২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সঙ্কটে মার্কিন গণতন্ত্র

সঙ্কটে মার্কিন গণতন্ত্র - ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়ার পর পেরিয়ে গেছে ১৮টি মাস। কিন্তু এখনো মার্কিন গণতন্ত্র গুরুতর সমস্যার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কালো টাকা, প্রেসিডেন্টের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও সুপ্রিম কোর্টের রাজনীতিকরণ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। 
কিন্তু এসবগুলোর জন্য কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্প একা দায়ী নন, বরং অধিকাংশের জন্যও নন। প্রশাসনের এই সমস্যা তৈরি হয়েছে কয়েক দশক ধরে। এখন ট্রাম্প নিজস্ব পন্থায় দেশটির প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস, আইন, প্রতিষ্ঠান এবং মূল্যবোধ ধ্বংসের পরীক্ষায় যেভাবে মেতে উঠেছেন, তার ফলে এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। 
ফলে আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনে আস্থা সঙ্কট, জাতীয় ইস্যুগুলোয় বিভক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রভাব ফেলবে। শঙ্কা রয়েছে এ নির্বাচনে বহিরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপেরও। ইতোমধ্যেই গত নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে এফবিআইয়ের যে তদন্ত চলছে, তাতে ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টেরও সম্ভাবনা রয়েছে। 

দেশটির গণতন্ত্রের অবনতির যে ধারা দৃশ্যমান হচ্ছে তা মার্কিন নাগরিক এবং যারা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে অনুসরণের যোগ্য বলে ভাবে তাদেরকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। মিত্ররা মনে করছে, ঐতিহ্যগতভাবেই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার যে যোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল তা নৈতিক এবং বাস্তব উভয় দিক থেকেই হ্রাস পাচ্ছে। অন্য দিকে দেশটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অগণতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী দেশ রাশিয়া ও চীনও এমনটিই ভাবছে। 
বেশ কিছু দিন ধরেই ট্রাম্প বারংবার দম্ভভরে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে আসছেন। কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে তিনিই এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরমাণু অস্ত্রাগারের পরিচালক। গত বছর তিনি আড়াই কোটি মানুষের দেশ উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রের সাহায্যে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দেন। একই হুমকি দেন তিনি ইরানের বিরুদ্ধেও। এই রকম আচরণ করে আরো বহু মার্কিনিও। তবে এটি নিশ্চিত যে, ট্রাম্প যদি আসলেই পরমাণু বাটনে চাপ দিতে চাইতেন, তাহলে তারা তাকে থামাতে পারত না। 

এক্ষেত্রে অবশ্য এখনো চেইন অব কমান্ড রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট যদি এ বাটনে চাপ দিতে চান তাহলে কোনো ব্যক্তি এমনকি মন্ত্রিসভা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সেনাবাহিনীর প্রধান কারোই অধিকার নেই তাকে থামানোর। গণতন্ত্রের এর চেয়ে আরো দুরবস্থা আর কী হতে পারে? অবশ্য এ অবস্থা ট্রাম্পের সৃষ্ট নয়। বহু বছর ধরে এরকমই চলে আসছে। কংগ্রেস এখন বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করছে। আবার যেকোনো ইস্যুতে ট্রাম্প খুব বেশি তার নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ করেন। যেমনÑ সাত মুসলিম দেশের লোকজনের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল, স্টিলের ওপর শুল্কারোপ, ওবামার হেলথ কেয়ার রদ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রয়োগ করছেন। এগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল প্রথমটি আদালতে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। 

