২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
আ মি ও ব ল তে চা ই

বিপরীত অধ্যায়

-

বড় মামী তৃতীয়বারের মতো ছেলের মা হয়েছেন, এ আনন্দে মামা আমার হাতে কয়েকটা পাঁচ শ’ টাকার কচকচে নোট ভরে দিয়ে বললেন, বাজার থেকে দশ মণ মিষ্টি আনতে। মনের আনন্দে মামা আজ পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিলাবেন। কেননা তিনি মনে মনে আল্লাহর কাছে তিনটি পুত্র সন্তান চেয়েছেন। আজ তৃতীয় সন্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে মামার সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।
বাড়ি থেকে কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে মামার ডাক। মলিন কণ্ঠে বললেনÑ‘মিষ্টি দশ মণ নয়, মাত্র দশ কেজি আনবি। ধাত্রী ভুল সংবাদ দিয়েছেন। তোর মামাতো বোন হয়েছে।’ মামার কথা বলার ভঙ্গিমাটা এমন ছিল, যেন মেয়ে সন্তান হওয়াতে তিনি বেশ অসন্তুষ্ট।
মামা অসন্তুষ্টই ছিলেন। সোহেল আর শিহাবের পর তিনি যদি আরেকটা ছেলে সন্তানের বাবা হতে পারতেন, কিন্তু তাসলিমার জন্মের মধ্য দিয়ে দেখা গেল মামার মুখে বিষাদের কালো মেঘ।
মেয়ে সন্তান লালন করে কোনো লাভ নেইÑ এই আত্মবিশ্বাসে মামা সবাইকে জ্ঞান দিতে লাগলেন। মেয়ে সন্তান নাকি পরিবারের বোঝা। বয়স হলে টাকা দিয়ে এদের পার করতে হয়। সুন্দরী হলে একটা কথা ছিল, কিন্তু তাসলিমার চেহারা-সুরত মোটামুটি খারাপ না হলেও গায়ের রঙ অসম্ভব কালো বলে মামার চিন্তার অন্ত নেই। তাই মামা নবজাতকের সেবাযতেœর কথা না ভেবে ভবিষ্যতে এ কালো মেয়ে নিয়ে তার কি হাল দশা হবে, সে চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন। পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী এই রাগী মামাই, আর তাই পরিজনেরা মামার ভুল ভাঙানোর সাহস পেল না।
সোহেল আর শিহাব দিন দিন বাবার অপার ¯েœহে বড় হতে থাকল। ভবিষ্যতে এ দুই ছেলেই মামার দুর্দিনের সহায় হবে, তাই মামা সোহেল আর শিহাবের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ববান হয়ে উঠলেন। উন্নতমানের পোশাক আর পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি দুই ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করানো হলো। দুই ছেলের সব আবদারই মামা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বিলম্ব করেন না।
অন্য দিকে, তাসলিমা পিতৃ¯েœহ থেকে অনেকটা বঞ্চিত। দিন দিন বড় হওয়ার পাশাপাশি সে দেখে আসছে বাবা তার সাথে এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্বের দেয়াল গড়ছেন কোনো কারণ ছাড়াই। অথচ তার আপন দুই ভাইয়ের প্রতি বাবার কি উদার আয়োজন সব ক্ষেত্রে। মাঝে মধ্যে তাসলিমা মায়ের কাছে প্রশ্ন করেÑ‘বাবা আমাকে দুই চোখে দেখতে পারেন না কেন?’ মামী কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন, আর ভিজে আসা চোখের জল গোপনে মোছেন। তাসলিমা জীবনে যতটুকু আদর ¯েœহ পেয়েছে, সব মায়ের কাছ থেকেই।
মামীর আগ্রহে একসময় তাসলিমাকে স্কুলে ভর্তি করানোর পর ভালো ছাত্রী হিসেবে অল্প দিনে সে সবার নজরে চলে আসে। ক্লাসের ফাস্ট গার্ল হিসেবে একনামে সবাই চিনে নিলো তাসলিমাকে। প্রতিবার বার্ষিক পরীক্ষায় যখন তাসলিমার ফি বা ভর্তি ফরমের জন্য যে টাকার দরকার হয় মামা তখন তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। মেয়ের পেছনে অযথা এতগুলো টাকা নষ্ট করে লাভ কি, এমনিতে এ কালো মেয়েকে বিয়ে দিতে মোটা অঙ্কের টাকা লাগবে। এ নিয়ে মামা-মামীর প্রায়ই রাতে কথাকাটাকাটি হয়। তাসলিমা মন খারাপ করে বসে বসে মা-বাবার এই এক ধরনের নীরব যুদ্ধ দেখে। মাঝে মধ্যে তার মনে হয়Ñ কেন যে সে মেয়ে হয়ে জন্মাল! ছেলে হয়ে জন্মালে বড় দুই ভাইয়ের মতো বাবার সমান আদর পেত।
অনেক বছর পরের কথা। সোহেল, শিহাব ও তাসলিমা বড় হয়ে গেছে। ততদিনে সোহেল ও শিহাবকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে মামা মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন। এ দিকে, পড়ালেখায় দক্ষ হওয়ার কারণে তাসলিমাও প্রাইমারিতে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়ে গেল।
দিন যায়, মাস আসে। ইংল্যান্ড প্রবাসী দুই ছেলের পাঠানো টাকার প্রতীক্ষায় বসে থাকে মামা। কিন্তু সোহেল আর শিহাব যে পরিমাণ টাকা পাঠায়, তাতে মন ভরে না মামার। এত অল্প টাকায় সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সোহেল আর শিহাব এক সময় মামাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তাদের এখন দুই চোখের দৃষ্টি উপরের দিকে। ইংল্যান্ডের অভিজাত ড্যান্স ক্লাবে তাদের অবাধ আসা-যাওয়া আর মদের পেয়ালাতে নিজেদের চরিত্র ডুবিয়ে দিয়েছে দুই ছেলে, এমন সংবাদ কার কাছ থেকে যেন শুনলেন মামা।
এক সময় বদলে গেল জীবনের গতিপথ। মাসের পর মাস চলে যায়। মামা আর দেশের দিকে কোনো টান নেই সোহেল আর শিহাবের। দুই ছেলেকে বাইরে পাঠাতে সারা জীবনের সব সঞ্চয় শেষ করে মামা যখন অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেছেন, তখন তাসলিমা এলো বাবার পাশে। স্কুলে মাস্টারি করে সে যে পরিমাণ মাইনে পায়, সব বাবার হাতে তুলে দেয়। মেয়ের রোজগারের টাকা হাতে নিয়ে প্রতিবার মামা দ্বিধা আর সঙ্কোচে ভোগেন। কারণ মেয়ে সন্তান জন্মেছিল বলে তিনি কোনো দিন তাসলিমাকে একবার ভালোবেসে কাছে ডেকে নেননি। যাদেরকে আদর-যতেœ বড় করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন রাশি রাশি; ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য দেশের বাইরে পাঠিয়েছেনÑ আজ তাদের হদিস নেই। ভাবনা আর ইচ্ছেগুলো তার বিপরীত হয়ে গেছে। এখন তাসলিমার টিচিংয়ের আয়ে সংসার চলে।
জোবায়ের রাজু, আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