১২ নভেম্বর ২০১৯
এরদোগানের সিনিয়র উপদেষ্টা গুলনুর আইবেতের সাক্ষাৎকার

‘তুরস্ক নিয়ে ইউরোপীয়রা দ্বিধায়, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ভুলে ভরা’

গুলনুর আইবেত - ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি তুরস্ক উত্তর-পশ্চিম সিরিয়া সীমান্তে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ নামে অভিযান চালিয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ডোনাল্ট ট্রাম্প যখন সিরিয়া থেকে তার সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন ঠিক তখন কেনো তুরস্কের এই অভিযান? তুরস্ক বলছে, তাদের সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে এবং সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতেই এই অভিযান। পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রশ্ন, এই অভিযানের ফলে আগে বন্দী দায়েশ যোদ্ধাদের কী পরিণতি হবে? তাদের আশঙ্কা, এ অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে, তুরস্কের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা গুলনুর আইবেতের সাথে কথা বলেছেন তুরস্কের সরকারি টেলিভিশন টিআরটি ওয়ার্ল্ডের ‘ওয়ান অন ওয়ান’ সাক্ষাৎকার সিরিজের উপস্থাপিকা আয়ছাআয়দোউদু। সাক্ষাৎকারটি মূল ইংরেজি থেকে নয়া দিগন্তের জন্য অনুবাদ করেছেন মিজান রহমান

আয়ছাআয়দোউদু : আপনি জানেন, সম্প্রতি তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে তুরস্কের অভিযান নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। এই শান্তিপূর্ণ অভিযান বিষয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ভুল তথ্যও উপস্থাপিত হচ্ছে। আপনি প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, কেনো হঠাৎ এই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো?

গুলনুর আইবেত : ওয়েল। আসলে এটা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। আমরা অনেক দিন ধরেই অত্যন্ত সতর্ক। এই অঞ্চলের সমস্যা নিয়ে আদৌ কারো সঙ্গতিপূর্ণ নীতি আছে বলে মনে হয় না, কিন্তু আমাদের আছে। আমাদের সীমান্তে সন্ত্রাসীদের কোনো করিডর থাকুক আমরা সেটা চাই না। ওয়াইপিজি এই অঞ্চলে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার সুযোগে ভূমি দখল করার চেষ্টা করছে। ওয়াইপিজি এবং পিকেকে তো একই দলভুক্ত। দুর্ভাগ্যবশত যুক্তরাষ্ট্র আইসিস দমনের নামে এদের অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। সিরিয়া যুদ্ধের সুযোগে এরা সিরিয়ার ভূমি দখল থেকে শুরু করে সিরিয়ার মানচিত্র এবং জনমিতি বদলে ফেলার চেষ্টা করছে। ফলে এই অভিযান আসলে অনিবার্য ছিল। আমরা আমাদের সীমান্তে সন্ত্রাসবাদকে কখনো সমর্থন করব না। আপনি জানেন, আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বহু দিন থেকে লড়ে যাচ্ছি। ১৯৮৪ সাল থেকে পিকেকের বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হচ্ছে। তখন থেকে এই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী হাজার হাজার নিরীহ মানুষ এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যকেও হত্যা করেছে।

আয়ছাআয়দোউদু : আমরা জানি যে, সীমান্তে এটিই তুরস্কের প্রথম অভিযান নয়। এছাড়া এই অভিযানের সময়, পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধানের বিষয় সবকিছু প্রকাশ্যেই জানানো হচ্ছিল। একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা এবং সীমান্তকে সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ করা তুরস্কের উদ্দেশ্য। তবু কেনো বলা হচ্ছে হঠাৎ করেই তুরস্ক এ কাজ করেছে, কেনো তুরস্কের বাইরে ভুল ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে?

গুলনুর আইবেত : তুরস্কের এই ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ নিয়ে তুরস্কের বাইরের মানুষ বেশ দ্বিধাগ্রস্ত। পশ্চিমা গণমাধ্যমকে অনেক ভুল তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছে, তুরস্কে কেনো হঠাৎ এই অভিযান চালানো হলো? কিন্তু আমি পশ্চিমা মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের নিবন্ধে দেখেছি, অনেকেই গভীরভাবে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম এসব বিশ্লেষণের দিকে না তাকিয়ে এ অঞ্চলের সন্ত্রাসী সংগঠনের অপপ্রচারের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।

আয়ছাআয়দোউদু: আপনি পিকেকে নিয়ে বলছিলেন। পিকেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় অনেক দেশ কর্তৃক স্বীকৃত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন কিন্তু ওয়াইপিজি যেখানে পিকেকেরই আরেক রূপ তখন তারা ওয়াইপিজেকে আলাদা করছে কেনো?