ট্রাম্পের এ আচরণগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের হতবাক করে দিয়েছে। তবে এর ব্যবহার কিন্তু এই প্রথম নয়। কারণ এর আগে পার্ল হারবার ইস্যুতে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এবং দাসপ্রথা সমাপ্তিতে আব্রাহাম লিঙ্কন এ ক্ষমতার প্রয়োগ করেছিলেন। এগুলোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পদ্ধতিটিও কম দায়ী নয়। দুই দলের রাজনীতি বহাল থাকায় মার্কিন জনগণ তাদের সঠিক মতামত প্রকাশ করতে পারে না। এর ফলে কয়েক ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বারবার একই ব্যক্তি নির্বাচিত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পছন্দের জায়গাটি হ্রাস পাচ্ছে; এমনকি পপুলার ভোটে হেরে যাওয়ার পরও কোনো কোনো ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন। কেবল ট্রাম্পই নন, তার মতো আরো চারজনের বেলাতেও ঘটেছে একই ঘটনা। ফলে দেশটির ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিটি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। 

অন্য দিকে কংগ্রেসের সদস্যরা বিভিন্ন করপোরেশন, দাতা এবং বিশেষ সুবিধাভোগী সংস্থার অনুকূলে কাজ করে থাকেন। এক কথায় তারা এক্ষেত্রে দুর্নীতি করে থাকেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস প্রার্থীরা সব মিলিয়ে ৬৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন, যা পুরো দেশের সব শিক্ষকের বেতন দুই হাজার ডলার করে বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সিনেটের একটি আসনে জয় পেতে খরচ হয়েছে এক কোটি ৯৪ লাখ ডলার। অন্য দিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে জয়ী হতে খরচ হবে দেড় কোটি ডলার। এত খরচের কারণে স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেসের সদস্যরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারেন না। 
গত নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি মার্কিন গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় আঘাত হিসেবে এসেছে। কিন্তু ট্রাম্প এটিকে চাপা দিয়ে রাখছেন। রাশিয়া সেই ১৯৪৫ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে আসছে। কিন্তু এখন তারা এটি আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করাচ্ছে। 

মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান সম্প্রতি বলেন, আমাদের গণতন্ত্র এখন যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি। এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আমাদের প্রতিপক্ষরা এগুলোকেই লক্ষ্য বানিয়েছে। এখন যদি দেখা যায়, সত্য সত্যই ট্রাম্প এক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাহলে কী হবে, তিনি কী জবাব দেবেন? এর কোনো উত্তর কারো জানা নেই। 

এক্ষেত্রে কি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারবে, যেটি দেশটির তৃতীয় সাংবিধানিক স্তম্ভ। বোধহয় এটিও সম্ভব হবে না। কারণ এর আগে সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগগুলো অরাজনৈতিক হলেও সর্বশেষ যে নিয়োগ তাতে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি ছিল। কিন্তু যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখন এ সমস্যার কথা চিন্তাই করা হয়নি। ফলে এর মাধ্যমেও শেষ রক্ষা হবে বলে মনে হচ্ছে না। 

ট্রাম্পের এসব বাউন্ডুলে আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক কাঠামোগত সমস্যায় পড়েছে। তার এই প্রেসিডেন্সি অনেক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। অতি জাতীয়তাবাদ, বর্ণ ও জাতি বিদ্বেষ, ফ্যাসিবাদ, বিভেদমূলক গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ, ইউরোপীয় গণতন্ত্রকে অবমাননা ইত্যাদি বিষয়কে ট্রাম্প উৎসাহিত করছেন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। ট্রাম্প কি এসবই নিজে করছেন? 
তাহলে কী হতে যাচ্ছে? এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, যা হতে যাচ্ছে, তা স্বীকার করে নেয়া। দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবিচ্ছেদ্য, প্রশ্নাতীত গণতান্ত্রিক মডেলের যে গ্রহণযোগ্যতা তা দেশের ভেতরে ও বাইরে নিরবচ্ছিন্ন আনুগত্যের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কার একেবারে গোড়া থেকে খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে হয়তো একটি জাতীয় সংলাপের প্রয়োজন দেখা দেবে এবং মূল গণতন্ত্রের যে মূলধারাগুলো রয়েছে সেগুলোও দেখে নেয়া দরকার হবে। ২৩১ বছর পর হয়তো এখনই আবার ফিলাডেলফিয়ার সাংবিধানিক কনভেনশনের ফলোআপের সময় হয়েছে।


আরো সংবাদ

সকল