১৮ জুলাই ২০১৯

কন্যারাও করতে পারে জয়

-

ছোট্ট মেয়েটা দৌড়াতে দৌড়াতে ঘাটে এসে দূর থেকেই ডাক দিয়ে বলে, ‘আব্বা বুন্ডি হয়ছে আব্বু! তোমারে দাদী ডাকতাছে।’ হাসিখুশি মুখটা হঠাৎ করেই ম্লান হয়ে গেল। পাঁচ মেয়ের পর আরো একটা যোগ হলো। মোট সন্তান ছয়জন। ছয়টাই মেয়ে। ওমর গালির ধমক শুনে বিদায় হলো খবর আনা মেয়েটা। আর এদিকে ওমর গালি পানির সাথে, মাছের সাথে, শ্যাওলার সাথে, কলার ভেলার সাথে, বৈঠার সাথে কাজাকাজি করছে। বিশ্রী সব অশ্রাব্য কথাবার্তা বলছে। এমন সময় আবার সেই ছোট্ট মেয়েটা এসে দূর থেকে ডাক দিলো আব্বা বলে। ওমর গালি তখন বড়শি ছাড়তে কলার ভেলায় বসে নদীর মাঝ বরাবর। বন্ধু ইবাদ আলী। ওমর গালির পাশেই বাড়ি। ও বলে উঠল, ‘শালার ঘেন্না বেগম আবার আয়ছে রে।’ ‘আব্বা দাদী বলতেছে কেরোসিন তেল আনতে হবে। আর একটা সাবান।’
ওমর নদীর মাঝ থেকেই রাগান্বিত কণ্ঠে শুনিয়ে দিলোÑ কেরোসিন ফেরোসিনের দরকার নাই। যেটা হয়ছে সেটারে নিয়ে আয়গে। ছেনে-চেটকে বড়শিতে গেঁথে আদার বানাই দিয়ে দি। মেয়ে ঘেন্না বেগম কাঁচুমাচু মুখ বানিয়ে বাড়ি ফিরল। ছোট্ট মেয়ে এসবের কী বোঝে। ছেলে-মেয়ে ভেদাভেদ জ্ঞান ওর ভেতরে আসেনি। ওর বোন হয়েছে তাতেই ও খুশি। ইবাদের কাছে শুনলাম ওমর গালির নাকি পাঁচটা মেয়ের পর আবার মেয়ে হলো। কত যে ফকির কবিরাজ দেখাইছে এবার একটা ছেলের আশায়। যে যা বলে তা-ই করে। কেউ যদি এসে ওমরের বউকে বলে যে কাঁঠালের পাতা খাও তাহলে ছেলে হবে তো ওমর গালির বউ তা-ই করতে রাজি। না করেই বা উপায় কী। স্বামী ওমর গালি আগেই বলে দিয়েছে যে এবার যদি ছেলে না হয় তাহলে দুইটারেই বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেবে। বড় মেয়ে হলে ওমর গালি তিন দিন বাড়ির কিছু খায়নি। যার জন্য ওমর গালির বাপ বড় মেয়েকে অশান্তি বলে ডাকত। তারপর যখন দ্বিতীয় মেয়ের জন্ম হয়, ওমর গালি লবণ দিয়েছিল সেই আঁতুড়ে মেয়ের গালে। সে যে কী অবস্থা! সবাই তো বলাবলি করছিল যে ও বাচ্চা মনে হয় বাঁচবে না। কিন্তু বেঁচেই গেল। সেখান থেকে ওই মেয়ের নাম হলো। লবণমুখী। অনেকে ব্যঙ্গ করে নুনও বলে ডাকে। ভাইদের মধ্যে বড় ওমর মিয়ার কথাবার্তা অনেকটা কমেডির মতো। মন ভালো থাকলে হাসির সব কথা বলে। এভাবেই এক একটা মেয়েসন্তানের জন্ম হয়। আর ওমরের মুখে এক রকমের অদ্ভুত সব কথার মেলা বসে।
অবশেষে শেষ মেয়েটার নাম ওমর মিয়া নিজেই রেখেছিল ঘেন্না বেগম। এই নাম রাখার রহস্য জানতে চাইলে ওমর মিয়া বলে, ‘মেয়ে হয়েছে সংবাদ শুনতে শুনতে ঘেন্না ধরে গেছে। তাই তো নামই রেখেছি ঘেন্না বেগম। পরের মেয়েটার নাম রেখেছেন সমাপ্তি। যে মেয়েটাকে মাছের আদার বানাতে চেয়েছিল। সেখানেই সন্তানের হিসাবটা শেষ করে দিয়েছে বিধায় সমাপ্তি রেখেছে।
নানা রকম অবহেলা আর অনাদরের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে ওমর মিয়ার ছয় মেয়ে। মেয়েগুলোর সাথে কোনো দিন ওমর মিয়া একটু ভালো করেও কথা বলেনি। নিজেদের ইচ্ছায় লেখাপড়া করেছে। ওমর মিয়ার বউ বাবার বাড়ি থেকে জমিজমা বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে পড়াশোনা করিয়েছেন। এখন ওমর মিয়ার দুই মেয়ে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার সাথে। আর সেই ঘেন্না বেগম এবার অনার্স শেষ করে মাস্টার্স পড়ছে দেশের স্বনামধন্য কোনো এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সমাপ্তি আনছার বাহিনীতে চাকরি করে।
ওমর মিয়ার সংসারে এখন সোনায় সোহাগা। দেয়ালের সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ওমর মিয়ার বাড়ি। ওমর মিয়ার দুই জামাতা বেড়াতে আসেন মাইক্রোয় করে। অশান্তি, লবণমুখী, কালাপরাঙ্গী, জলপাই, ঘেন্না বেগম ও সমাপ্তির বাবা এখন মেয়েদের নিয়েই গর্ব করে।
রাজপুত্রের মতো সব জামাতার চেহারা। বাড়ির সামনে বড় একটা গেট করে সেখানে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিয়েছেÑ আদর্শ বাবা মঞ্জিল। মেয়েদের প্রতি অকথিত অবহেলা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অবজ্ঞার প্রতিদানে তাদের বাবার নামের আগে জুড়ে দিয়েছে আদর্শ বিশেষণটা। শুধু ওমর মিয়াকে নয়, গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু ছেলেসন্তানেরাই বাবা-মায়ের শেষ বয়সের সম্বল হতে পারে না। মেয়েরাও পারে। ওমর মিয়া এখন মেয়েদের টাকায় শুধু তাবলিগ করে বেড়ায়। এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে ঈমান ও একিনের কথা শুনে বেড়ায়।


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi