২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আগে ক্যারিয়ার নাকি বিয়ে

-

বর্তমানে আমাদের দেশের নারীরা প্রায় সব পেশাতেই অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। তার পরও কিছু সমস্যা থেকেই যায়। এখনো অনেক পরিবার মনে করে পড়ালেখা শেষ করে একটি মেয়ে আগে বিয়ে করুক। ক্যারিয়ার তার পর দেখা যাবে। এটি অনেক ক্ষেত্রেই একটা মেয়ের ক্যারিয়ারে ক্ষতি করে। এসব নিয়ে লেখাটা তৈরি করেছেন মাকসুদা রহমান

জিনিয়ার বয়স যখন চার বছর তখন ওর বাবা মারা যান। জিনিয়ার বাবার মৃত্যুর সময় ওর আরো দুই ভাইবোন ছিল। একজন ওর এক বছরের বড়, আর সবচেয়ে ছোট ভাইটির বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। ঘটনা গত শতাব্দীর ৬০ এর দশকের। তিনটি সন্তান নিয়ে ওর মা পড়েছিলেন ভিষণ বিপদে। বিয়ের সময় তিনি নবম শ্রেণীতে পড়তেন। বিয়ের পর আর পড়ালেখা আগায়নি। অবশ্য ওদের এ বিপদে শক্ত হাতে যিনি হাল ধরে ছিলেন তিনি ওর নানা। মেয়ে ও নাতি-নাতনীদের শুধু নিজের কাছে এনে রাখেনইনি, মেয়েকে আবার পড়ার সুযোগ করে দেন। জিনিয়ার মা এরপর বিএ বিএড পাস করে চাকরি নেন একটা স্কুলে এবং সন্তানদের দায়িত্ব নেন।
জিনিয়ার মা ছিলেন ওর নানার বড় মেয়ে। ওর নানা এরপর পণ করেন মেয়েদের শিক্ষিত স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেবেন না। যাতে তার কোনো মেয়ে এমন দুর্বিপাকে না পড়ে।
আগেই বলেছি, ঘটনা অনেক আগের। তখন সবার ধারণা ছিল মেয়েরা সংসার করবে। সন্তান মানুষ করবে। নেহায়েতই কেউ যদি জিনিয়ার মায়ের মতো দুর্বিপাকে পড়ে তাহলেই চাকরি করবে। তা না হলে মেয়েদের বাইরে বের হওয়ার দরকার নেই। বর্তমানে অবশ্য আমাদের চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়েছে। মেয়েদের এখন শিক্ষিত ও চাকরি করার উপযুক্ত করে বড় করা হয়। তার পরও সমস্যা কিন্তু থেকেই যায়। একটি মেয়ে পড়ালেখা শেষ করে আগে চাকরি নেবে, প্রতিষ্ঠিত হবে নাকি আগে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। এটি এখনো বেশ বড় সমস্যা।
কারণ যদি আগে ক্যারিয়ার ঠিক করে বিয়ে করতে যায় তাহলে মেয়ের যে বয়স হয় তাতে অনেকেরই ধারণা বয়স বেশি হয়ে গেছে। ফলে মেয়ে বিয়ে দিতে অভিভাবককে পড়তে হবে সমস্যায়। আবার আগে বিয়ে হলে দেখা যায় বিয়ে সংসার সামাল দিতে গিয়ে ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়ছে মেয়েটি। সীমা ঢাকা ভার্সিটি থেকে ভালো সাবজেক্টে ফার্স্ট কাস পেয়ে এমএ পাস করেছেন। সবাই খুব খুশি। অভিভাবকদের চাওয়া সীমার একটা ভালো বিয়ে হোক। কিন্তু বাদ সাধে সীমা। তার ইচ্ছা আরো পড়ালেখা করে নিজের ক্যারিয়ারটা ঠিক করে নেয়া। একটা ভালো স্কলারশিপ পেয়ে সীমা পড়তে বিদেশে চলে যায়। সীমা খুশি তার অবস্থায়। কিন্তু অভিভাবকের শঙ্কা কাটে না। মেয়েকে তারা ভালো পাত্রে বিয়ে দিতে পারবে তো?
বিয়ে হলেই যে ক্যারিয়ার হবে না এমনও কোনো কথা নেই। ইমার কথাই ধরা যাক। ইমা ও তার স্বামী দু’জনই একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ইমা কমনওয়েলথের একটা পিএইচডির স্কলারশিপ পেয়ে যান। এতে যে শুধু ইমা খুশি হন তা নয়, তার স্বামীও খুব খুশি। ইমার সাথে তার স্বামীও এখন দেশের বাইরে। সেও একটা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করছেন। খুব ভালো আছেন দু’জন। অবশ্য এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলে তার স্বামী সাথ দেন না।
তারপর সমস্যাটা কিন্তু থাকছেইÑ আগে বিয়ে নাকি আগে ক্যারিয়ার। এ ক্ষেত্রে নানাজনের নানা মতো হতেই পারে। তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজেকেই। একটা মেয়েকে নিজেরই এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বুঝতে হবে আমি কী চাই। আমার জন্য কোনটা ঠিক। যদি এ সিদ্ধান্ত ঠিকমতো নেয়া যায় তবে সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।
একটি মেয়ে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। বিয়ের পরও গুছিয়ে নিতে পারে নিজের ক্যারিয়ার আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ স্বাবলম্বী হয়ে তার পরও শুরু করতে পারে সংসার। এতে যে সমস্যা হবে এমন কোনো কথা নেই। তাই প্রত্যেকেই নিজের অবস্থা, পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা বুঝেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলেই হয়তো এ সমস্যার একটা সহজ সমাধান হবে।

 

 


আরো সংবাদ