১৭ নভেম্বর ২০১৮

ট্রাম্পের সমুচিত জবাব মার্কিন পত্রিকার

ট্রাম্পের সমুচিত জবাব মার্কিন পত্রিকার - ছবি : নয়া দিগন্ত

যুক্তরাষ্ট্রের ছোটবড় সকল পত্রিকা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক আক্রমণের পাল্টা জবাব হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত প্রচারণামূলক সম্পাদকীয় প্রকাশ শুরু করেছে।

এই প্রচারণার পুরোভাগে আছে দ্য বোস্টন গ্লোব। ‘এনেমি অব নান’- এই হ্যাশট্যাগ নিয়ে তারা তাদের যে প্রচারণা শুরু করেছে তাতে যোগ দিয়েছে দুই শ’রও বেশি পত্রিকা। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
গ্লোব সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘আজ যুক্তরাষ্ট্রের সকলে যাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেয়েছি যিনি এমন এক মন্ত্র সৃষ্টি করেছেন যাতে বলা হচ্ছে যেসব গণমাধ্যম কর্মী বর্তমান প্রশাসনের নীতিকে সমর্থন করেন না তারা জনগণের শত্রু।’

‘সাংবাদিকরা শত্রু নয়’ শিরোনামে এতে আরো বলা হয়, ‘এটা আমাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট যে বহু মিথ্যা অভিযোগ করেছেন তার একটি। তিনি প্রাচীনকালের জাদুকরদের মতো মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছেন, যারা হাতের কারসাজির মাধ্যমে উৎসুক মানুষের ভিড়ে ধূলা বা পানি ছুঁড়ে মারতেন।’
গ্লোব আরো জানায়, ট্রাম্পের এসব আচরণে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের রিসেপ রজব এরদোগানও সাংবাদিকদের সাথে শত্রুর মতো ব্যবহার করতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
মূলধারার পত্রিকাগুলো ট্রাম্পকে নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ প্রকাশ করে বলে তার অনড় ও অব্যাহত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের ওপর পাল্টা আঘাতটি এলো।

ট্রাম্পের সমালোচনা করে প্রায়ই আক্রমণের শিকার হওয়া নিউইয়র্ক টাইমস বড় বড় অক্ষরে হেডলাইন করেছে ‘এ ফ্রি প্রেস নিডস ইউ’। এটি মাত্র সাতটি অনুচ্ছেদের এবং এতে বলা হয়েছে, সংবাদপত্রের ভুলের সমালোচনার অধিকার কেবলমাত্র জনগণের রয়েছে।

তবে এ পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইউএসএ টুডের সাবেক এডিটর ইন চিফ কেন পলসন। তিনি বলেন, যারা সম্পাদকীয় পড়েন তাদের মাঝে এ প্রচারণার প্রয়োজন নেই। বরং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়ে দরকার আরো বড় ধরনের প্রচারণা।

আরো পড়ুন :

ট্রাম্প এ যুগের সিজার না হিটলার?
গোলাম মাওলা রনি

নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে এটি আমার তৃতীয় দফার লেখা। প্রথমবার তাকে নিয়ে লিখেছিলাম, যখন তিনি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের জন্য লড়াই করেছিলেন। সমগ্র দুনিয়ার বাঘা বাঘা গণমাধ্যম তো বটেই, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত রাজনীতিসচেতন ফুলজান বেওয়াও বহু হিসাব কষে বলে দিয়েছিলেন- ট্রাম্প ফেল করবেন। কিন্তু আমার সেটা মনে হয়নি প্রধানত তিনটি কারণে। এক. তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে শত শত বছরের প্রথা ভেঙে মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী-অভিবাসী ও ধনী-দরিদ্রের বিভেদ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। দুই. তার ছিল অকপটে সত্য বলার দুরন্ত সাহস। তৃতীয়ত. তিনি নিজেকে বোহেমিয়ান প্রকৃতির রমণীমোহন বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। যৌনবিজ্ঞানের সূত্র মতে, এই শ্রেণীর পুরুষদের প্রকাশ্যে নারীরা সমালোচনা করলেও গোপনে তাদের অনেকেই পছন্দ করে থাকে। আরো অনেক কারণের সঙ্গে উল্লিখিত তিনটি কারণের চমৎকার রসায়ন ঘটিয়ে ট্রাম্প জিতে গিয়েছিলেন পুরো দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে।

