১৬ নভেম্বর ২০১৮

আমরা কখনো চাপের মুখে মাথা নত করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না : এরদোগান

আমরা কখনো চাপের মুখে মাথা নত করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না : এরদোগান - সংগৃহীত

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান আঙ্কারাতে এক ভাষণে বলেছেন, যারা চিন্তা করে যে, তুরস্কের ওপর উপহাসজনক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পার পেয়ে যাবে তাদের আমাদের দেশ এবং আমাদের জাতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। আমার কখনো এরকম চাপের মুখে আমাদের মাথা নত করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না।

এরদোগান বলেন, আমি আমার সরকারকে নির্দেশ দিয়েছি যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার তুরস্কে থাকা সম্পদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাদেরকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিচার এবং অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী’ বলে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। 

এরদোগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ধরণের প্রদক্ষেপ নিচ্ছে তা দুই দেশের কৌশলগত মিত্রতার পক্ষে ক্ষতিকর। তুরস্কের দুই মন্ত্রী যাদের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সম্পদ নেই, তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে মেনে নেয়া একেবারেই অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র যাজক ব্রানসনের পক্ষে সাফাই গাইছে যাকে তিনি ফেতুল্লাহ এবং কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টির সাথে যোগাযোগের দায়ে অভিযুক্ত এবং এই দুইটি সংগঠন তুরস্কে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে বিবেচিত। 

এরদোগান বলেন, ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং অন্যদিকে তিনি আঙ্গুরের স্বাদ যাতে উভয় পক্ষ নিতে পারে তার জন্য সহযোগী মনোভাব দেখাচ্ছেন। সবসময় সবখানে, আমরা রাজনীতির ‘জেতা জেতা’ পক্ষেই আছি থাকি’। আমরা আঙ্গুরের স্বাদ আস্বাদনের জন্য সকল প্রকার সহোযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমরা তাদেরকে সুযোগ দেব না যাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আঙ্গুর গাছের বেড়ে উঠায় হস্তক্ষেপ করা।

আমি একনায়ক নই, এটা আমার রক্তে নেই : এরদোগান

২৪ জুন ২০১৮

এরদোগান  আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা। সমর্থকরা তাকে দেশের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখে থাকেন। ‘সুলতান’ হিসেবে খ্যাত এরদোগানকে ইতোপূর্বে গাজী পার্কে কয়েক মাসের বিক্ষোভ সহ্য করতে হয়েছে। দা ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউটের তুরস্ক বিষয়ক গবেষক সোনার ক্যাগাপ্তে বলেন, এরদোগানের অর্থনৈতিক রেকর্ড এবং কর্তৃত্ববাদী মজলুম হিসেবে তার ইমেজই তাকে প্রেসিডেন্ট পদে জয় এনে দেবে। তবে গত বছর তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একনায়ক নই, এটা আমার রক্তে নেই।’

 ধর্মপরায়ণ তবে ক্যারিশমেটিক এরদোগান নির্বাচিত হয়ে ১৫ বছরের ক্ষমতাকে আরো সম্প্রসারিত করতে চান। বিজয়ী হলে তিনি হবেন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের পর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষমতাধর শাসক। এক দেড় দশকে তুরস্কের নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী নন্দিত তিনি। তুরস্কের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং ধর্মপরায়ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তার সৃদঢ় সমর্থন রয়েছে, যারা তার শাসনে উন্নতি লাভ করেছেন। তুরস্কে বিগত কয়েক দশকের ঘনঘন সামরিক অভ্যুত্থান এবং দুর্বল জোট সরকারের পর স্থিতিশীল সরকার উপহার দেয়ার জন্য এরদোগানের প্রশংসা করা হয়।

তিনি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর লাগাম টেনে ধরেছেন। নতুন ব্রিজ, বিমানবন্দর অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এক সময়ের তলাবিহীন তুরস্ককে শক্তিশালী বাজারে পরিণত করেছেন। তার শাসনামলে সাধারণ তুর্কিদের আয় তিনগুণ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরেছেন তিনি।

এক সময়ে আধা পেশাদার হিসেবে ফুটবল খেলোয়াড় এবং ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রিধারী এরদোগান ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি দেড় কোটি লোকের এ শহরটির ট্রাফিক জাম এবং বায়ু দূষণ রোধে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

যখন তার ইসলামঘেঁষা দলকে নিষিদ্ধ করা হয় তখন বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এ সময় একটি ইসলামী কবিতা পাঠ করেন। কবিতাটি ছিল এরকম- ‘মসজিদ আমাদের ব্যারাক, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়নেট এবং ঈমানদাররা আমাদের সৈনিক।’ এই কবিতার মধ্যে ধর্মীয় উসকানির গন্ধ পায় সেক্যুলার শাসকরা। তবে এরদোগান বারবারই এ কবিতা আবৃত্তি করেন।

২০০১ সালে এরদোগান এবং তার সহযোগী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ইসলামঘেঁষা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) গঠন করেন। পরের বছরের নির্বাচনে দলটি ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। এরপর আরো দুটি সংসদ নির্বাচনেও জয় পায় একেপি।

দেশবাসী বিশাল বিশাল নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তিনি বিরামহীন অংশ নেন। অসুস্থতাও তাকে থামাতে পারে না। নির্বাচনী প্রচারণার মাঝেই হয়তো স্থানীয় কোনো ফুটবল খেলায় মেতে ওঠেন তিনি।

তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করতে দেশে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুসলিম রাষ্ট্র তুরস্ককে সদস্যপদ দিতে গড়িমসি করায় ক্ষুব্ধ এরদোগান বলেন, ইইউর সদস্যপদের জন্য তুরস্ক অনাদিকাল অপেক্ষা করবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে এরদোগান তুরস্কে সেক্যুলারদের প্রবর্তিত হিজাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছেন। মদ বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন তিনি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছেলেমেয়েদের সহ-অবস্থান নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। এরদোগান বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে ইসলামিক সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্র একত্রে চলতে পারে না।’ তুর্কি নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই প্রধান ফ্যাক্টর।

তুরস্কের ইজিয়ান উপকূলের ইজমির বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাফেতে হিজাব পরিহিত একদল ছাত্র-ছাত্রী খোশগল্প করছিলেন এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে শিক্ষকের লেকচার নোটগুলি দেখে নিচ্ছিলেন। ১৫ বছর আগে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ক্ষমতায় আসার আগে এই দৃশ্যটি অকল্পনীয় ছিল। তুরস্কের পুরোনো ধর্মনিরপেক্ষ নিয়ম অনুযায়ী ক্যাম্পাসে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

তুরস্কের অনেক শহরের মতো ইজমিরও এরদোগানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বারা দৃশ্যত রূপান্তরিত হয়েছে। শহরের রাস্তাগুলোতে ইউরোপীয়-নির্মিত বিলাসবহুল ‘সেডান’ গাড়ির পাশাপাশি রাস্তাগুলোর পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বহুতল অফিস ভবন।

রবিবারের নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা হিসাবে এরদোগান এসব অর্জনকে কৃতিত্ব হিসেবে প্রচার করছেন। কিন্তু একটি ডেমোক্রেটিক প্রাচীরের মধ্যে চলতে ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। এক কারণে আসন্ন ভোট এরদোগানের জন্য অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে আর তা হচ্ছে দেশটির ক্রমবর্ধমান তরুণ ভোটাররা।

ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মার্ট ইলদিজ’-এর মতে, তুরস্কের ২৫ বছরের নিচে যুবক-যুবতীদের চারভাগের একভাগ কেবল এরদোগানকে সমর্থন করবে। প্রতিবছর দেশটিতে ১৮ বছর বয়সের ১০ লাখেরও বেশি ভোটার জাতীয় ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। যদিও, অন্যান্য দেশের মতো ভোট নিয়ে তুরস্কের বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের আগ্রহ কিছুটা কম।

এরদোগানের প্রতিদ্বন্দ্বিরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তরুণ ভোটাদেরকে চিহ্নিত করেছেন। প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে তাদের উদ্দেশ্যে একটি অ্যানিমেটেড ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এতে তরুণদের ভোটদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এবং পার্টির প্রধান কেমাল কিলিকদারোগ্লু বুধবার রাতে একটি টিভি সাক্ষাত্কারে এই আবেদনের পুনরাবৃত্তি করেন।

তুরস্কের যুবকদের ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি আকৃষ্ট করার এরদোগান একটি ‘ধার্মিক প্রজন্ম’ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। হিজাবকে তিনি এই প্রকল্পের কেন্দ্রীয় প্রতীকে পরিণত করেছেন। কিন্তু ইলদিজ বলছেন যে কম বয়সী এবং সবচেয়ে শিক্ষিত ভোটাররা ‘ধর্মীয় পরিচয়ের নীতি ভেঙ্গে ফেলছেন’।

ইস্তাম্বুলের পার্শ্ববর্তী কাসিমপাশায় জন্ম নেয়া এরদোগানের বাবা ছিলেন একজন কোস্টগার্ড কর্মকর্তা। কিশোর বয়সে রাস্তায় রুটি এবং লেবু বিক্রি করতেন এরদোগান। তরুণ বয়সে ইসলামিক ইয়ুথ সংগঠনে যোগদান করেন তিনি। এ সংগঠনটি তুরস্কের কট্টর সেক্যুলার নীতির বিরোধিতা করে। তুরস্কের ক্ষমতাধর জেনারেলরা মসজিদ ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি করে।


আরো সংবাদ