১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছে মার্কিন ডলার ডেইলি সাবাহ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছে মার্কিন ডলার

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছে মার্কিন ডলার - ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়ে মার্কিন ডলারের বিকল্প অন্য কোনো মুদ্রা খোঁজার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই ডলারের আধিপত্য হ্রাস করবে। অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের বিকল্প খোঁজার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ও রাশিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর এ বিষয়টি সামনে আসে। ফলে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলার বাতিল করতে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বাজারগুলোতে অন্য দেশের মুদ্রাগুলোর শেয়ার বৃদ্ধি করার দাবি উঠেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মাথায় রেখে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তুরস্ক ও রাশিয়া সম্প্রতি স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছে। গত শনিবার দেয়া এক বক্তৃতায় তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেন, চীন, রাশিয়া, ইরান ও ইউক্রেনের মতো শীর্ষ বাণিজ্যিক মিত্র দেশের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করতে প্রস্তুত হচ্ছে তুরস্ক। তিনি আরো বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথেও একইভাবে লেনদেন করতে প্রস্তুত রয়েছে তার দেশ। এ দিকে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া।

গত রোববার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বাসভবন ক্রেমলিনের এক মুখপাত্র বলেন, তুরস্কের সাথে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলার বা ইউরোর পরিবর্তে জাতীয় মুদ্রা ব্যবহার করবে মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে জাতীয় মুদ্রা কিভাবে ব্যবহৃত হবে, তা রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে অনেকবারই আলোচনা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়টি রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা করে এসেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনও বারংবার এ ধরনের সম্ভাব্যতার কথা বলেছেন। অবশ্যই এটা খুবই কঠিন একটি বিষয় এবং কঠিন হিসাব। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে আমরা এ বিষয়টিই বাস্তবায়ন করতে চাই এবং রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এ বিষয়টিই বহুবার আলোচনা করা হয়েছে।’

ট্রেজারি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল এ দুই মাসের মধ্যে বস্তুত রাশিয়া মার্কিন সরকারের বেশির ভাগ বন্ড বিক্রি করে দিয়েছে। রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী অ্যান্টন সিলুয়ানভ বলেন, ‘নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আমেরিকান সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া।’ তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে মার্কিন ডলার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তেল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের স্থলে জাতীয় মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে বলেও আভাস দেন এ মন্ত্রী।

আরো পড়ুন :

তুরস্কের পিঠে যেভাবে ছুরি মারল যুক্তরাষ্ট্র
বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তিক্ত বিবাদকে কেন্দ্র করে তুরস্কের মুদ্রা লিরার মূল্যমানে ধস নামার পর প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়িপ এরদোগান বলছেন, 'কৌশলগত মিত্র হয়েও আমেরিকা আমাদের পিঠে ছুরি মেরেছে।'

তুরস্কে আটক এক আমেরিকান যাজককে নিয়ে কূটনৈতিক বিবাদের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তুর্কি ইস্পাত ও এ্যালুমিনিয়মের ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করার পর ডলারের বিপরীতে লিরার মূল্যমান ক্রমাগত কমছে। এশিয়ার বাজারে একপর্যায়ে লিরার দাম ৭ দশমিক ২৪-এ নেমে যায়। তবে এখন তা কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।


প্রেসিডেন্ট এরদোগান আমেরিকার আচরণকে 'অগ্রহণযোগ্য' আখ্যায়িত করে বলেন, তুরস্ক 'পণবন্দি হয়ে পড়েছে।'

ট্রাবজন শহরে সমর্থকদের এক সভায় প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, "যারা সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ চালাচ্ছে - তাদের প্রতি আমাদের জবাব হবে নতুন নতুন বাজার এবং মিত্র বের করার পথে এগিয়ে যাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, "তারা ধাতু এবং ইস্পাতের ওপর ট্যারিফ বাড়িয়েছে। এটা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের মধ্যে পড়ে না।"

তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবসা সহজতর করা এবং যত তারল্য দরকার তা দেবার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু সুদের হার বাড়ায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তারা দেশটির অর্থখাতের স্থিতিশীলতার ধরে রাখতে সবরকম পদক্ষেপই নেবে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বলেছে, তারা সামাজিক মাধ্যমের ৩৪৬টি একাউন্টের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিচ্ছে, যারা তাদের ভাষায় 'উস্কানিমূলক ভাবে লিরার দর পড়ে যাওয়া নিয়ে মন্তব্য করেছিল।'

আমেরিকার সাথে বিবাদের কারণ
তুরস্কের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদের কারণ হলো, গত দু বছর ধরে তুরস্কে একজন আমেরিকার ধর্মযাজক বন্দী আছেন যাকে এরদোগানবিরোধী অভ্যুত্থান এবং কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র তার মুক্তি দাবি করলেও তুরস্ক তাকে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করে। এর পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তুরস্কের ইস্পাত ও এ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন, আর তার আগে তুরস্কের দু'জন মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এরদোগান বলেছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। তুরস্ক সেই ব্যর্থ অভ্যুথানের পেছনে ফেতুল্লাহ গুলেনের আন্দোলন জড়িত ছিল বলে দাবি করে, যিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় অবস্থান করছেন।

গুলেনকে বিচারের জন্য তুরস্কের হাতে তুলে দেবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র - যা এরদোগানের ক্ষুব্ধ হবার আরেকটি কারণ।

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে ।এটাও তুরস্কের পছন্দ নয় - কারণ তুরস্ক নিজেই তাদের ভুখন্ডে কুর্দি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

এরদোগান এ ছাড়াও ইদানিং রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছেন।

কিন্তু তুরস্ক হচ্ছে রাশিয়ার শত্রু নেটো জোটের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সেখানকার ইনজারলিক বিমান ঘাঁটিটি আইএস বিরোধী লড়াইয়ে নেটো ব্যবহার করছে। তাই রাশিয়ার সাথে এরদোগানের ঘনিষ্ঠতা নেটোর জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরী করেছে।

এ ছাড়া ইনজারলিক বিমান ঘাঁটি বন্ধ করে দেবার জন্য তুরস্কের ভেতর থেকে এরদোগানের ওপর চাপ রয়েছে।


আরো সংবাদ