গুলনুর আইবেত : আমরা জানি, পশ্চিমা দুনিয়া এ বিষয়ে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর থেকে একটি বিবৃতিতে তারা স্বীকার করেছে- এ অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিস্তার তুরস্কের নিরাপত্তা বিঘিœত করছে। তারা আরো স্বীকার করেছে যে, পিকেকে এবং ওয়াইপিজি একই সন্ত্রাসী সংগঠন এবং ওয়াইপিজি সিরিয়া সরকারের মদদপুষ্ট। তারা তুরস্কের অনেক নাগরিককে হত্যা করেছে। সিনেটের একটি শুনানিতে এ বিষয়ে এক সদস্যকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, এটা আমরা জানি তারা গভীরভাবে সম্পর্ক রাখে। তবুও তারা ওয়াইপিজিকে পিকেকের মতো সন্ত্রাসী হিসেবে সাব্যস্ত করছে না। আমেরিকার জনগণের দোহাই দিয়ে মিত্র শক্তিকে সহযোগিতার নামে এবং আইসিস দমনের নামে তারা একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। শুরুতে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সিরিয়া এখন এই গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আর এরা অনেক মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করে সিরিয়ার জনমিতি বদলে দিয়েছে। আমেরিকা বা সেন্টকম তাদের অস্ত্র সরবরাহ করছে। অবস্থা একটা দুঃস্বপ্নের মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এর কারণ, আমেরিকার প্রশাসন দ্বিধাগ্রস্ত। তারা জানে না তাদের কী করা উচিত। তারা তাদের মিত্র শক্তিকে সহযোগিতার নামে একটি সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে কিন্তু তাদের ন্যাটোর মিত্র তুরস্কের কথা ভাবছে না। আপনি দেখবেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম এখন অভিযোগ করছে তুরস্ক নাকি সিরিয়ার জনমিতি ও মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। কিন্তু না। বরং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোই এতদিন সেই জনমিতি বদলে ফেলেছে। তুরস্ক বরং তা সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে। তারা অনেক আরব, তুর্কি এবং খ্রিষ্টান জনগণকে হত্যা করেছে। সিরিয়ার খ্রিষ্টান অর্থোডক্স ফাউন্ডেশন একটি বিবৃতি দিয়েছে যে, ওয়াইপিজি তাদের দেশত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা শিশুদের জোরপূর্বক সন্ত্রাসী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করছে। অথচ আমেরিকা ওয়াইপিজিকে ভাবছে একটি সুন্দর, নারীবান্ধব, ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন। না, এগুলো বাজে কথা। কারণ, আমরা জানি, তারা কী করছে, তারা কে। পশ্চিমা গণমাধ্যম তুরস্ককে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু আমরা জানি আমরা কী করছি।

আয়ছাআয়দোউদু : এখন আমরা জানি যে, তুরস্ক অনেক দিন ধরে নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক এবং দায়েশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এবং তুরস্ক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে আসছে। তবু কেনো তাদের এমন অবস্থান?

গুলনুর আইবেত : ঠিক তাই। কিন্তু তারা মনে হয় অন্ধকারে ডুবে আছে। আমরা যখন উত্তর সিরিয়ায় দায়েশের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই এ বিষয়ে যেন পশ্চিমা বিশ^ কিছুই জানে না। তারা কোনো গবেষণা করছে না। তারা তুরস্ক বিষয়ে পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করে কথা বলছে। অথচ এ অঞ্চলে আমরাই একমাত্র দেশ যারা দায়েশের বিরুদ্ধে লড়েছি, তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি বিমানবন্দর এবং অন্যান্য জায়গায়।

আয়ছাআয়দোউদু : আমরা বর্তমান অভিযান বিষয়ে ফিরে আসি। এই অভিযান যেহেতু শান্তিপূর্ণ, তো এই অভিযানের ফলে ঝুঁকি এড়ানো, ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠাসহ অভিযানের বর্তমান অবস্থা কী?

