২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জোরদার হচ্ছে তুরস্ক-চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

জোরদার হচ্ছে তুরস্ক-চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক - সংগৃহীত

জোরদার হচ্ছে তুরস্ক-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তুরস্কের অর্থনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চীনের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসেছেন। ফলে তুরস্কের চলমান সঙ্কট কাটিয়ে উঠার সম্ভাবনা বেড়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে জ্যাক মা এর নেতৃত্বে কাজ শুরু করেছে চীনের সবচেয়ে ধনী ৫৯ জন ব্যবসায়ী। জ্যাক মা বিলিয়নিয়ার এবং আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান।

বিনিয়োগে আগ্রহী চীনা ব্যবসায়িরা তুরস্কে বিনিয়োগের জন্য নতুন সুযোগ সন্ধান করছে। তুরস্কের মধ্যে অংশীদারিত্ব এবং বিনিয়োগ সুযোগ খুঁজছে। বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে, তুরস্কের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত হবে।

তুরস্কের গণমাধ্যম জানায়, চীনের ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ তুরস্কে বিনিয়োগে আগ্রহী। বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ১৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার করে। তারা তুরস্কের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করছেন।  বেসরকারি ও সরকারি খাতে যৌথ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগের ব্যাপারে আলাপ করছেন।

এর আগে তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী ফতেহ ডানমাস বলেন, চীনের সহযোগিতায় তৃতীয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্পটি শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী তুরস্ক।

তুরস্কের প্রায় ৪০টি কোম্পানি চীনের আন্তর্জাতিক আমদানী মেলায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা  চীনের সাংহাইতে চলতি বছরের ৫ থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। এই মেলায় ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় দেড় লাখ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সুরক্ষায় তুরস্কের উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই টেলিফোনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর সাথে আলাপকালে বলেছেন- চীন মনে করে, তুরস্ক সাময়িক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে। ফোনালাপের সময় তুর্কি মন্ত্রী কাভুসোগলু তুরস্কের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান। তিনি বলেন, তার সরকার চীনের সাথে কৌশলগত যোগাযোগকে আরো শক্তিশালী করতে চায়।

তুরস্ক ইস্যুতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে তুরস্কের প্রতি  নৈতিক সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কং  বলেছেন, তুর্কি অর্থনীতির নতুন নীতি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি তাদের নজরে আছে। তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ধনশীল বাজার এবং এটি নিজে যেমন স্থিতিশীল রয়েছে তেমনি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার উন্নয়নে ভূমিকা রেখে লাভবান হচ্ছে। তুরস্কের স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক। চীন বিশ্বাস করে, অস্থায়ী অর্থনৈতিক অসুবিধা কাটিয়ে উঠার সক্ষমতা তুরস্কের আছে এবং সব পক্ষের সাথে সংলাপের মাধ্যমে চলমান সমস্যার সমাধান হবে। চীন আশা করে যে, সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো মিটিয়ে ফেলবে। চীন-তুরস্কের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও অর্থায়নে বেইজিং সব সময়ই গুরুত্বারোপ করে।

এ ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক চায়না তুরস্কের সঙ্গে ৩৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়ায় যে খবর বেরিয়েছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেইজিং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি সব সময় সমর্থন করেছে এবং বাজার নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন চুক্তি করছে।

অন্যদিকে, কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তুরস্কের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গত বুধবার দেশটিতে সরাসরি দেড় হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তুরস্ককে অর্থনৈতিক প্রকল্প, বিনিয়োগ এবং আমানতের প্যাকেজ হিসাবে কাতার এই অর্থ সরবরাহ করবে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারাতে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রজব তাইয়েব এরদোগানের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ ঘোষণা দেন কাতারের আমীর।

তুর্কি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন দুই নেতার বৈঠকের পর টুইটারে বলেছেন, ‘তুরস্কে সরাসরি দেড় হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কাতার। তুর্কি-কাতারি সম্পর্ক সত্যিকারের বন্ধুত্ব এবং সংহতির দৃঢ় ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।’ তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রেস অফিস বলেছে, তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে এরদোগান ও আল-থানি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেছেন। তুরস্কে অবস্থিত কাতারি দূতাবাসের কর্মকর্তা সালেম বিন মুবারক আল-শাফি বলেছেন, ‘কাতার সব সময় তার তুর্কি ভাইদের সমর্থনে সক্রিয়।’ তুর্কি প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকের পর বুধবার আল-থানি টুইটারে বলেছেন, ‘আমরা তুরস্ক ও আমাদের তুর্কি ভাইদের পাশে আছি, যারা কাতার ও উম্মার সমস্যায় পাশে আছে।’ এরদোগান টুইটারে বলেছেন, আল-থানির সাথে তার বৈঠক ছিল অত্যন্ত ‘কার্যকর ও ইতিবাচক’। তুরস্কের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাতারি আমির ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদও জানান।