নির্বাচনের পর প্রায় সবাই একবাক্যে বলতে থাকেন, ট্রাম্পের কারণে মার্কিন মুলুক ও বিশ্বময় সংঘর্ষ-সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়বে; এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রব্যবস্থাও হুমকির মধ্যে পড়বে। তিনি হয় সেনাবিদ্রোহ, নয়তো মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক ইমপিচমেন্টের শিকার হবেন। পশ্চিমা দুনিয়ার নাক উঁচু এলিট সমাজ, দাম্ভিক বুদ্ধিজীবী, প্রভাবশালী সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমগুলো একযোগে ট্রাম্পবিরোধী প্রচার ও প্রপাগান্ডা এমনভাবে শুরু করে, যাতে বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনে এমন আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে যে, এই বুঝি ট্রাম্পের পতন হয়ে গেল। ট্রাম্প কবে জুয়া খেলে শত শত কোটি মার্কিন ডলার অপচয় করেছিলেন, কিভাবে শেয়ার মার্কেট ম্যানিপুলেট করে অথবা নিজের একটি জুয়া খেলার ক্যাসিনোকে দেউলিয়া ঘোষণা করে শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছিলেন, তা দশ মুখে প্রচার শুরু করে দেয় পশ্চিমা মিডিয়া সোস্যালরা।


এর পাশাপাশি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন, যৌনজীবন ও পারিবারিক জীবন নিয়েও যাচ্ছেতাই প্রপাগান্ডা চলতে থাকে। আমাদের মতো দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশে যেসব গিবত বা বদনামি কেউ করে না, যেসব কর্ম অনায়াসে করতে আরম্ভ করে দেয় মার্কিন এলিট সমাজ। ট্রাম্প কবে কোন পতিতালয়ে গিয়ে কিভাবে কী সব করেছেন, তার রসঘন কাহিনী সিরিজ আকারে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রচারিত হতে থাকে। একাধিক পর্নো তারকার সঙ্গে ট্রাম্পের দৈহিক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেনের মুখরোচক কাহিনী প্রকাশ করেই তারা ক্ষান্ত হননি, জনৈকা পর্নো তারকাকে নাকি ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘মহিলাটি অনেকটা তার কন্যা ইভাঙ্কার মতো, যাকে তিনি অনেক ভালোবাসেন।’ নষ্টা মহিলার এ কথার ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্পবিরোধীরা প্রচার করতে থাকে, ইভাঙ্কা ট্রাম্পের মেয়ে নন...।

ব্যক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্পকে বিপদে ফেলার জন্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে, তিনি মূলত রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত করে সে দেশের গোয়েন্দা ও কূটনীতিকদের সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে দাঁড়ায় যখন মার্কিন মুলুকের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-প্রধান স্বয়ং বিষয়টি সমর্থন করেন এবং মার্কিন বিচার বিভাগ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাশিয়া কানেকশনের বিষয়ে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে সবাই যখন ট্রাম্পের পতনের দিনক্ষণ গণনা করছিলেন, তখন নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য লিখেছিলাম, ট্রাম্প হতে পারেন আমেরিকার সর্বকালের সফলতম প্রেসিডেন্টদের একজন। আমার সেই লেখার কথা শুনে একটি ঘরোয়া বৈঠকে স্বয়ং মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনি কী করে এতটা নিশ্চিত হলেন? 
আমি হেসে জবাব দিলাম, যে পুরুষ একই সঙ্গে তিনজন স্ত্রী ও কয়েক ডজন প্রেমিকা এবং আত্মীয়স্বজনকে রাজি ও খুশি রাখতে পারেন, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন; নিশ্চয়ই তার মধ্যে ‘অতি মানবীয়’ কিছু গুণ রয়েছে। আমার কথা শুনে রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটসহ সেখানে উপস্থিত আরো কয়েকটি দেশের মহিলা কূটনীতিকেরা হো হো করে হেসে উঠলেন এবং তাদের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদও অনেক হাসলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর গত প্রায় দুই বছরে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের এমন একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট পারেননি। মার্কিন বিচার বিভাগ, সিনেট, কংগ্রেসসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে তিনি নিজের কর্তৃত্ব, প্রভাব ও বলয় সৃষ্টি করে ফেলেছেন। এ মুহূর্তে তার যে ক্ষমতা রয়েছে মার্কিন মুলুকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে। অথচ সেই অনাদিকাল থেকে মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্টকে বাইরের দুনিয়ার লোকজন যতটা শক্তিশালী ভাবত, তিনি তার নিজ দেশে ছিলেন ঠিক তার উল্টো। বলা হতো, রাষ্ট্রক্ষমতার শতকরা মাত্র এক থেকে দুই ভাগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভোগ করতে পারতেন। স্থানীয় সরকার তথা গভর্নর ও মেয়রের পর বিচার বিভাগ ও পুলিশ সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ভোগ করত। সে দেশের সিভিল সোসাইটি, মিডিয়া, প্রাইভেট সেক্টর ও করপোরেট হাউজগুলো সব কিছুর ওপর ছড়ি ঘোরাত। তাদেরকে উপেক্ষা করে মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অঙ্গ এক কদম পা বাড়ানোর সাহস পেত না।

