১১ ডিসেম্বর ২০১৮

৩২ কোটি মানুষের হাতে ২৯ কোটি অস্ত্র

যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পাঁচটি অস্ত্র তৈরি কোম্পানি গত বছর ১৯ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র বিক্রি করেছে। - ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গুলি করে ১৭ জনকে হত্যার ঘটনায় যারা বেঁচে গেছেন তাদের একজন দক্ষিণ ফোরিডার মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাইস্কুলের ছাত্র ও ১৭ বছরের তরুণ ডেভিড হগ। তিনি মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে অস্ত্র আইনের সংস্কারের দাবি তুলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ করে বলেন, আপনি হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট, জাতিকে একতাবদ্ধ করার দায়িত্ব আপনার, বিভক্ত নয়। বিতর্ক উঠেছে ওই বন্দুক হামলাকারী নিকোলাস ক্রুজ যাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকার পরও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই নেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা যাদের অনেকেই এখন দেশটিতে অস্ত্র সহজলভ্যতার বিরুদ্ধে কঠিন আইন প্রণয়ন করতে চান। দেশটির গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ বলছে, গত বছর বন্দুক হামলায় ৩৪৬, তার আগের বছর ৪৩২ ও ২০১৫ সালে ৩৬৯ জন নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ কোটি মানুষের হাতে ২৯ কোটি অস্ত্র রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পাঁচটি অস্ত্র তৈরি কোম্পানি গত বছর ১৯ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র বিক্রি করেছে, যার ৭০ শতাংশ ক্রেতা দেশটির সরকার নিজেই। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বাধ্য হচ্ছেন কারো কাছে অস্ত্র বিক্রির আগে তার অতীত সম্পর্কে যাচাইয়ের বিষয়টি অস্ত্র আইনে সংযুক্ত করতে।

সিএনএনের অনুসন্ধান বলছে, বন্দুকধারী নিকোলাস ক্রুজের কাছে ১০টি অস্ত্রের সবই ছিল রাইফেল। মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ক্রুজ অস্ত্র কিনতে থাকেন। তার ব্যাকপ্যাকে বর্ণবাদী ঘৃণা চিহ্ন আঁকা ছিল, বিষণ্নতায় তার মন ভরে থাকত, মনোযোগে ঘাটতি ছিল। তারপরও চিকিৎসকেরা তাকে নিয়ে কম ঝুঁকি রয়েছে বলেছিলেন। কোনো অভিভাবকই স্কুলে ছেলেমেয়ে পাঠিয়ে আর নির্ভার থাকতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রুশ যোগসাজশ নিয়ে এফবিআই গোয়েন্দারা অযথা সময় নষ্ট করছে এবং নিকোলাস ক্রুজের ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেনি এমন অভিযোগও উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ হত্যার হুমকি দিয়ে অস্ত্র কেনার কথা জানিয়েছিল গত ৫ জানুয়ারি নিকোলাস। গত সেপ্টেম্বরে এক ভিডিও ব্লগার এফবিআইকে সম্ভাব্য স্কুল হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে ক্রুজের কথা জানায় এফবিআইকে। কিন্তু এফবিআই তখন তাকে চিহ্নিত করতে পারেনি। মা লিন্ড ক্রুজ তার বন্ধুদের কাছে ছেলের চরম হতাশ হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন। হাত কেটে নাজি প্রতীক এঁকেছিলেন ক্রুজ। মুসলিম ও ইহুদিদের চরমভাবে ঘৃণা করতেন নিকোলাস। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থক এবং হোয়াইট সেপারেটিস্ট প্যারামিলিটারি প্রোটো-ফেসিস্ট অর্গানাইজেশনের সদস্য ছিলেন। অথচ দেখতে নিকোলাস ছিলেন খুবই স্বাভাবিক নরম মনের মানুষ। অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। মাথায় পরতেন ট্রাম্পের পছন্দের টুপি।

নিকোলাস তার আসল মা একজন ইহুদি ছিলেন বলে স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে বলেন, তার সঙ্গে দেখা হয়নি বলে আমি খুশি। কারণ ইহুদিদের আমি ঘৃণা করি এ জন্য যে বিশ্বকে ধ্বংস করতে চায় তারা। রাইফেল ছাড়া নিকোলাস ‘বডি আর্মার’ কেনার পর তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন করেন স্কুলছাত্র হয়ে কেন সে অবৈধভাবে এসব কিনছে। জবাবে নিকোলাস জানান, ‘একজন স্কুল শুটার হিসেবে আমি হত্যাকাণ্ড ঘটাতে যাচ্ছি।’

