২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভিক্ষা করেই চলে শেফালীর সংসার

-

সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাসিপান্তা কিছু মুখে দিয়েই পরিষ্কার তবে অনেক পুরনো ছেঁড়াছুটা পোশাকে বগলে একটা ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে পড়েন ৪০ বছর বয়সী শেফালী বেগম। আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকে কোন দিন কোন এলাকায় যেতে হবে। যাওয়ার আগে অবশ্য বৃৃদ্ধ মায়ের সাথে গুজুমুজু খানেটা কথাবার্তা বলেই বের হয়। মায়ের সাথে তার সব সময় এটা ওটা নিয়ে ঝগড়া লেগেই থাকে। আবার পুরো পৃথিবী এক দিকে, আর শেফালীর কাছে তার মা একদিকে। মাকে সে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসেন। শেফালী, তার মা আর পাঁচ বছর বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ে এই তিনজনের সংসার। মেয়েটি শেফালীর। এ তিনজনের সংসারের সম্পূর্ণ ভরণপোষণ চলে শেফালীর রোজগারে। রোজ ২৫০-৩০০ টাকার মতো ইনকাম করেন শেফালী। শেফালী ভিক্ষা করেন বাড়ি বাড়ি। দূরের গ্রামে চলে যান। শেফালীর জীবনের গল্পটা কষ্টের।
শেফালী ভালো বংশের, ভালো পরিবারের এবং সবচেয়ে বড় কথা শেফালী একজন সম্মানীয় বাবার মেয়ে। শেফালীর বাবার মাঠে জমি ছিল, গোয়ালে ছিল গরু আর পুকুরে ছিল মাছ। গৃহস্থালি পরিবার। বিভিন্ন রকমের ফসল আসত বাড়িতে। তিন ভাই আর চার বোনের মধ্যে শেফালী সবার ছোট।
শেফালীর বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় আটকে ছিল বেশ কিছু দিন। বাবাকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলে শহরে নিয়ে ভাইয়েরা বাবার সব জমিজমা লিখে নিয়েছে তাদের নামে। বোনদের দিয়েছে ফাঁকি। শুধু শেফালী নয়, শেফালীর মায়ের নামেও নেই ছিটেফোটা জমি। এরপর বাবার মৃত্যুর পর ভাইদের অবহেলার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে শেফালী আর তার মা। এরপর বোনেরা দেখেশুনে শেফালীকে বিয়ে দিলো এক কানা ভিক্ষুকের সাথে। শেফালী তার সাথে এখানে ওখানে গিয়ে কাটাল মাস দুয়েকের মতো। তার পর সে কানা শেফালীকে রেখে পালাল। এরপর শেফালী এসে আবার মায়ের কাছে থাকতে লাগল। মায়ের বলতে শুধু বাবা মরে যাওয়ার সময় রাখা ঝুপড়ি ঘরখানিই আছে। সেখানেই থাকে শেফালীরা। এরপর শেফালীর মেয়ে হলো। কষ্টের পাল্লা আর ভারী হলো। ভাইয়েরা খোঁজখবর নেয় না। না খেয়ে, না পরে কাটে শেফালীদের জীবন। শেফালীর চোখে পানি নেমে এলো যখন বলছিলেনÑ আমার মেয়ে জন্ম হওয়ার সময় আমার মায়ের কাছে আঁতুর ঘরে হারিকেন জ্বালানোর মতো কেরোসিনটুকুও ছিল না। আর আমি বেঁচে আছি, না মরে গেছি মনে হয় সেটা দেখারও মানুষ ছিল না। আমার মা একাই করেছে সব। কই কোনো ভাই বা কোনো ভাইয়ের বউ তো একটু উঁকি মেরেও দেখল না। না হয় আমি পাগল, তো পাগল হই আর ছাগল হই একটু দেখতে তো পারত।’
এই ছোট মেয়েকে রেখে নিরুপায় হয়ে শেফালী ভিক্ষা করতে শুরু করল আশপাশের গ্রামে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে দাঁড়াল। ভাই আর চাচাদের মানসম্মানে বাধে। তাদের এত থাকতে তাদের বোন ভিক্ষা করবে সেটা তারা মেনে নিতে পারে না। অথচ এক বৃদ্ধ মা আর নিজের মায়ের পেটের বোনের পাতে দুই বেলা দুই মুঠো ভাত দিতে রাজি নয় তারা। এ কথা বলতেই শেফালী বললেনÑ তাদের চলছে ভালোই। শালা, সম্বন্ধি, শ্বশুর-শাশুড়ি, জামাই-মেয়ে কত রকমের খাবার খায়; ঘ্রাণ পাই, কই কোনো দিন তো দেখলাম না যে, বাটিতে করে আমাকে বা আমার মেয়েকে একটু দিয়েছে।’ যার যার, তার তার ভাই। এ বলে হাঁটতে শুরু করলেন শেফালী। বললেন আমি এখন দূরের গ্রামে চলে যাই। বাপের নাম, ভাইয়ের নাম জিজ্ঞেস করলে বলতে চাই না। কেননা বললে যদি চিনে ফেলে, তাদের মানসম্মান চলে যাবে।
এখন কেমন চলছে জীবন। জানতে চাইলে শেফালী বেগম দাঁত বের করে হেসে দিয়ে বললেন, আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা ভালোই আছি। ভিক্ষা করি আর যাই করি আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। জমিজমা দেয়নি ফাঁকি দিয়ে লিখে নিয়েছে, তাতে কি হয়েছে। আল্লাহ তাদের থেকে ভালো রেখেছেন। তারা যে ভালো আছে সেটাও না। আমি মাকে বলেছিÑ কোনো জিনিসের জন্য ওদের দুয়ারে যাবেন না। পারলে ওরা আমার দুয়ারে আসুক। তাই ওরা এখন আমার ভিক্ষা করা চাল ধার নেয়, কেউ আবার লবণ ধার নেয়। আমি তখন মনে মনে হাসি আর বলি আল্লাহ চাইলে কি না করতে পারেন। যাই ভাই বাড়ি গিয়ে আবার মাছ রান্না করতে হবে। আজ যে চাল পেয়েছি সেগুলো বিক্রি করে মাছ কিনে এনেছি। মা বুড়ো হয়ে গেছে তার প্রাণেও তো একটু মাছ খেতে চায়। এই বলে একা একা কী যেন বকবক করতে করতে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme