২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
ভিন দেশ  

মাঝে মধ্যে দুঃখ-কষ্ট আরো শক্তিশালী ও সহনশীল করে : আহেদ তামিমি

-


আহেদ তামিমি। ফিলিস্তিনের তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহের প্রতীক এ তামিমি। অথচ তিনি বর্তমানে মাত্র ১৭ বছর বয়সী একজন কিশোরী। তার জন্ম ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের (ওয়েস্ট ব্যাংক) নাচি সালিহ নামকস্থানে ২০০১ সালের ৩১ জানুয়ারিতে। তার সাহসী কাজের গল্পের যেন অভাব নেই। যেগুলো ফলাও করে প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। এভাবেই আহেদ তামিমি বিশ্বের সাহসী নারীদের একজন বলে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন।
তামিমি তাদের অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর ইসরাইলের অযাচিত হস্তক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রয়োজনে দেশটির সেনাসদস্যদের ওপর বলতে গেলে ঝঁাঁপিয়েও পড়েছেন সাহসী এ কিশোরী। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেলে তা রীতিমতো ভাইরালও হয়। যেগুলোকে বিশ্ববাসী ন্যক্কারজনক ঘটনা বলে মনে করছে এবং বলা হয় ইসরাইল ফিলিস্তিনে যা করছে তা অনুচিত। অপর দিকে, তামিমি একজন ফিলিস্তিনি সংগ্রামী কিশোরী। ইসরাইলি সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার বহু ছবি ও ভিডিও তার প্রমাণ। অনেকে বলছে, তামিমি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার একজন অগ্রদূত। যদিও তার সমালোচকেরা তাকে ইসরাইলের নিন্দাকারী হিসেবে সাজানো নাটক বলে মনে করছে।
ইসরাইলি সেনারা গত ডিসেম্বরে (২০১৭) বাড়ি থেকে তামিমির ভাইকে আটক করে। এতে বাধা দেন তামিমি। বাধা না মানায় একপর্যায়ে তামিমি চড় মারেন এক সেনাকে। এর জেরে আটক করা হয় তামিমিকেও। এ নিয়ে বিচারও হয়। ইসরাইলি আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে আট মাসের কারাদণ্ড দেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশেষে তাকে মুক্তি দেয়া হয় ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই।
তামিমির মাকেও আটকের সময় (২০১২ এর আগস্টে) তামিমি দুর্দান্ত সাহসের সাথে এর বাধার সৃষ্টি করেন। এর কৌশল দেখে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রপতি তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অসীম সাহসের কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হন। এ রকমভাবে চিহ্নিত হওয়ার আরো কারণ আছে। তার বড় ভাইকে ইসরাইলি সেনারা আটক করতে এলে তামিমি সেনাদের ঘুষি মারেন। তার সাহস দেখে খুশি হয়ে তৎকালীন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী তাকে তুরস্কে আমন্ত্রণ জানান।
তামিমি ইসরাইলি সেনাদের প্রতি পাথরও নিক্ষেপ করেন। এক সেনাকে কামড়িয়ে ও আঘাত করেও প্রতিশোধ নেয়। তার প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়ে প্রচুর সংখ্যক প্রতিবাদী, আগ্রাসী ইসরাইলি সেনাদের প্রতি ইটপাথর নিক্ষেপ করে। সেই মুহূর্তে তামিমির বাড়িতে ইসরাইলি সেনারা সুগঠিত হয়ে প্রবেশ করে এবং তামিমিদের শান্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। হয়তো প্রতিবাদের মুখে অবস্থা বেগতিক দেখে তারা এটি করেছে।
তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ তামিমিকে প্রতিবাদের সময় সেনারা তার মাথায় কাছাকাছি দূরত্ব থেকে রাবার বুলেট ছুড়ে। এতে তিনি আহত হন। এদিকে, তামিমির সমর্থনে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের প্রধান শহরগুলোতে র্যালি হয়েছে। ইতালিয়ান শিল্পীরা তার এই মুক্তিকে স্মরণ করার জন্য তামিমিকে নিয়ে দেয়ালচিত্র অঙ্কন করে। এ শিল্পীদেরও পরে আটক ও ইসরাইল ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তামিমি এসবেরও ঘোর প্রতিবাদ করেন। ফিলিস্তিনির অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ওপর ইসরাইলি অসদাচরণকেও তিনি সারা বিশ্বে তুলে ধরেন।
ফিলিস্তিনি শিশুদের দ্বিতীয় বংশধর তামিমি। যারা বেড়ে ওঠে অধিকৃত ভূমিতেই। তামিমির জীবনের লক্ষ্য ছিল আইনজীবী হওয়ার। তার পরিবার তার নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে ফিলিস্তিনির রামল্লাহ গ্রামে এক আত্মীয়র বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট অতিক্রমের ভয়কে সহজেই পাশ কাটাতে সক্ষম হন।
তামিমিদের পারিবারিক বাড়িটি ২০১০ সালে গুঁড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসরাইলি বাহিনী। সেখানে সেনাবাহিনীরা হানা দেয় প্রায় দেড় শ’ বার। তখন তিনি তা প্রতিহত করতে ইসরাইলি সম্প্রসারণবাদ ও ফিলিস্তিনিদের আটকের বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকেন। তিনি মনে করেন, প্রমাণ সাপেক্ষ দলবদ্ধ প্রতিবাদ ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের স্বীকৃতি পাবে। বছরের পর বছর ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কাজ করার মাধ্যমে তিনি মনমরা ফিলিস্তিনিদের চাঙা করার সাহসিকতার কারণে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হন।
মোটকথা, তামিমি তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, আমি আমাদের অধিকারে বিশ্বাসী, যদিও বিধ্বস্ত আমরা জীবনযন্ত্রণায়। তামিমি বলেন, যেকোনো বিপদ বা সমস্যায় আমাদের ভেঙে পড়লে চলবে না। মাঝে মধ্যে দুঃখ-কষ্ট আরো শক্তিশালী ও সহনশীল করে।
বলার অপেক্ষা থাকে না যে, তামিমি সব সময় সোচ্চার ছিলেন ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ মনোবল হারানোর মতো কিশোরী নন তিনি, এমন মন্তব্য করেছেন তার সমর্থক ও অনুসারীরা। তারা বলেন, কঠিন দুঃখ-কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্যে যে বা যারা টিকে থাকতে পারে, তারা যেমন অনুকরণীয় তেমনি অনুসরণীয়। মনে রাখতে হবে, জীবনের অনেক পথই কণ্টকাকীর্ণ।


আরো সংবাদ