তবে বড় দাগে প্রধান প্রধান মিডিয়া নিকোলাস ক্রুজ সম্পর্কে অন্তত পাঁচটি তথ্য এড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বিভ্রান্তিকর বিভেদের কারণে মিডিয়াগুলো এসব বিষয়ে আলোকপাত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে- অস্ত্র আইন সংস্কার এবং এমন দাবিতে পদযাত্রা, সমাবেশ কিংবা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির বক্তৃতা-বিবৃতিমূলক খবরাখবরকে।

প্রথমত, নিকোলাস তার মানসিক হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্য ওষুধ ব্যবহার করত। তাহলে মার্কিন ওষুধ শিল্পের করপোরেট স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য কোন ধরনের ওষুধ নিকোলাস ব্যবহার করত তা মিডিয়া সামনে আনছে না। কিংবা নিকোলাসের মানসিক দুশ্চিন্তার কারণগুলো কী ছিল। যে ধরনের ওষুধ ব্যবহার করত নিকোলাস তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই কি সে অদম্য, হিংস্র ও আত্মঘাতী হয়ে উঠেছিল হত্যাকাণ্ড ঘটাতে? দিনের পর দিন এ ধরনের ওষুধ কি মানুষের হতাশা কাটিয়ে ওঠার পরিবর্তে তাকে তার আচরণ আরো হিংস্র করতে, ভ্রান্তিতে গা ভাসিয়ে দিতে, আত্মঘাতী হয়ে নিজেদের বিরুদ্ধেই মারমুখী হয়ে উঠতে সাহায্য করছে?

দ্বিতীয়ত, নিকোলাস বারবার এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করার পরও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই কেন তার ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু করেনি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর এক ইউটিউব ভিডিও বার্তায় নিকোলাস ঘোষণা দেন, ‘আই অ্যাম গোয়িং টু বি এ প্রফেশনাল স্কুল শুটার।’ এ ধরনের বার্তার একটি স্ক্রিনশট বা ছবি এফবিআইয়ের হাতে জমা দেয়া পর্যন্ত হয়েছিল। তারো ছয় মাস আগে নিকোলাস ঘোষণা করেন ইউটিউবেই, আমি অনেক বেশি মানুষকে হত্যা করতে যাচ্ছি। এভাবে একের পর এক মানুষ হত্যার ঘোষণা মার্কিন আইনের পরিপন্থী হলেও কেন এফবিআই নিকোলাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।

তৃতীয়ত, ফোরিডা স্কুলে বন্দুকধারীর সংখ্যা একাধিক ছিল। সে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্টারদের ছাত্রছাত্রীরা তা বলেছে। তারা বলেছে, বিভিন্ন দিক থেকে গুলির শব্দ তারা শুনেছে।

চতুর্থত, স্কুলটির অনেক ছাত্রছাত্রী শুনেছিল সে দিন বন্দুকধারীর হামলা ও কিভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বের হয়ে আসতে হয় তার এক মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। অনেকে শুনত পুলিশ গোপনে এ ধরনের মহড়ার ব্যবস্থা করেছে। ‘কোড রেড’ নামে এ ধরনের মহড়ার কথা তারা শুনলেও সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিল না তারা। ফলে যখন গুলি শুরু হয় তখন অনেক ছাত্রছাত্রী মনে করে এটি আসলে সেই মহড়া শুরু হয়েছে। কিন্তু তারা যখন দেখতে পায় তাদের একজন শিক্ষক গুলি খেয়ে পড়ে আছে তখন নিশ্চিত হয় যে, এটি আসলে মহড়া নয়, হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে।

পঞ্চমত, নিকোলাস ন্যাশনালিস্ট গ্রুপের সাথে জড়িত ছিল এটাই এখন প্রায় অস্বীকার করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রথমে জানায়, নর্থ ফোরিডা ভিত্তিক ওই গ্রুপের নেতা জর্ডান জেরেব প্রথমে স্বীকার করেন নিকোলাস তাদের গ্রুপে যোগ দিয়েছিলেন। কেন জর্ডান জেরেব তার গ্রুপের একজন বন্দুকধারীর ব্যাপারে এমন নিশ্চুপ হয়ে গেলেন তা এক রহস্যের সৃষ্টি করেছে।

তাহলে বলতেই হয়, মিডিয়ার প্রভাব পরিষ্কার এবং তা হচ্ছে কোনো ঘটনার ব্যাপারে মানুষকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করা।


আরো সংবাদ