অভ্যন্তরীণ প্রভাবের বাইরে মার্কিনিদের পশ্চিমা মিত্র, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো, ইহুদি লবিস্ট, পোপ এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীরা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে সব সময় সঙ্কুচিত করে রাখত। সিআইএ, এফবিআই, সিনেট এবং কংগ্রেসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেউ মাত্র ২৪ ঘণ্টা হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্টের সিংহাসনে আসীন থাকবেন- এমন চিন্তা সে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে সর্বশেষ বারাক ওবামা পর্যন্ত, কেউই কল্পনা করতে পারতেন না। সামান্য একটি ঘটনা ঘটেছিল ওয়াটারগেট নামক হোটেলে, সেই সত্তরের দশকে। বর্তমান জমানার নানা অঘটন, অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তপনার সঙ্গে তুলনা করলে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিকে সামান্য ঘটনা বলে মনে হবে। অন্য দিকে, ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে যদি ক্লিনটন-মনিকার কাহিনীর তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে একজন ‘দেবতা’ বলেই মনে হবে এবং তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্রকে রীতিমতো ‘অত্যাচারী’ বলে আখ্যায়িত করতে হবে। 
গত দুই বছরের বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন নীতি বলতে গেলে, ওলটপালট হয়ে গেছে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বহু নাটক করার পর ট্রাম্প সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নাটকীয়ভাবে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হলেন সিঙ্গাপুরে। ন্যাটো নামক সামরিক জোটের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ঐতিহাসিক মিত্রতা গড়ে তুলেছিল, তাও ট্রাম্প হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা আর ন্যাটোর জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারবে না।

ইতোমধ্যে তিনি বিশ্ব জলবায়ু তহবিল থেকে আমেরিকাকে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অনুরূপভাবে, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েনকৃত মার্কিন সৈন্যদের ব্যয়ভারের যে অংশটি যুক্তরাষ্ট্র সরকার বহন করে আসছে, তা কাটছাঁট করার হুমকি দিয়েছেন। আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় যুদ্ধরত মার্কিন সৈন্যদের খরচ কমানোর জন্য তড়িঘড়ি করে সৈন্য প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। একইভাবে সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানে মার্কিন সরকার বিগত দিনে যে অর্থসহায়তা দিত; তাও কাটছাঁট করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অর্থসাহায্য এবং আর্তমানবতার জন্য ত্রাণের ক্ষেত্রে আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন।

ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, স্থানীয় কর ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘বিদেশী তাড়াও’ নীতির কারণে পুরো বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তার সীমান্ত নীতির কারণে শত বছরের পুরনো বন্ধু কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। প্রতিবেশী মেক্সিকোর সঙ্গে অহি-নকুল সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে, ওবামার শাসনের শেষ দিকে তিনি কিউবা ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, তাও ট্রাম্প বাতিল করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, স্বাস্থ্যনীতি এবং করপোরেট ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত মার্কিন মুলুকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। আপনি যদি রোজ সিএনএন টিভি দেখেন অথবা নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, হাফিংটন পোস্ট, টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল প্রভৃতি প্রভাবশালী পত্রিকা পড়েন; তবে নিশ্চয়ই আপনার মনে হবে ট্রাম্প বদ্ধ উন্মাদ এবং তিনি পাগলামি করতে করতে পুরো বিশ্বকে জাহান্নামের অতলগহ্বরে নিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের ‘পাগলামি’ নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, ট্রাম্প স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে নিজের মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অনেক আমদানি পণ্য, ইউরোপীয় ও কানাডার স্টিলের ওপর যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা রীতিমতো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তার অন্য নীতিগুলো বাস্তবায়নের ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে; বেকার সমস্যা হ্রাস পেয়েছে এবং মার্কিন ডলার বিশ্বমুদ্রাবাজারে ইতিহাসের রেকর্ড ব্রেক করা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে। পশ্চিমা মিডিয়া, এলিট সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার মতবিরোধ এবং তাদেরকে কোনো পাত্তা না দেয়ার কারণে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মার্কিন অভিজাত রক্ষণশীল সমাজ রীতিমতো অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে, যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে যথেষ্ট বিনোদন দেয়ার পাশাপাশি তাদেরকে এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। গত দুই বছরে ট্রাম্প একটিবারের জন্য কোনো মিডিয়াকে পাত্তা তো দেনইনি, বরং উল্টো তাদেরকে নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমান করেছেন। তিনি একটিবারের জন্যও মিডিয়ার পেছনে ছোটেননি, বরং এমন সব কাজকর্ম করেছেন এবং কথাবার্তা বলেছেন, যার জন্য মিডিয়া সর্বশক্তি নিয়োগ করে তার পেছনে ছুটে চলেছে। অথচ তিনি তাদেরকে কখনো ধরা দেননি। তিনি একটি টুইট বার্তার মাধ্যমে মিডিয়ায় যে আলোড়ন সৃষ্টি করেন, তা বর্তমান দুনিয়ায় অন্য কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে কল্পনাও করা যায় না।