তুরস্কে কারাবন্দী নিজেদের এক যাজককে হস্তান্তর না করা নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। যাজককে হস্তান্তর না করায় যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুন করে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা বেশকিছু পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় তুরস্ক। প্রতিশোধ হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াট ওক্তাই।

শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। এতে দেখা গেছে, গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২০ শতাংশ, মদের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৪০ শতাংশ ও তামাক পাতার শুল্ক করা হয়েছে ৬০ শতাংশ। এছাড়াও কসমেটিকস, চাল ও কয়লার ওপরও শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। তুরস্ক এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক পণ্য বর্জনের ঘোষণা দেয়।

তুরস্ক কারো হুমকির তোয়াক্কা করে না : এরদোগান
হুররিয়াত ডেইলি নিউজ, ০৩ আগস্ট ২০১৮

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, ‘তুরস্ক কারো হুমকির ভাষাকে তোয়াক্কা করে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে গ্রেফতার করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র হুমকিমূলক বিবৃতি দেয়ার পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি।

এরদোগান বলেন, ‘আমাদের হুমকি দিয়ে কেউ কোনো দিন কিছু অর্জন করতে পারেনি। আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতি সবচেয়ে বেশি সংহতি দেখিয়েছি। কোরিয়া যুদ্ধের সময়ও আমরা তাদের সাথে ছিলাম। তুরস্কের জন্য এ রকম অপমানজনক ভাষার হুমকিকে বিবেচনায় নেয়া ঠিক হবে না যেখানে আমরা ন্যাটোর প্রতি সর্বোচ্চটা দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করুন, কিন্তু এরপরও আমরা এমন হুমকিকে তোয়াক্কা করব না।’ ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে ঘিরে তুরস্ককে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতির পর গত বুধবার আঙ্কারায় এরদোগান সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা রাজ্য থেকে তুরস্কে এসেছিলেন এবং সেখানে দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে বসবাস করে আসছেন। তাকে কুর্দিস্থান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সাথে যোগাযোগ রার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সেই সাথে ফেতুল্লাপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন (ফেতুর) সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই সংগঠনকে আঙ্কারা ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে। ব্রুনসনকে তুরস্ক দীর্ঘ ২১ মাস আটক রাখার পর গত জুলাই মাস থেকে তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। তার মুক্তির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের সাথে বারবার যোগাযোগ করে আসছে।

এরই অংশ হিসেবে গত ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখার কারণে তুরস্ক বড়সড় নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।’ তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গত ৩০ জুলাই এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যে ভাষায় হুমকি দিয়েছে তা অসম্মানের এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই মন্ত্রীর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
এ দিকে বিবিসি জানিয়েছে, তুরস্কের দু’জন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি দুই বছর ধরে একজন মার্কিন ধর্মযাজককে আটক করে রেখেছে এমন অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপে নিয়েছে। ওই যাজকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করছে। বিতর্কিত এই ধর্মযাজক বর্তমানে তুরস্কে গৃহবন্দী রয়েছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই শত্রুতামূলক পদক্ষেপের জবাব দেয়া হবে। অবশ্য তুর্কি জনগণ এরই মধ্যে তুরস্কে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেয়ার ডাক দিয়েছে।

যদি সত্যিই ঘাঁটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে এই দুই ন্যাটো মিত্র দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা চরম হুমকির মুখে পড়বে। ১৯৭৪ সালে তুরস্ক উত্তর সাইপ্রাসে অভিযান চালানোর পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে এতটা অবনতি আর হয়নি।

এফ-৩৫ সরবরাহ বিলম্বের অনুমোদন
তা ছাড়া ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, তুরস্ককে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ না করে বরং আরো বিলম্বিত করার বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। সিনেটে ৮৭-১০ ভোটে এই অনুমোদন দেয়া হয়। যুদ্ধবিমানের সরবরাহ বিলম্বিত করার বিষয়ে অনুমোদন পাওয়ার কথা গত বুধবার মার্কিন সিনেট ঘোষণা করে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং নির্মিত প্রথম দু’টি যুদ্ধবিমান গত জুন মাসে তুরস্কের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ক্রয় করা ও মার্কিন নাগরিকদের আটকের কারণ দেখিয়ে এর আগে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট।

 


আরো সংবাদ