২৬ এপ্রিল ২০১৯

বাবাই আমার প্রেরণা : আজমিরি আফরোজ, স্বত্বাধিকারী, আর্ক ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন

আজমিরি আফরোজের বাবা জাহাঙ্গির হোসেন তালুকদার ও তার পরিবার -

বাবা, দুই অক্ষরের এই শব্দটির সাথে যে বোধ জড়িয়ে আছে, সেই বোধের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা ভাষার চাতুর্যে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। পৃথিবীর আলো-বাতাস গায়ে মেখে আমরা বড় হই। আর এই বড় হওয়ার পথে শক্তি ও সাহস দিয়ে, জীবন ও জীবিকার রসদ দিয়ে আমাদের যিনি লালন-পালন করেন তিনি আমাদের বাবা। বাবা শব্দটি শুনলেই মনের মাঝে ভেসে ওঠে মাথার ওপর আকাশের মতো বিস্তৃত ছায়া। পরম নির্ভরতায়, নিশ্চিন্তে যার হাত ধরে চলতে শেখা। প্রতিটি মেয়ের জীবনেই বাবা যেন এক আদর্শ পুরুষ। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনÑ এভাবে মেয়ে যত বড়ই হোক না কেন, সেই ছেলেবেলার মতো বায়না-অভিমান বাবার সঙ্গে থেকেই যায়। বাবাকে ঘিরে স্মৃতির শেষ নেই। জীবনের প্রতিটি ধাপে হোঁচট খেলে বাবাই সাহস জোগান। আর অনুপ্রেরণা সাহস, স্নেহ-ভালোবাসা জোগাতে বাবার তুলনা বাবাই।
আমার বাবাও ঠিক তেমনি একজন মানুষ, যার ছায়াতলে আমরা চার বোন বেড়ে উঠেছি তিল তিল স্নেহ-মমতা আর আদর-ভালোবাসায়। বাবা, আমার একটু হ্রাসভারী, গম্ভীর, চুপচাপ আর কাজপাগল, পরোপকারী, আদর্শ সৎ মানুষ। নিজের চেয়ে দেশ ও জাতির উন্নতিতে যার জুড়ি নেই। তাই তো, কিশোর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আমার স্নেহশীল বাবার নাম মো: জাহাঙ্গীর হোসেন তালুকদার। ১৯৭১ সালে বাবা মাত্র ১৫-১৬ বছরের কিশোর ছিলেন। তিনি যখন দেখলেন আমার দাদা মৃত নরুল হক তালুকদার, বড় চাচা আবু সাইদ, মেজো চাচা- মো: ইস্কান্দার আর সেজো চাচা মো: আবু তাহের তালুকদার (বাবলু) যুদ্ধে অংশ নিতে চলে গিয়েছে তখন তিনি দাদুমণিকে না বলে যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন। অনেক দিন পর্যন্ত বাবার কোনো খোঁজ কেউ জানত না, তিন মাস পর জানতে পারে বাবা টাঙ্গাইলের ১২ নম্বর সেক্টরে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নিজস্ব বাহিনীতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করছেন। তারপর বাবা দীর্ঘ ৯ মাস দাদা-চাচাদের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকসেনাদের হটিয়ে ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করেন। আমার দাদুমণি হামিদা বেগম ও দুই ফুফু রিক্তা বেগম ও শেলিনা আক্তার লতা সহযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়ানো, খবর আদান-প্রদান; অর্থাৎ পাকসেনাদের অবস্থান প্রত্যক্ষ করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দেয়া, গুলিবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাশুশ্রƒষা করাই ছিল আমার ফুফুদের কাজ।
টাঙ্গাইল জেলার বারো পাখিয়া আমাদের গ্রামের বাড়ি; কিন্তু টাঙ্গাইল মূল শহরের ‘ব্যাপারী পাড়া’র হামিদা মঞ্জিল হচ্ছে আমার দাদাবাড়ি। তিনতলা বাড়ির দুই ইউনিটে আমার বাবা-চাচা, দাদা-দাদীরা একসঙ্গে বাস করতেন। দাদার সাত ছেলে, দুই মেয়ে তাই এলাকার মানুষ আমাদের এ একান্নবর্তী পরিবারকে ‘ঝবাবহ নৎড়ঃযবৎ’ং বলে চিনত। আমি ছোটবেলা থেকে একান্নবর্তী পরিবারে হাসি-আনন্দে বড় হয়েছি। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে গ্রামের বাড়িতে চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ঈদ করতে চলে যেতাম। আমার বাবারা ৯ ভাই-বোন, দাদা-দাদীসহ অনেক লোজন তাই ট্রাক ভাড়া করে ছোটরা সব গাড়ির ওপর উঠে গান-নাচ করতে করতে গ্রামের বাড়ি কোরবানির ঈদ করতে যেতাম। কী যে মজার ছিল সেসব দিনগুলো, তা বলে বোঝানো যাবে না। ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে দুপুরবেলা আমি ছাদে বসে খেলছিÑ মা রান্না করছিল, কেমন করে যেন মায়ের কাপড়ে আগুন লেগে গেল, তৎক্ষণাৎ তা সারা গায়ে ছড়িয়ে মায়ের শরীর পুড়ে মুমূর্ষু অবস্থা। তারপর মাকে তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসা করা হলো, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। ১৯৯৮ সালে তিন-চার মাস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে মা সবাইকে ফেলে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। এ তিন-চার মাস বাবা মাকে ফেলে কোথাও যাননি, হাসপাতালেই থাকতেন। আমি তখন বুঝেছি মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা আর মমতা। আমার বাবা খুবই ইন্ট্রোভাট টাইপের মানুষ, তিনি তার আবেগ-অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারেন না। নিজের ভেতর কষ্টগুলো চেপে রাখেন। বিপতœীক এ মানুষটি আজ ২১ বছর একা থাকেন। আমি বুঝতে পারি, অনেক মানুষের ভিড়ে বাবা বড্ড একা। যদিও বাবা সারা দিন নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও অন্যের উপকার করতে ব্যস্ত সময় কাটান।
