২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ট্রাম্পের নতুন প্রতিরক্ষা বাজেটে চীনের উদ্বেগ

ট্রাম্পের নতুন প্রতিরক্ষা বাজেটে চীনের উদ্বেগ - ছবি : সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য ৭১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বিশাল বাজেট বিলে সই করেছেন। তার এ সইয়ের মধ্য দিয়ে বাজেট বিলটি আইনে পরিণত হলো এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে এ অর্থ খরচ করবে। বিলটি বেইজিংকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে চীন এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

বাজেট বিলে সই করার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি আমাদের যোদ্ধারা অস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা রক্ত, ঘাম ও চোখের পানির বিনিময়ে এ অধিকার অর্জন করেছে।’ ট্রাম্প আরো বলেন, এবারের সামরিক বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের যুদ্ধমতা দেবে যার ফলে তারা যেকোনো যুদ্ধে দ্রুত ও চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হতে পারবে। নতুন বাজেট থেকে পেন্টাগন ৬৩ হাজার ৯১০ কোটি ডলার খরচ করবে সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য। আর বিদেশে অবস্থানরত সেনাদের জন্য খরচ করা হবে ছয় হাজার ৯০০ কোটি ডলার। নতুন বাজেটে মার্কিন সেনাদের বেতন বাড়বে শতকরা দুই দশমিক ছয় ভাগ। 

এ বিলে চীনের বিরুদ্ধে পদপে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। তারপরও বিলটি বেইজিংকে ল্য করেই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে চীন এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিল সইয়ের পরদিনই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চীন বরাবরই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা ত্যাগ করার অনুরোধ করছি।’

সোমবার ট্রাম্প ৭১ হাজার ৬ শ’ কোটি মার্কিন ডলারের ওই প্রতিরা বিল সই করেন। যেখানে সামরিক ব্যয় অনুমোদন পাওয়ার পাশাপাশি চীনের ‘জেডটিই করপোরেশন’ ও ‘হুয়াই টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেডের’ সাথে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণও শিথিল করা হয়েছে। তবে ন্যাশনাল ডিফেন্স অথোরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ) নামক এ নতুন বিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের ওপর নজরদারি এবং তাইওয়ান বাহিনীকে শক্তিশালী করে তুলতে তাদের প্রস্তুতির পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কিত রিপোর্ট পেশের ব্যবস্থা থাকায় চীন এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিরা বিল সইয়ের পরদিনই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ‘চীন বরাবরই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে ঠাণ্ডা যুদ্ধের মানসিকতা ত্যাগ করার অনুরোধ করছি।’ নতুন প্রতিরা বিলে প্রস্তাবিত বিদেশী বিনিয়োগ জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি হবে কি না তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই কমিটিকে (সিএফআইইউএস) আরো শক্তিশালী করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় চীনের অলিখিত প্রযুক্তি আইন 
এ দিকে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ও নতুন শুল্ক বসানোর প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অলিখিতভাবে চীন নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করতে পারে বলে জানিয়েছেন একজন বিশেষজ্ঞ। এই আইনগুলো মূলত বিভিন্ন ফায়ারওয়াল ও সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীন সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা গাইডলাইন। চীনের ব্যবসায়িক অংশীদারদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিদেশী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই অলিখিত আইন বা গাইডলাইনগুলো মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এক রিপোর্টে জানায়, গত কয়েক বছরে চীন সরকার প্রযুক্তিবিষয়ক প্রায় ৩০০টি গাইডলাইন ইস্যু করেছে। এতে আরো বলা হয়, এই গাইডলাইনগুলোর কারণেই চীন ক্রমবর্ধমানভাবে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন বাজারে পরিণত হচ্ছে।

আরো পড়ুন :

মার্কিন ইলেকট্রনিক পণ্য বয়কটের ঘোষণা এরদোগানের
যুদ্ধবিমান বিক্রি স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের
ডেইলি সাবাহ ও রয়টার্স
আঙ্কারায় গতকাল ‘ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান আয়োজিত সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান :ইন্টারনেট -
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অর্থনৈতিক অবরোধের জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান গতকাল মঙ্গলবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো ইলেকট্রনিক পণ্য কিনবে না তার দেশ। আঙ্কারায় এক অনুষ্ঠানে এরদোগান এ ঘোষণা দেন। 

তিনি দেশের নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে ডলার, মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরশীলতা রক্ষা করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মার্কিন ইলেকট্র্রনিক পণ্য বয়কট করতে যাচ্ছি। তাদের আইফোন থাকলে অন্যদের স্যামসাং আছে, আর আমাদের আছে ভেসটেল।’

এরদোগানের এ ঘোষণার পরপরই তুর্কি স্মার্টফোন কোম্পানি ভেসটেলের শেয়ারের মূল্য ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ভেনাস’ নামে আইফোনের মতো বিশেষ স্মার্টফোন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। তুরস্কে কারাবন্দী একজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ছেড়ে না দেয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের স্টিল জাতীয় পণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে ডলারের বিপরীতে তুর্কি মুদ্রা লিরার দাম সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।
এ দিকে এর আগে তুরস্কের কাছে সামরিক বিমান বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশ দুইটির মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই গত সোমবার এ ঘোষণা দেয় দেশটি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক বাজেটে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাজেট ঘোষণায় তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়ে প্রতিরক্ষা বিভাগকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তারও আগে তুরস্কের কাছে কমপক্ষে ৯০ দিনের জন্য বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়।

মার্কিন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ব্রানসনকে তুরস্কের আদালতে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দেয়ার পরই দেশটির ওপর অবরোধের হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান হাতে পাওয়ার আশায় ছিল তুরস্ক। জুন মাসের শেষের দিকে তুর্কি উপ-প্রধানমন্ত্রী বেকির বোজদাগ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহ করা হবে।‘ তিনি আরো বলেন, বিমানগুলো বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কিন ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে মুক্তির শর্ত বেঁধে দেয়া হলে তা হবে ‘হুমকি’র শামিল। 

গত সোমবার স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেটে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ৯০ দিনের জন্য তুরস্কের কাছে এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান বিক্রি বন্ধ রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কংগ্রেসের কাছে রিপোর্ট দিতে প্রতিরক্ষা বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রিপোর্ট জমা না হওয়া পর্যন্ত তুরস্কের কাছে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি করা যাবে না। মার্কিন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে গ্রেফতার করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে টানাপড়েন অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে তুরস্কের ওপর বেশ কিছু বিধি-নিষেধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ব্রুনসনের মুক্তি দাবি করছে আর তুরস্ক বলছে সে ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত ছিল। ব্রুনসনকে ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে ফতহুল্লাহ গুলেনকে ফেরত চায় তুরস্ক। ফতহুল্লাহ গুলেনকে ওই অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিহিত করে থাকে তুরস্ক।

২২ বছর ধরে তুরস্কে বসবাস করা মার্কিন নাগরিক অ্যান্ড্রু ব্রুনসন পেশায় ধর্মযাজক। তার বিরুদ্ধে আনা সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য না হয়েও তাদের পক্ষে অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণ হলে আরো ২০ বছরের দণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। তবে এসব অভিযোগ জোরালভাবেই অস্বীকার করে আসছেন তিনি।


আরো সংবাদ