২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মানিকগঞ্জের চার জয়িতা

-

জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে প্রচণ্ড প্রতিকূলতা ও অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এসব জয়িতা। অতীতে তারা অনেক দুঃখকষ্ট ও অভাব-অনটন সহ্য করেও হতোদ্যম না হয়ে সাফল্যের গৌরবগাথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রাম করে তারা জীবনে সাফল্য এনেছেন। সরকারের মহিলা অধিদফতরের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ২০১৭-১৮ সালের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যাচাই-বাছাই করে চারজন শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। লিখেছেন লতা খানম ইতি
শামসুন নাহার
শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা নারী হিসেবে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। ঘিওর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক কবি ও সাহিত্যিক শামসুন নাহার (৭০)। ‘সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালীন আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পরে ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাস করি। পরে ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরিতে যোগদান করি। পরে এমএ ও বিএড পর্যন্ত পড়ালেখা করি। এরপর এ স্কুলেই প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি নিয়ে চাকরি জীবন শেষ করি। আমার স্বামী সরকারি চাকরি করতেন।’ ১৯৯৫ সালে তার স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেক দুঃখকষ্টের মধ্যেও তিনি সংসারের হাল ধরেন। সংসারের বহু অভাব-অনটনের মধ্যেও তার পাঁচ ছেলে ও চার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেন। বর্তমানে ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। কবি ও সাহিত্যিক শামসুন নাহার প্রায় ২৫টি সংগঠনের সাথে জড়িত। এককভাবে ১৩টি ও যৌথভাবে ৭৪টি বইয়ে তার বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে সমাজসেবা ও নন্দিনী সাহিত্য পদক, অতীশ দীপংকর (স্বর্ণপদক), ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া স্মৃতি (স্বর্ণপদক), স্বামী বিবেকানন্দ সাহিত্য পদকসহ প্রায় ৩০টি পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ সমবায়ী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে রৌপ্য পদক ও প্রাইজবন্ড প্রাপ্ত হন। তার প্রথম উপন্যাস ‘স্বামী’ প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। শিশুদের মনোবিকাশের জন্য ‘ছড়া দাদুর ছড়ার ঝুড়ি’সহ অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে রোধ, জনসংখ্যা সমস্যা, শিশু পরিচর্যা, নারী শোষণ প্রতিরোধ ও নারীদের বিভিন্ন আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে শামসুন নাহার এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার স্বপ্ন দেখেন।
ছায়া রানী সাহা
সফল জননী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ঘিওর সাহাপাড়া গ্রামে প্রয়াত কার্তিক লাল সাহার স্ত্রী ছায়া রানী সাহা। মাত্র ৪ শতাংশ জমির ওপর তাদের ছিল বসবাস। বিয়ের আট বছরের মাথায় চারটি সন্তান হয় তার। স্বামী ঘিওর বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। সন্তানেরা ছোট থাকার সময় তার স্বামী হঠাৎ অন্ধ হয়ে যান। চোখের চিকিৎসা করাতে বহু টাকা খরচ হওয়ার পর সংসার অচল হয়ে পড়ে। স্বামীর চোখ একপর্যায়ে ভালো হওয়ার পরও সন্তানদের লেখাপড়া চালাতে হিমশিম ক্ষেতে হতো। তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারিনি। ইট মাথায় দিয়ে আমার স্বামী রাতে ঘুমিয়েছে।’ কঠোর পরিশ্রম করে ও হাঁস-মুরগি পালন করে স্বামীকে সাহায্য করেন তিনি। অভাব-অনটন, দুঃখকষ্টের মধ্যেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে বড় ছেলে ইডেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক। মেজো ছেলে একটি ইংরেজি পত্রিকার ম্যানেজার। এক মেয়ে এমবিবিএস পাস করে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত এবং ছোট ছেলে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। বর্তমানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে আছেন ছায়া রানী।
মোসা: হাজেরা বেগম
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন মোসা: হাজেরা বেগম (৫০)। উপজেলার তরা মির্জাপুর প্রামের ফুলবর মিয়ার স্ত্রী তিনি। ২ শতাংশ জমিতে ছোট একটি বাড়ি। দুই ছেলে এক মেয়ে তার। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত তাদের। সংসারের কাজের মাঝেও ধাত্রীর কাজ করেন তিনি। এলাকার রোগীদের হাসপাতালে নেয়া, বাল্যবিয়ে বন্ধসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত ৩০০ প্রসূতি মায়ের সেবা এবং ২০০ জন অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে পর্যায়ক্রমে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। ১৫০টি বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করেন। এ ছাড়া সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে জড়িত আছেন। বর্তমানে স্বামী দর্জির কাজ করেন। দু’জন মিলে সংসার পরিচালনা করেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাজেরা বেগম সুখেই আছেন।
নাসিমা বেগম
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নাসিমা বেগম (৫৫)। উপজেলার পয়লা গ্রামের আমিরুল ইসলামের (আয়নাল) স্ত্রী তিনি। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে অভাব-অনটনে কেটেছে প্রতিটি দিন। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালে তার বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন দিনমজুর। দারিদ্র্যের কশাঘাত তার অভিপ্রায়কে ম্লান করতে পারেনি। প্রায় প্রতিটি দিন অর্ধাহার-অনাহারে কাটলেও তিনি হাল ছাড়েননি। শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান নাসিমা বেগম। আর্থিক সঙ্কটে পড়া স্বামীর সংসারের হাল ধরেন। ২ শতাংশ জমিতে তাদের বসবাস। সংসারে অভাব থাকায় শাপলানীড় এনজিও থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জির কাজ শুরু করেন। নিজের ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম করে দর্জির কাজ করার পাশাপাশি প্রশিকা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে অভাবের সময় বিভিন্ন এনজিও থেকে কিস্তির টাকা তুলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জোগান দিয়েছেন। কিস্তির টাকা দিতে না পারায় অনেক সময় এনজিও প্রতিনিধিরা বাড়ি এসে কটুকথা বলে গেছেন। তিনি বলেন, ‘কিস্তির টাকা দিতে না পাড়ায় দিনের পর দিন পালিয়ে থেকেছি। তাদের কটুকথা সহ্য করে আমি আমার সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে গেছি। বড় ছেলে দেশীয় ইঞ্জিনের মেকার। মেজো ছেলে এমএ পাস করার পর বর্তমানে সে একটি কোম্পানিতে কর্মরত। ছেলের উপার্জনের টাকা দিয়ে চলছে আমাদের সংসার। ছোট মেয়ে অনার্স (অ্যাকাউন্টিং) চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। বর্তমানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে আছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার জানান, ‘আমি প্রত্যেক জয়িতা সম্বন্ধে জেনেছি। তাদের প্রত্যেকেরই জীবন সংগ্রাম খুবই কঠিন। সরকার জয়িতাদের বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছে। আমরা সবাই তাদের দিকে লক্ষ রাখব।’


আরো সংবাদ