গুলনুর আইবেত : অভিযান অত্যন্ত সাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা সীমান্তে প্রধান প্রধান শহরগুলোর নিরাপত্তার দিকে লক্ষ্য রাখছি। আমরা দুটি প্রধান শহরে পনেরোটি গ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি আমাদের সাথে কাজ করছে। যেহেতু বড় বড় অঞ্চল সন্ত্রাসীদের দখলে ফলে কাজটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমরা দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছি। এর পরও পশ্চিমা গণমাধ্যম হয়তো এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। কারণ তারা এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানে না। কিন্তু অভিযানের ক্ষেত্র এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ৩০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত সীমান্তে অঞ্চলে এ অভিযান চলবে। ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে তা বিস্তৃত হবে। এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে টেলিফোন আলাপেও আলোচনা হয়েছে। আমরা দেখিয়েছি, এই অঞ্চলে রয়েছে আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি।

আয়ছাআয়দোউদু : আমরা যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছি, যা ২০১১ সাল থেকে চলছে। এই যুদ্ধে তুরস্কের কূটনৈতিক চ্যানেল কতটা ব্যবহৃত হয়েছে?

গুলনুর আইবেত : আমরা সবাইকে জানিয়েছি। আমরা আমাদের মিত্রদের সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে আমাদের সীমান্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা মানবিজে আমেরিকার সাথে একত্রে কাজ করেছি। তারা আমাদের কাছে অঙ্গীকার করেছিল যে, মানবিজ থেকে ওয়াইপিজিকে প্রত্যাহার করতে ভূমিকা রাখবে। তারা নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ওয়াইপিজিকে প্রত্যাহারের যে অঙ্গীকার তারা করেছিল তা দ্রুত এগোচ্ছে না। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে আমাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে। আমরা যা করছি এর পাশাপাশি আমরা মিত্রদের সাথেও কাজ করতে চাই। কিন্তু তারা যদি সৎ এবং আন্তরিক না হয় তাহলে আমরা কী করতে পারি? দেখুন ইউরোপীয়রাও সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর দিকে সহানুভূতি দেখাচ্ছে, কিন্তু তাদের ন্যাটো মিত্রের প্রতি তা দেখাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ আমরা সাধারণ মানুষদের উচ্ছেদ করছি, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছি, এটা সত্য নয়। কারণ এ ধরনের অভিযানে আমাদের কিছু পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের জোটের অন্য সদস্যদের কথা মাথায় রেখে আমরা বলতে পারি, সাধারণ বন্দীদের এবং আইসিসের বন্দী যোদ্ধাদের নিরাপত্তা বিধানে আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। এটা আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমি বিবিসিতে দেখলাম, একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বলছেন, ‘ওয়াইপিজি আইসিসের বন্দী যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এটা ছিল একটা সাময়িক সমাধান। কিন্তু মধ্যমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে আমাদের চুক্তিতে যেতে হবে।’ ইউরোপীয়দের আইসিস যোদ্ধাদের তাদের দেশে ফেরত নিতে হবে। কিন্তু তারা ফেরত নিতে চায় না। এখন তুরস্ক তো তাদের জোর করে পাঠাতে পারে না। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। কিন্তু আমরা সাময়িক নয়, মধ্যমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাই।

আয়ছাআয়দোউদু : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পর্যবেক্ষক দল বেশ কিছু দিন থেকে উপস্থাপিত নানা রকম ভুল তথ্যের কারণে বিভ্রান্তির ভেতর রয়েছে। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

গুলনুর আইবেত: আপনি জানেন যে, আমাদের অভিযানের ক্ষেত্রটি অনেক স্পষ্ট। আইনাল আরবসহ আমাদের উদ্দিষ্ট অঞ্চলে সতর্ক অভিযান চালিয়েছি। আমরা আমাদের সীমান্তের মধ্যাঞ্চল থেকে অভিযান শুরু করেছি। কারণ ওয়াইপিজি, পিকেকের মূল ঘাঁটি এদিকেই। তারা আমাদের সীমান্ত শহরে গুলি করেছে এবং বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অন্যান্য স্থানেও আমরা অভিযান চালাচ্ছি। কারণ, পিকেকে সীমান্তে বিস্ফোরণের মাধ্যমে নয় মাসের শিশুসহ বহু মানুষকে হত্যা করেছে। তারা সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে গুলি করেছে। তুরস্কের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহরে তারা নির্বিচারে হামলা করেছে। কিন্তু আমরা নির্বিচারে হামলা করছি না। আমরা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্যান্য দেশের পর্যবেক্ষক কিংবা তাদের সৈন্য কোথায় আছে, তারা যেন কোনো আক্রমণের স্বীকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখছি। কিছু গোলা বিস্ফোরণ তাদের আশেপাশে হতে পারে কিন্তু তুরস্ক তাদের লক্ষ্য করে কোনো হামলা করছে না। আমরা ওয়াইপিজিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছি। এখন ওয়াইপিজি কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত মিত্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাদের সেনাদের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না রাখা।

