২৩ জুন ২০১৮

ট্রাম্প-কিম দরকষাকষির অন্তরালে

ট্রাম্প-কিম দরকষাকষির অন্তরালে - ফাইল ছবি

আবার আশা-নিরাশার দোলাচলে কোরীয় উপদ্বীপ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির সর্বোচ্চপর্যায়ের বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা বিষয়টি আবার উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দুই মাস ধরে কোরীয় উপদ্বীপের সঙ্কট কাটানোর যে আয়োজন চলছে গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই তাতে যেন পানি ঢেলে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আশার কথা হচ্ছে- পরদিনই তিনি আবার কিম জং উনের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবুও শঙ্কার মেঘ কাটছে না। কারণটি অবশ্যই ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অস্থির আচরণের কারণে যেকোনো সময় শান্তিপ্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপটি একটি রাজনৈতিক চাল। দুটি কারণে- প্রথমত, ট্রাম্পের পিছু হটার ঘোষণায় উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটি যাচাই করা, দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাসীকে পরোক্ষ বার্তা দেয়া যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই যেকোনো সময় কোরীয় শান্তিপ্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে।

হঠাৎ করেই কিম জং উনের সাথে বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ১২ জুন সিঙ্গাপুরে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিমের কাছে লেখা হোয়াইট হাউজের এক চিঠিতে এ ঘোষণা দেয়া হয়। চিঠিতে কিমকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনার সাথে বৈঠকের জন্য আমি খুবই উন্মুখ ছিলাম। দুঃখজনকভাবে, ভয়ানক ক্ষোভ এবং প্রকাশ্য শত্রুতার ওপর ভিত্তি করে দেয়া আপনার অতি সাম্প্রতিক বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি, এটি বৈঠকের যথার্থ সময় নয়।’

বিশ্বব্যাপী সমালোচনা শুরু হয় ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের। অনেকেই তাকে দোষারোপ করতে থাকেন কয়েক মাসের পর মাস ধরে চলা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দেয়ার দায়ে। ধারণা করা হচ্ছিল এর প্রতিক্রিয়া ক্ষুব্ধভাবে দেবে উত্তর কোরিয়া; কিন্তু না, তারা ইতিবাচক মানসিকতা অব্যাহত রেখেই বিবৃতি দিয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উত্তরের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিম ক্যায়া-গোয়ান মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, উত্তেজনা নিরসন ও ওয়াশিংটনের সাথে বিদ্যমান দূরত্ব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে ‘যেকোনো সময়’ কথা বলতে পিয়ংইয়ং প্রস্তুত। তিনি বলেন, শীর্ষ বৈঠক বাতিলে তার হঠাৎ ও একতরফা এ সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য অনেকটাই অপ্রত্যাশিত, আমরা অত্যন্ত দুঃখিতও।

ট্রাম্পের এই একবার অগ্রসর হওয়া, আবার পিছিয়ে যাওয়াটা কি তার অস্থিরমতি স্বভাবের অংশ নাকি কোনো কৌশল সেটি নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের স্বভাবগত যে অস্থিরতা বিশ্ববাসী দেখেছে তাতে এটিও তারই অংশ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আবার যদি কৌশলের অংশ হয় তবে বলতে হবে- বিষয়টিতে খুব সাবধানে পা ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র। যদি শেষের ধারণাটি সঠিক হয় তাহলে বুঝতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে যাচাই করার জন্য চালটি দিয়েছিল। কিম জং উনের যে ক্ষিপ্র মেজাজ তাতে সেটিই অস্বাভাবিক কিছুই নয়।
কাজেই ট্রাম্পের পিছু হটার ঘোষণা যদি কোনো চাল হয়ে থাকে, তবে বলতে হবে উত্তর কোরিয়া তা ভালোভাবেই উতরে গেছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার কোনো উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের থেকে থাকে তা আপাতত ব্যর্থ হয়েছে কিমের বুদ্ধিমত্তায়। তাই হয়তো এর পরদিন শুক্রবারই আবার মত পাল্টান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তিনি টুইটারে আশা প্রকাশ করেন ‘বৈঠক হতে পারে’। শনিবার দুই কোরিয়ার সীমান্ত অঞ্চলীয় গ্রাম পানমুনজামে দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করেন দুই কোরিয়ার রাষ্ট্র নেতারা। সেখানে থেকে ফেরার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন জানান, তিনি উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়ে আশাবাদী।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউএস-কোরিয়া ইনস্টিটিউট পরিচালিত উত্তর কোরিয়াবিষয়ক ওয়েবসাইটের ‘থার্টিএইট নর্থ’ সম্পাদক জেনি টাউন মনে করেন, এ ইস্যুতে দুই পক্ষের আচরণ এত রহস্যময় যে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। তবে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান তুলনামূলক ইতিবাচক বলেও মনে করেন তিনি। ট্রাম্পের এই একবার অগ্রসর হওয়া, আবার পিছিয়ে আসার মানে কী? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এর কারণ হতে পারে যে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াসহ বিষয়টির সাথে জড়িত সব পক্ষকে বোঝাতে চাইছেন যে, তিনি চাইলে যেকোনো সময় এ সংলাপ থেকে সরে আসতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান ও ক্ষমতা জানান দিতে সবার প্রতি স্পষ্ট একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা বৈঠক থেকে সরে এলেও আসতে পারে। এটিকে এক ধরনের হুমকিও বলা যেতে পারে।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় থাকতে পারে উভয় পক্ষের জন্যই। সেটি হলো দরকষাকষি। উভয় পক্ষই চাইছে নিজ নিজ দাবির বিষয়ে বৈঠকের আগেই নিশ্চিত হতে। যুক্তরাষ্ট্র চায় কিম তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করুক। হয়তো সেটি হয়নি বলেই ট্রাম্প বৈঠক বাতিলের নাটক করেছেন। অন্য দিকে, উত্তর কোরিয়া চাইছে তার নিরাপত্তা। অস্ত্র কর্মসূচি বাতিল হলে তার দেশের পরবর্তী নিরাপত্তা কী হবে সেটি নিয়ে তারা গ্যারান্টি চাইছে। তাই সে নিশ্চয়তা পাওয়ার আগে সব অস্ত্র হাতছাড়া করতে চাইছে না। এ ক্ষেত্রে লিবিয়ার উদাহরণ তো সামনেই আছে।

লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করার সাত বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছিলেন। যদিও লিবিয়ার অস্ত্র কর্মসূচি তখন কেবল প্রাথমিকপর্যায়ে ছিল। কিন্তু পশ্চিমাদের আশ্বাসে তারা সব কর্মসূচি বর্জন করে কোনো সুবিধা বা নিরাপত্তার গ্যারান্টি না পেয়েই। শুধু আশ্বাসের ভিত্তিতেই গাদ্দাফি লিবিয়ার অস্ত্র কর্মসূচি বর্জন করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে উত্তর কোরিয়াও একইভাবে সব অস্ত্র কর্মসূচি বর্জন করে শান্তি আলোচনায় আসুক। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, ২০০৪ সালে লিবিয়ার মতো উত্তর কোরিয়াকে নিঃশর্ত অস্ত্র কর্মসূচি বর্জন করতে হবে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া যে সেটি করবে না তা বোঝাই যাচ্ছে। তারা চাইছে দরকষাকষি করে নিজস্ব স্বার্থ আদায় করতে। তাই উভয় পক্ষই যে নিজ নিজ অবস্থানে অটল থাকবে তা অনুমান করা কঠিন নয়। জন বোল্টনের দাবির কড়া সমালোচনা করেছেন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা লিবিয়ার মতো শুধু আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চাইছে না। তাই আগামী ১২ জুন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে এ নিয়ে আরো নাটক বা দরকষাকষি দেখা যেতেই পারে।
বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তায় দুই কোরিয়ার নাগরিকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে হতাশ। শান্তি আর ঐক্যের যে সুবাতাস তারা পেতে শুরু করেছিল তা যেন আচমকাই উড়ে যায় ট্রাম্পের বৈঠক বাতিলের ঘোষণায়। ওয়াং ইয়ন নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, এর চেয়ে খারাপ খবর আর হতে পারে না।। দুই যমজ সন্তানের মা ইয়ন ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। বর্তমানে বাস করছেন রাজধানী সিউলে। বিবিসি নিরাপত্তাজনিত কারণে তার আসল নাম ব্যবহার করেনি। ইয়ন বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তিনি কিম জং উনের সাথে বৈঠক করতে চান না। কাজেই এতদিন যেসব শান্তি আলোচনা হয়েছে সেগুলো তাহলে নিরর্থক হয়ে যাবে।’ ইয়ং জানান, তিনি খবরটি শোনার সাথে সাথে টিভির সামনেই কেঁদে ফেলেছেন।

ইয়ন বলেন, ‘আমার জন্ম উত্তর কোরিয়ায়। এখন বসবাস করছি দক্ষিণের জাতীয়তা নিয়ে। এই দুটি দেশই আমার পৃথিবী। তাই চাই সর্বোচ্চ সমাধান। আমি পালিয়ে এসেছি ১০ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো উত্তরের জীবন নিয়ে ভাবি, সেখানে ফেলে আসা আত্মীয় বন্ধুদের সাথে আবার মিলিত হতে চাই।’ ইয়নের মতো আরো অনেকে ট্রাম্প-কিম বৈঠকের খবরের পর আশার বীজ বুনেছিলেন। তারা চান দুই কোরিয়ার ঐক্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট পোর্টাল নাভের-এ এক ব্যবহারকারী হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, আমি জানতাম এমনটিই হবে। তিনি কখনো চাইবেন না যে আমাদের দুই দেশ এক হোক। তার ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা রয়েছে।’ আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘কেউ আর আপনাকে বিশ্বাস করে না, ট্রাম্প। শুধু কোরিয়া নয়, এর আগে আপনি ইরানের সাথেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। আপনি হয়তো নিজেকেও বিশ্বাস করেন না?’

তবে সর্বশেষ পরিস্থিতি উন্নতির পর অনেকে আবার আশার আলো খুঁজে পেতে চেষ্টা করছেন। একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আমরা ৬০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু কে যানে সেটি কবে হবে? হয়তো এই দুই শক্তিশালী নেতা দ্রুতই ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবেন।


আরো সংবাদ