আমার বাবা মাছ খেতে ভীষণ ভালোবাসেন। আমি ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল গেলেই তিনি বড় বড় মাছ আনেন। আমার ছেলে ‘আযান’ বড় আপুর ছেলেদের নিয়ে খেতে বসে আর আমরা চার বোনই বাবাকে খাওয়াই। বাবার খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত আমরা চার বোন এক চুলও নড়ি না। খুব ভালো লাগে বাবাকে ঘিরে বসে খাওয়াতে ও গল্প করতে। মা, মারা গেলে আমি ও আমার মেজো বোন ‘ভারতেশ্বরী হোমসে’ পড়ালেখা করছি। সুতরাং বছরে দুইবার ছুটিতে বাড়ি আসতে পারতাম আর মাসে একবার অভিভাবকেরা দেখা করার সুযোগ পেতেন। তাই আমার নানুমণি বিভিন্ন খাবার রান্না করে নানার হাত দিয়ে হোমসে পাঠাতেন আর বাবা ব্যাগ ভরে অনেক রকম বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট, মোয়া, বাতাসা, কদমা ও কেক নিয়ে হাজির হতেন। সাথে আমার বড় আপা হলিও থাকত।
ছোটবেলায় আমি দুরন্ত ছিলামÑ পাড়ার স্কুলে পড়তাম। তখনো আমি ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি হইনি। একদিন স্কুল পালিয়ে বাড়ি ফিরেই আবার খেলতে চলে যাই, মা আমাকে অনেক খুঁজেছেন কিন্তু পাননি। সন্ধ্যায় কাদাজল মেখে বাড়ি ফিরলে বাবার বকা শোনার ভয়ে ঘরের কোনায় লুকিয়ে ছিলাম। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন আমি ভয় পেয়েছি, তাই তিনি আমাকে কিছুই বলেননি। পরে মা আমাকে খুব শাসন করে বুঝালেনÑ এমন করে বাইরে গিয়ে খেলতে হয় না। মা মারা যাওয়ার পর আমি আর কোনো দিন বাইরে খেলতে যাইনি। আমি অন্য সবার তুলনায় পড়ালেখায় ভালো ছিলাম, তাই বাবা আমাকে একটু বেশি আদর করতেন। আমরা পরপর চার বোন। আমাদের কোনো ভাই নেই, অথচ বাবার এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ ও অভিযোগ ছিল না। তবে সবাই যাতে আমরা শিক্ষিত হই, পড়ালেখা করি, এটা বাবার স্বপ্ন ছিল। হ্যাঁ, আমরা বাবার সব স্বপ্ন পূরণ করেছি। অনার্স পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়ে গেলেও আমি ‘ইডেন মহিলা কলেজ থেকে মাস্টার্স’ করি। তারপর অর্নামেন্ট ও বুটিকের ব্যবসা শুরু করি। বাবা আমার ব্যবসা দেখে খুব খুশি।
বাবা চান আমরা স্বাবলম্বী হই। বাবাই আমার প্রেরণা। বাবা, ও বাবা! তুমি কেমন আছো? এ বিশাল পৃথিবীতে তোমার এই একাকী জীবন আমাকে বড্ড বেশি পীড়া দেয়। ছোটবেলায় মা পৃথিবী ত্যাগ করলেও তোমার ছায়াতলে আমাদের বড় হওয়াÑ তোমার নীরব শাসনের অব্যক্ত ভালোবাসার গভীরতা আমরা চার বোন অনুভব করি।
কিন্তু একবারও তোমার সামনে এসে বলতে পারি না, বাবা আমরা চার বোন তোমাকে খুব ভালোবাসি, মা-হারা এই আমরা তোমার এক একটি কলিজার টুকরা। তুমিও আমাদের অনেক ভালোবাস, মুখে না বললেও তোমার নিঃশব্দের অনুভূতি আমাদের বুঝিয়ে দেয় আমরা তোমার প্রাণজুড়ে বসবাস করি। আমরা এখনো তোমার স্নেহের আবেশে বেঁচে আছি। সত্যি বাবাÑ ‘আমরা চার বোন তোমাকে খুব ভালোবাসি’। তাই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনাÑ ‘হাজার বছর বেঁচে থাকো বাবা তুমি।’

অনুলিখন : আঞ্জুমান আরা


আরো সংবাদ

বিজিএমইএর ব্যাখ্যাই টিআইবি প্রতিবেদনের যথার্থতা প্রমাণ করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার প্রস্তাব সংসদে নাকচ ঢাকায় সবজি আনতে কিছু পয়েন্টে চাঁদাবাজি হয় : সংসদে কৃষিমন্ত্রী বসার জায়গা না পেয়ে ফিরে গেলেন আ’লীগের দুই নেতা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিফেন্স কোর্সে অংশগ্রহণকারীরা আজ জুমার খুতবায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বয়ান করতে খতিবদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান কাল এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনে বাধা নেই জিপিএ ৫ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী সুপ্রভাত বাসের চালক মালিকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পান্না গ্রুপ এশীয় দেশের ঘুড়ি প্রদর্শনী শুরু পল্লবীতে বাসচাপায় পথচারীর মৃত্যুর ৬ মাস পর চালক গ্রেফতার

সকল




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat