২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইরানের সাথে আলোচনায় এতো আগ্রহী ট্রাম্প!

ইরান
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হাসান রোহানি - ছবি: সংগৃহীত

ইরানের নেতাদের সাথে ‘কোনো পূর্বশর্ত’ ছাড়া এবং ‘তাদের সুবিধামতো সময়ে’ দেখা করার প্রস্তাব জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি যে কারো সাথে বৈঠক করবো। আমি বৈঠকে বিশ্বাসী।’

এ মাসের শুরুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানি আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তপ্ত মন্তব্য বিনিময়ের পর মি. ট্রাম্পের এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব প্রকাশিত হলো। খবর বিবিসির।

মে মাসে একটি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসে, যেই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে আনার সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করার বিষয়ে প্রস্তাবনা ছিল।

২০১৫ সালের ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া আর জার্মানির আপত্তি সত্ত্বেও কিছুদিনের মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে আবারো সেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে শত্রুভাবাপন্ন ইসরাইল ও সৌদি আরবের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।

মি. ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, ‘তারা যদি বৈঠক করতে চায়, আমরা বৈঠক করবো।’

মি. ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে প্রেসিডেন্ট রোহানির একজন উপদেষ্টা হামিদ আবুতালেবি টুইটে মন্তব্য করেছেন, ‘পরমাণূ চুক্তিতে ফিরে আসা’ আর ‘ইরান রাষ্ট্রের অধিকারসমূহকে সম্মান’ জানালে আলোচনার পথ সুগম হবে।

এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি শীর্ষ নেতা আলোচনায় বসবেন।

ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর পরিণতি ভয়াবহ হবে - গত সপ্তাহে মি. রোহানির এক মন্তব্যের ক্ষুদ্ধ সমালোচনা করেন মি. ট্রাম্প।

জবাবে মি. ট্রাম্প টুইট করেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়ালে এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে যা আগে কখনো কাউকে করতে হয়নি।’

ইরানের সাথে কোনো ‘নতুন চুক্তি’ হতে হলে সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার ও ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের সমর্থন বন্ধ করাসহ ১২টি শর্তের উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধিতা কি নিয়ে?
২০১৫ সালের পরমাণূ চুক্তির সরাসরি বিরোধিতা করেছেন মি. ট্রাম্প, যেই চুক্তির শর্ত রক্ষা করতে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের মতে পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়নের ফলেই ইরান ঐ অঞ্চলে দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে পারছে। সিরিয়ায় শতাধিক ট্রুপ এবং কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবী সশস্ত্র সেনা রয়েছে ইরানের।

ইরানের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র সমর্থন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর, যদিও ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র সৌদি আরব ওই অঞ্চলে ইরানের অন্যতম প্রধান শত্রু।

যুক্তরাষ্ট্র কেন পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গেছে?
মে মাসে ইরান পরমাণু চুক্তিকে - বা জয়েন্ট কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) - ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ভয়ঙ্কর একপেশে চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দেন।

তিনি বলেন ওই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘অস্থিতিশীলতা কার্যক্রমকে’ প্রতিহত করেনি।

ইরান বরাবর বলে এসেছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’র (আইএইএ) নীতিমালা মেনেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও বলেছে যে, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানিয়েই পরমাণু কার্যক্রম চালাচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি ইরান। প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল রফতানি করে তারা।

দেশের ভেতরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে চলা বিক্ষোভ ও ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) দরপতনের কারণে এরই মধ্যে অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন হয়েছে ইরান।

আরো পড়ুন :

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে ‘নজিরবিহীন যুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি
বিবিসি, ২৩ জুলাই ২০১৮
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে এবং দুটো দেশের প্রেসিডেন্টের সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হুমকির পর এই উত্তেজনা আরো তীব্র হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেয় তাহলে ইরানকে ‘এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে যা আগে কখনো কাউকে করতে হয়নি’।

মি. ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির আগে প্রেসিডেন্ট রোহানি বলেছিলেন, ‘ইরানের সাথে যুদ্ধ হলে সেটা হবে এমন এক যুদ্ধ যা পৃথিবীতে এর আগে কখনো হয়নি।’

ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পরমাণু চক্তি থেকে গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে দুটো দেশের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি হুমকি দেওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

ওই চুক্তিতে ধীরে ধীরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পরিহার করার বদলে দেশটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

এখন চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ওয়াশিংটন ইরানের উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।

কিন্তু ২০১৫ সালে আরো যেসব পক্ষ ওই চুক্তিতে সই করেছিল তারা ইরানের উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছে। এই দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন এবং রাশিয়া।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইট বার্তায় প্রেসিডেন্ট রোহানিকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, ‘আপনি আর কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেবেন না। যদি দেন তাহলে আপনাকে এমন পরিণতি দেখতে হবে যা ইতিহাসে এর আগে খুব কমই হয়েছে।’

‘যুক্তরাষ্ট্র এখন আর এমন কোন দেশ নয় যা সহিংসতা ও মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার উন্মত্ত কথা শুনবে। আপনি সাবধান হয়ে যান,’ বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

এর আগে ইরানি প্রেসিডেন্টের করা এক মন্তব্যের পরেই মি. ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট রোহানি ইরানি কূটনীতিকদেরকে বলেছেন, ‘আমেরিকার জানা উচিত যে ইরানের সাথে শান্তিই হলো আসল শান্তি। আর ইরানের সাথে যুদ্ধের মানে হলো এক ব্যাপক যুদ্ধ।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে টুইটারে এধরনের ক্রুদ্ধ বার্তা দিয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-আনের উদ্দেশ্যে, যাকে তিনি উল্লেখ করেছিলেন একজন 'উন্মাদ' হিসেবে। তাকে উদ্দেশ্যে করেও তিনি বলেছিলেন, ‘এমন পরিণতি হবে যা এর আগে কারো হয়নি’। পরমাণু হামলা চালানোর জন্যে কার দেশের ‘সুইচ’ কতো বড়ো সেটা নিয়েও তারা বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু তাদের সেই ঝগড়া বেশি দূর এগোয়নি। পাল্টাপাল্টি সেই হুমকি শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে তৃতীয় একটি দেশে তাদের মধ্যে বৈঠক এবং কূটনৈতিক সমঝোতার প্রক্রিয়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ইরান সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। মাইক পম্পেও বলেছেন, ‘ইরান সরকার যতোটা না সরকার তারচেয়ে বেশি মাফিয়া।’

ক্যালিফোর্নিয়ায় ইরানি আমেরিকানদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় তিনি প্রেসিডেন্ট রোহানি এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি বলেন, ইরানের উপর চাপ বাড়ানোর জন্যে তিনি তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

মি. পম্পেও বলেন, কেউ যাতে ইরানের কাছ থেকে তেল না কেনে সেজন্যে তিনি বিভিন্ন দেশকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যে ইরান থেকে তেল আমদানী বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, এতো ব্যাপক সংখ্যক ইরানি আমেরিকানদের সমাবেশের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এতো উচ্চ পর্যায়ের কোনো নেতা এর আগে এরকম সরাসরি মন্তব্য করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এধরনের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে ইরানি নেতৃত্বের উপর চাপ তৈরির জন্যে ট্রাম্প প্রশাসন কতোটা মরিয়া হয়ে উঠেছে।


আরো সংবাদ