আয়ছাআয়দোউদু: আপনি বলছিলেন সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নির্বিচারে হামলার কথা। তাদের দ্বারা মার্কিন সেনাদের ওপরও হামলা হয়েছে।

গুলনুর আইবেত : ঠিক তাই। আমরা কিন্তু অতি সাবধানে অভিযান পরিচালনা করছি যেন সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি না হয়। কিন্তু আমি আগেই উল্লেখ করেছি জোটের অন্যরা এ বিষয়ে যতœবান নয়। আমরা জানি কীভাবে আইসিসের সাথে আলোচনা করতে হয়। দেখুন রাকায় ওয়াইপিজি কী করেছে। তারা আইসিস যোদ্ধাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে আমেরিকার সাথে একটা সম্পূর্ণ চুক্তি করে ফেলেছে, যা রাকা থেকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ উচ্ছেদ করতে সহযোগিতা করেছে। বিবিসির প্রতিবেদনেও এটি এসেছে। আমরা জানি, কীভাবে আলোচনা করতে হয়, কিন্তু ওয়াইপিজি তা জানে না। বরং তারা পশ্চিমা গণমাধ্যমে অপপ্রচার ছড়াতে ব্যস্ত। তারা প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারাই কেবল এ অঞ্চলে দায়েশের সাথে মোকাবেলা করতে পারে। আচ্ছা, দায়েশের সাথে মোকাবেলা করার মতো কেউ নেই অথচ ন্যাটোতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেনা রয়েছে তুরস্কের। কে তাদের এই বাজে কথা বিশ^াস করবে? কিন্তু তারা বারবার এই অপপ্রচার করেই যাচ্ছে আর দুর্ভাগ্যবশত মানুষ তা বিশ^াস করছে। সাধারণ জনগণের ক্ষতির ব্যাপারে আমরা সতর্ক কিন্তু ওয়াইপিজি সাধারণ জনগণ অধ্যুষিত এলাকাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। আর সাধারণ জনগণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদেরে ক্ষতির মুখে ফেলে দিচ্ছে এবং অপপ্রচার করছে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ওয়াইপিজির কিছু ভিডিও আপনি লক্ষ করবেন, যেখানে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর দৃশ্য দেখানো হচ্ছে কিন্তু সেগুলো সাজানো এবং ভুল তথ্যে ভরা। এটা দুর্ভাগ্য যে, কিছু মানুষ গুলির মুখে পড়ছে। খারাপ কিছু ঘটতে পারে কিন্তু আমরা অত্যন্ত সতর্ক এবং খারাপ কিছু এড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা সতর্ক আছি যেন মানুষের জীবন হুমকির মুখে না পড়ে।

আয়ছাআয়দোউদু : ডোনাল্ড ট্রাম্পও একটি বিষয়ে সমালোচনা করেছেন। সেটি হলো, ইউরোপ থেকে আসা আইসিস যোদ্ধাদের ফিরিয়ে নিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহা। আসলে কতগুলো যোদ্ধা এখন ওয়াইপিজি কিংবা তাদের আওতার বাইরে রয়েছে? এ বিষয়ে সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

গুলনুর আইবেত : আমরা অনুমান করছি ওয়াইপিজির নিয়ন্ত্রণাধীন দুই হাজার এবং এর বাইরে ১০ হাজারের মতো আইসিস যোদ্ধা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক নারী ও শিশুও রয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের আওতাধীন কোনো এলাকায় নয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত এখন তাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়া। স্থায়ীভাবে তাদের ফেলে রাখা কখনোই উচিত হবে না।

আয়ছাআয়দোউদু : ওয়েল। আমরা সবশেষ প্রশ্নে আসি। আপনি যেমনটি বলেছেন, অভিযানের লক্ষ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানও নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এটি স্পষ্ট করে বলেছেন, সিরিয়ার লাখ লাখ মানুষের জন্য একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা। এটি একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সামনে আর কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন?

গুলনুর আইবেত : আমাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো সন্ত্রাসী সংগঠন ওয়াইপিজি কর্তৃক অধিকৃত অঞ্চল নিরাপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বন্দিশালায় বন্দী আইসিস যোদ্ধাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো: অনিরাপদ অঞ্চলগুলোতে যারা বিভিন্ন বাড়ির মালিক ছিল তাদের ফিরিয়ে আনা। আমরা জানি, ওয়াইপিজি অনেক তুর্কি ও আরব গ্রাম ধ্বংস করেছে। এটা আমাদের ধারণকৃত তথ্য নয়। আ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসঙ্ঘের কাছে এ বিষয়ে তথ্য প্রতিবেদন রয়েছে। তো তাদের ফিরিয়ে আনার সাথে সাথে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণও একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের কাছে সে হিসাব এবং পরিকল্পনা আছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও নজর দেয়া জরুরি, যেন উদ্বাস্তুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। কারণ তুরস্কে আমরা চার মিলিয়ন উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছি।

আয়ছাআয়দোউদু : সিরিয়ান উদ্বাস্তু বিষয়ে ইউরোপও তো তাদের অঙ্গীকার সেভাবে রক্ষা করেনি।

গুলনুর আইবেত : হ্যাঁ। এখন আমরা দীর্ঘদিন এ সমস্যা বয়ে বেড়াতে পারব না। এটা নিয়ে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী আলোচনায় যাওয়াও উচিত হবে না। (উটপাখির মতো) বালির নিচে মাথা গুঁজে থাকা আচরণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের। তারা মনে করে, ও, তুরস্কে অনেক উদ্বাস্তু, চলুন তাদের কিছু সহযোগিতা দিই, সমস্যাটা থেকে যাক, উত্তর সিরিয়া নিয়ে তাদের সহযোগিতার কোনো দরকার নেই বরং চলুন উত্তর সিরিয়ায় তাদের অভিযান নিয়ে ঘৃণা ছড়াই। আমি দুঃখিত, এটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহের বিষয় নয় কিন্তু তাদের নীতিও কোনো প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি নয়। কারণ এই সমস্যা নিয়ে কেউ বসে থাকতে পারে না। তুরস্ক ছাড়া এই সমস্যা নিরসনে কেউ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। আমেরিকার নীতি ভুলে ভরা। তারা এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দমনের নামে আরেক সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে, ইউরোপীয়দের অবস্থাও একই। আমরা চাই ইউরোপীয়রা জেগে উঠুক। তারা বলুক, চলুন আমরা উত্তর সিরিয়ার জনগণের পুনর্বাসনের জন্য কিছু করি। কিন্তু তা না করে তারা সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তারা বলবে, তুরস্ক সিরিয়ায় অযৌক্তিক অভিযান চালাচ্ছে, তারা সিরিয়ার জনমিতি বদলে দিচ্ছে, তাদের এই অভিযান বন্ধ করা উচিত। অথচ সন্ত্রাসীরা কী করছে এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই। এ অঞ্চলের গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। কত মানুষ আইসিস এবং ওয়াইপিজির ভয়ে পালিয়ে গেছে তাদের আমরা খুঁজেই পাচ্ছি না। আমি বলব, আরব তুর্কিরা, কুর্দিরা, সিরিয়ান খ্রিষ্টান অর্থোডক্স যারা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে আমরা তাদের ফেরত আনতে চাই। আমি মনে করি, এটাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেগে ওঠার সময়। ওয়াইপিজি একটি ভালো সংগঠন, আমাদের উচিত তাদের সমর্থন দেয়া, এমন ভাবনার দিন শেষ। এই নীতিতে আর থাকার সুযোগ নেই তাদের। তাদের বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে। তাদের বুঝতে হবে ওয়াইপিজি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন যা তুরস্কের জন্য হুমকি আর সে কারণেই তুরস্ক নিজের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তুরস্ক ৪০ লাখ উদ্বাস্তুর বোঝা কাঁধে রাখতে চায় না।

আয়ছাআয়দোউদু : দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময়ও তো মানুষ তেমন উদ্বাস্তু হয়েছিল।

গুলনুর আইবেত : ঠিক তাই।
আয়ছাআয়দোউদু : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।


আরো সংবাদ