পরা যুক্তিহীন কোনো বিষয় নয়। এ ব্যাপারে ইলহান বলেন, ‘আমার মাথায় কেউ হিজাব পরিয়ে দেয়নি। আমি নিজেই তা পরেছি। এটা আমার ব্যাপার। তা আমি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই কাজ করছি। একসময় তা দেখা যাবে সভার বাইরেও। কিছু ধর্মীয় নেতা যখন এ নিয়ে রীতিমতো বিলাপ করছিলেন, তখন প্রতিনিধি সভা ইলহানকে নির্বাচিত করে যুক্তি দেয় যে, এখন থেকে ইলহান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য উন্নততর নীতি নির্ধারণ করবেন।
এক যোগাযোগ বার্তায় ইলহান ওমর উল্লেখ করেন, ২০ বছর আগে কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবির থেকে আমার পিতা ও আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌঁছেছিলাম। আজ সোমালি আমেরিকান হিসেবে কংগ্রেসে শপথ নেয়ার জন্য একই বিমানবন্দরে যাচ্ছি, যা এক বিস্ময়কর গল্পের মতো।
সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৯১ সালে তিনি পিতার সাথে কেনিয়ায় পালিয়ে যান। ইলহান বলেছেন, কিভাবে আমরা সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে মাঝরাতে অল্পের জন্য সেনাদের হাত থেকে পালাতে সক্ষম হই, তা বলাও কঠিন। বর্ণনা দেন, কিভাবে তিনি মৃতদেহ, ভাঙা দালান কোঠা ইত্যাদির ওপর দিয়ে পালিয়ে যান। তারা কেনিয়ার উটাঙ্গ শরণার্থী শিবিরে প্রায় চার বছর অবস্থান করেন। এই ক্যাম্পের বৈশিষ্ট্য ছিল অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, রাতে শয়নের অস্থায়ী তাঁবু ইত্যাদি। এ সংক্রান্ত এক ভিডিওর কথাও বলেন তিনি। তা হলো, শরণার্থী শিবিরটি ছিল এক দূরবর্তী অঞ্চলে। তারা শহরে চলাচলের অনুমতি পাননি। তার একমাত্র কাজ ছিল পানি আনা ও নিটবর্তী অঞ্চল থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা। ২৫ বছর পর ৩৭ বছর বয়সে শেষ পর্যন্ত ইলহানই ইউএস কংগ্রেসে একজন মুসলিম প্রতিনিধি নিযুক্ত হলেন। অনেকে বলেছেন, ইলহান হলেন এক তীব্র বহমান সংগ্রামী নারী। তিনি সবার জন্য স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, শিক্ষার্থীদের ঋণ মওকুফ ইত্যাদি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলেন। সামর্থ্য অনুযায়ী গৃহায়ন সুবিধার প্রতিও গুরুত্ব দেন। কলেজের যেসব শিক্ষার্থীর পরিবারের আয় অনেক কম তাদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের কথা বলেন। শ্রমিকদের শ্রমের মজুরি বাড়ানোর প্রতিও গুরুত্ব বাড়ান। ‘যেমন ভোগ করেছ তেমন মূল্য দাও’ এই নীতির বিরোধিতা করে তা সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
২০১৬ সালে ইলহান ওমর লেবার পার্টির ডেমোক্র্যাটিক ফার্মারের মেম্বার হিসেবে মিনোসোটা হাউজে প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। প্রাথমিক জীবন তিনি অতিবাহিত করেন সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে। সাত সন্তানের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। তার পিতা নূর মোহাম্মদ ওমর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতেন। ইলহানের বয়স যখন প্রায় দুই বছর, তখন তার মা মারা যায়। পিতা এবং দাদার কাছে তিনি বড় হন। ১৯ বছর বয়সে ২০০০ সালে ইলহান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
ইলহান ওমরের জন্ম ১৯৮১ সালের ৪ অক্টোবর সোমালিয়ার মোগাদিসুতে। একসময় তিনি এডিসন হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ছাত্র সংগঠক ছিলেন। পরে নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২০১১ সালে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। হামফেরে স্কুল অব পাবলিক এফেয়ার্সে একজন পলিসি ফেলো ছিলেন তিনি।
তিনি পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন তার সম্প্রদায়ের পুষ্টিশিক্ষা বিষয়ে। ২০০৬ থেকে ০৯ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর মেনিপোলিস সেইন্ট পল এলাকায় এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে কারি ডিজেজিক পুনর্নির্বাচনে অংশ নেন মিনোসোটা স্টেটস সিনেটের জন্য। ২০১২-১৩ পর্যন্ত মিনেসোটা ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনে শিশুপুষ্টির কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফেব্রুয়ারি ১৪ তে তিনি কিছু লোক দ্বারা আক্রান্ত হন। সেপ্টেম্বর ২০১৫তে ওম্যান অর্গানাইজেশন ওম্যান নেটওয়র্কে পরিচালক ছিলেন। সংস্থাটি পূর্ব আফ্রিকার নারীদের নগর বা নাগরিক বিষয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে কাজ করে। ইলহানের পুরো নাম ইলহান আবদুল্লাহি ওমর।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet