১০ ডিসেম্বর ২০১৮

বিশ্বে এ ধরনের মন্ত্রী তিনিই প্রথম

ব্রিটেন
জ্যাকি প্রাইস - ছবি: সংগৃহীত

আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছে ব্রিটেন সরকার। বিশ্বে এটাই প্রথম আত্মহত্যা প্রতিরোধে মন্ত্রী নিয়োগের ঘটনা।

প্রতি বছর চার হাজার ৫০০ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ব্রিটেনে। বহু সংখ্যক মানুষকে আত্মহত্যার এই প্রবণতা থেকে ঠেকাতে মন্ত্রী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন সরকার। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জ্যাকি প্রাইসকে নতুন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন।

বিশ্বের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে লন্ডনে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা। ঠিক এমন সময়ে দেশটির পক্ষ থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে মন্ত্রী নিয়োগের ঘোষণা এলো।

মন্ত্রী নিয়োগের পাশাপাশি বিনামূল্যে মানসিক চিকিৎসা সেবা দিতে অর্থও বরাদ্দ করেছে থেরেসা মের সরকার। মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া অলাভজনক এক সংগঠনকে ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ২০ কোটি টাকার সমান। আগামী চার বছর ওই অর্থে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেবে সংগঠনটি।

২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে কম বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পায় ৬৭ ভাগ। নতুন ঘোষণায় থেরেসা মের সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে নতুন টিম গঠন করে প্রতিটি স্কুলে পাঠানো হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং তাদের মানসিক অবস্থার উন্নয়নে পরামর্শ দেবে তারা।

প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, যে বাস্তবতা নীরবে মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে রাখে আর আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়, আমরা সেই বাস্তবতার অবসান ঘটাতে চাই।

আরো পড়ুন :
বাংলাদেশে দৈনিক আত্মহত্যা করে ৩ জন, বছরে মারা যায় ১১ হাজার
হামিম উল কবির, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। সারা বিশে^ বছরে আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। বাংলাদেশেও আত্মহত্যার ঘটনা কম নয়। ২০১৭ সালের পুলিশ প্রতিবেদন মতে, দেশে বছরে ১১ হাজার ৯৫ জন লোক আত্মহত্যা করে মারা যায়। আর প্রতিদিন তিনজন আত্মহত্যা করেছে ২০১৭ সালে। রিপোর্ট বলছে, প্রতি বছরই দেশে আত্মহত্যার হার বাড়ছে। এ দেশে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করছে বিষ (কীটনাশক জাতীয়) পানে। গত বছর বিষপানে আত্মহত্যার এ সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৪৬৭। এরপরই রয়েছে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার হার। গত বছর ৫৬৯টি এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে দৈনিক ২৮ জন আত্মহত্যা করে থাকে। বছরে ১০ হাজার মানুষ বিষ খেয়ে অথবা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করছে বাংলাদেশে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে বছরে ১৯ হাজার ৬৯৭ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশের ৬৫ লাখ মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০১৬ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্য ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এর ৭৯ শতাংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে হয়। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বিষপান, ফাঁসি অথবা আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, মাদকাসক্তি, সারাক্ষণ যারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভোগে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। তাদের মধ্যে আশাহীনতার সৃষ্টি হয়ে থাকে তীব্রভাবে। দুনিয়ার সব কিছু তারা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যেতে থাকলে এক সময় মুক্তির উপায় হিসেবে নিজেকে শেষ করে দেয় নিজের জীবন নিজের হাতে নিয়ে। এ ছাড়াও অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলেও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের গবেষণা অনুসারে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। প্রতি লাখে ৭.৩ জন আত্মহত্যা করছে। বয়স, লিঙ্গ, পেশা এবং ভৌগোলিক অবস্থান ভেদে আট লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ জনের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে তারা এ তথ্য পেয়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামে আত্মহত্যার হার ১৭ গুণ বেশি। গ্রামে যারা আত্মহত্যা করে তাদের বেশির ভাগ অশিক্ষিত ও দরিদ্র। অপর দিকে পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আত্মহত্যায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ১০ থেকে ১৯ বছরের বয়সী মেয়েরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সংস্থাটি আত্মহত্যা প্রতিরোধ করার জন্য কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো- কীটনাশক (বিষ), আগ্নেয়াস্ত্র এবং কিছু ওষুধ প্রাপ্তিতে কড়াকড়ি আরোপ করা, মাদক ব্যবহার নীতি কঠোর করা, মানসিক বিষাদগ্রস্ত রোগ, ক্রনিক পেইন (দীর্ঘ মেয়াদি ব্যথা) ইত্যাদি সমস্যায় আগেভাগেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিশেষজ্ঞ ছাড়াও অন্যান্য শ্রেণীর মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যে তারা আত্মহত্যা প্রবণতা কমিয়ে আনার ব্যবস্থাপনার কৌশল রপ্ত করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বেই ১০ শতাংশ আত্মহত্যা রোধ করতে অ্যাকশন প্লান নিয়ে কাজ করে আসছে ২০১৩ থেকেই।

মহারাষ্ট্রে ৩ মাসে ৬ শতাধিক কৃষকের আত্মহত্যা
এনডিটিভি, ১৬ জুলাই ২০১
ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজস্বমন্ত্রী চন্দ্রকান্ত পাতিল জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ওই রাজ্যে তিন মাসে ছয় শতাধিক কৃষক আত্মহত্যা করেছে। বিজেপি শাসিত ওই রাজ্যের বিধান সভায় বিরোধী দলীয় বিধায়কের এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি। এ রাজ্যে কৃষকদের আত্মহত্যা প্রবণতা সব থেকে বেশি। ক’দিন আগে দাবি আদায়ের মিছিলে নেমেছিলেন মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা। মুম্বাইয়ের উদ্দেশে তাদের ডাকা লং মার্চে সংহতি জানিয়েছিল সারা ভারতের কৃষকসহ সচেতন জনতা।

সারা বিশ্বেই কৃষকরা বিপন্ন। তবে ভারতে এই বিপন্নতা অন্য অনেকের চেয়েই গভীর। ক্ষুদ্র কৃষকেরা সেখানে বাস করছেন দুর্যোগের কিনারায়। মহারাষ্ট্র সেই বিপন্নতার এক জীবন্ত দলিল। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও সংবাদমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র খরা, বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা, করপোরেট বাজার ব্যবস্থার উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে টিকতে না পারায় সেখানে আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয় কৃষক। মহারাষ্ট্রে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি কৃষক দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যকর নীতি-পরিকল্পনার অভাব থাকার কারণেই সেখানে ক্রমাগত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন কৃষকরা। তাদের মতে, দশকের পর দশক ধরে ঋণের বোঝা থাকা, খরা ও আয় কমে যাওয়া ভারতের গ্রামাঞ্চলে কঠোর প্রভাব ফেলেছে। রাজ্য বিধান পরিষদে বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পাতিল শনিবার জানিয়েছেন, ‘১ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মহারাষ্ট্রে ৬৩৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। সরকারী বিবেচনায় ফসল নষ্ট, ঋণ ও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার ভিত্তিতে এদের মধ্যে ১৮৮ জনের পরিবারকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে।’ পাতিল জানান, ‘আত্মহত্যা করা ১৮৮ কৃষকের মধ্যে ১৭৪ জনের পরিবার এরই মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে।’ তিনি জানিয়েছেন, আত্মহত্যাকারী ৩২৯ কৃষকের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে আর ১২২ জনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

বিরোধী নেতা ধনঞ্জয় মুণ্ডে রাজ্য বিজেপি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেছেন, ঋণ মাফ, ফলন না হওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ, শস্য ঋণ বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের মতো সরকার পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হওয়ার কারণেই কৃষকেরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিজেপি সরকারের নির্লিপ্ত আচরণ এবং মিথ্যা আশ্বাস কৃষকদের আত্মহত্যার দিকে বার বার ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী নেতারা। মুন্ডে অভিযোগ করেছেন, গত ৪ বছরে রাজ্যে ১৩ হাজার কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু গত এক বছরেই ১৫০০জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।

এ বছর মার্চ মাসেই কৃষক বিক্ষোভে শুধু মহারাষ্ট্রই নয়, কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশই। কৃষকরা এক সপ্তাহ ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হেঁটে এসে অবস্থান করেছিলেন মুম্বাইয়ে। ১০ হাজার কৃষক নিজেদের দাবি দাওয়া নিয়ে পথ হাঁটা শুরু করেছিলেন। সেই মিছিল যখন অবশেষে মুম্বাইয়ে এসে পৌঁছেছিল তার সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ৪০ হাজার।

চাকচিক্যের মুম্বাই শহরের এই অগণিত মানুষ তাই পুষ্পবৃষ্টিতে সাদর অভ্যর্থনা জানায় তাদের। তৃষ্ণা আর অভুক্ত জীবনের ধারাবাহিকতা ঘোচে ছাত্রদের তুলে দেয়া পানি কিংবা বিস্কুটের প্যাকেটে। কৃষকদের নিদারুণ অবস্থা বিজেপি সরকারকে সেদিন বেশ বেকায়দায় ফেলেছিল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ জানিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ কৃষি ঋণ মওকুফ, এম এস স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন, বনাঞ্চলের অধিকার প্রশ্নে কৃষকদের সব দাবিই তার সরকার মেনে নেবে। তা সত্ত্বেও সেই মার্চ থেকে মে পর্যন্ত কৃষক আত্মহত্যার এমন ভয়াবহচিত্র।


আরো সংবাদ