এখন প্রশ্ন হলো- এত বিপদ-বিপত্তি, প্রচার-প্রচারণা ও বাধার মুখে সব কিছুকে তুড়ি মেরে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছেন? তার এই এগিয়ে চলার পরিণতিই বা শেষ অবধি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে? এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে একটি কথা বললে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। আর তা হলো মার্কিন মুলুকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তার ক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে, তার নিজ দলে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এমন কোনো প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কি তাই? বিরোধী দল থেকে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এমন কেউ এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখাননি। প্রভাবশালী মিডিয়া আগবাড়িয়ে দু-চারজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল, কিন্তু সে কথা প্রকাশ পাওয়ার পর ওইসব প্রার্থী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ওসবের মধ্যে নেই।

মার্কিন রাজনীতির যেসব প্রভাবশালী নেতা ইতঃপূর্বে ট্রাম্পের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করেছিলেন অথবা যারা কারণে-অকারণে ট্রাম্পের সমালোচনা করতেন, তারা প্রায় সবাই পিছুটান দিয়েছেন। অনেকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পের তৃতীয় স্ত্রী মেলানিয়া প্রথম দিকে স্বামীর সঙ্গে যেরূপ আচরণ করতেন, তা তিনি ইদানীং আর করেন না। মহাভারতের ঐতিহ্যবাহী পতিপ্রাণা একান্ত অনুগত স্ত্রীর মতো মেলানিয়া বর্তমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যেভাবে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন, তা মার্কিন রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের রীতিমতো আশ্চর্য ও আবেগতাড়িত বানিয়ে ফেলেছে। বুদ্ধিজীবীরা ট্রাম্পের ব্যাপারে নতুন সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছেন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নতুন করে রাজনীতির প্রবন্ধ রচনার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শুরু করে দিয়েছেন। অন্য দিকে, বিশ্বের বাঘা বাঘা জ্যোতিষী গ্রহ, নক্ষত্র ও আকাশের অবস্থা বিবেচনা করে নতুন ভবিষ্যদ্বাণী রচনায় আত্মনিয়োগ করেছেন।

আপনি যদি ট্রাম্পের সফলতার কারণ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তবে আমি বলব, তিনি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও কঠোর জাতীয়তাবাদীদের মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি তার প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা, কৌশল ও দুর্বলতা সম্পর্কেও যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করে মাঠে নেমেছিলেন। তার সফলতার আরেকটি কারণ হলো, তার একগুঁয়েমি এবং নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল আস্থা রাখার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা। দুরন্ত সাহস, বুদ্ধিমত্তা, অনর্গল বক্তব্য দেয়ার সম্মোহনী ক্ষমতা, রসবোধ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তনের সৎসাহস তাকে ক্রমাগত সফলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিজের অতীত অভিজ্ঞতা, মানুষ চেনার সামর্থ্য, প্রতিরোধ করার ক্ষমতা, ‘না’ বলার সক্ষমতা, অপরাধীকে শাস্তি প্রদান এবং পথের কাঁটা দূর করার নৈপুণ্য তাকে রাজনীতির অনন্য পুরুষে রূপান্তরিত করে চলছে। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব অল্পসংখ্যক রাজনীতিবিদের মধ্যে ট্রাম্পের মতো বিপরীতমুখী দোষগুণ, সম্মোহনী ক্ষমতা, নেতৃত্বপূর্ণ এবং একরোখা চরিত্র ও নিষ্ঠুরতা দেখা গেছে। মহামতি জুলিয়াস সিজার এবং কুখ্যাত অ্যাডলফ হিটলার, উভয়ের মধ্যেই ট্রাম্পের মতো দোষগুণের সমাহার ছিল। এখন প্রশ্ন হলো- ট্রাম্প কি এ যুগের সিজার হবেন নাকি হিটলার? আমার মতো অর্বাচীনের পক্ষে ট্রাম্প সম্পর্কে এ মুহূর্তে এত বড় মন্তব্য করা সমীচীন হবে না বিধায় বিষয়টি ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিলাম।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