২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা মানবে না তুরস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা মানবে না তুরস্ক - সংগৃহীত

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসগ্লু বলেছেন,  ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অন্যায্য। কাজেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুরস্ক মানবে না। তুরস্কের এ সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল তুরস্ক সফর করেছেন। ওই প্রতিনিধি দলকে তুরস্কের এই অবস্থানের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি তুরস্ক নিষেধাজ্ঞা মানবে না। আমরা উপযুক্ত শর্তে ইরানের কাছ থেকে তেল কিনে থাকি। এর বাইরে অন্য কী অপশন রয়েছে? আমরা বলেছি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে আমরা ন্যায্য বলে মনে করি না।

গত ৮ মে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, তিনি ইরানের তেল বিক্রি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবেন। ট্রাম্প তার হুমকি বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সেরা শক্তি ইরান-তুরস্ক

০৪ জানুয়ারি ২০১৮

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তি তুরস্ক-ইরান সম্পর্ক এখন সহযোগিতার। সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ রচনায় দেশ দু’টি অত্যন্ত আগ্রহী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক বিভিন্ন সঙ্কট নিরসনে তেহরান-আঙ্কারা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করছে, যৌথ উদ্যোগে মনোযোগী হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় রচনা করছে প্রতিবেশী দেশ দু’টি। এমনকি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্যও একটি চুক্তি সই করেছে; ফলে দু’দেশের মধ্যে ব্যাংকিং সম্পর্ক আরো জোরদার হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অনেক চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে ইরান ও তুরস্কের সম্পর্ক এগিয়ে চলেছে। চলমান আঞ্চলিক সমস্যা ইরান ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারেনি এবং তেহরান-আঙ্কারার সম্পর্ক বাড়ানোর পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। কাতারের সাথে আরব বিশ্বের সাতটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা থেকে তুরস্ক-ইরানের দিকে ঝুঁকছে কাতার। কাতারের দুর্দিনে পাশে থেকেছে তুরস্ক। সমুদ্রপথে কাতারে খাবার পাঠিয়েছে ইরান। আরব বিশ্বের এরকম সিদ্ধান্তে কাতারের সঙ্গে ইরান ও তুরস্কের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছে।

তুরস্ক-ইরানের সম্পর্কের নতুন মেরুকরণের প্রমাণ- তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের ইরান সফর, ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যকে ভবিষ্যতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা, ইরাক ও সিরিয়ার ভৌগোলিক অখ-তা রক্ষার জন্য যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ, সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াই ও আঞ্চলিক সঙ্কট সমাধানে অভিন্ন নীতি, ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঠেকাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে একতা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বাত্মক উন্নয়ন ও অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কাতারের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধার লক্ষ্যে বিকল্প স্থল বাণিজ্যপথ তৈরি, সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদে শান্তির জন্য সঙ্কট নিরসনে সহযোগিতা করতে একমত হওয়া, পারস্পরিক মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে সংলাপের সদিচ্ছা, রাশিয়ার সঙ্গেও একসাথে কাজ করতে প্রস্তুতি গ্রহণ, কাতারে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো কর্তৃক অর্থনৈতিক অবরোধের ঘটনায় একই ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন ইত্যাদি।

ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী যুদ্ধ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিস্তারের ক্ষেত্রে ইরান ও তুরস্কের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ইরান-তুরস্ক সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যেও দু’দেশকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীতে ইরান ও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তুরস্কও সহযোগিতা ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায়; ইতোমধ্যেই তা প্রমাণিত হয়েছে। সুন্নি মতালম্বী কাতার ও শিয়া মতালম্বী ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব প্রশমিত হবে। তুরস্ক ব্যবসার স্বার্থে মধ্যস্থতা করায় তিন দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে সামরিক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। তুরস্ক-ইরান স্থলপথ চালুর ফলেই কাতার-বিরোধী অবরোধ ব্যর্থ হয়। কাতারকে একঘরে করার চেষ্টার কঠোর নিন্দা করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, কাতারের ওপর এই অবরোধ অমানবিক এবং অনৈসলামিক। তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা ইসলামী মূল্যোধের বিরোধী। এটা এটা কাতারকে মৃত্যুদন্ড দেবার সামিল।

তুরস্ক, ইরান ও কাতার যদি গ্যাস নিয়ে ভিন্ন চিন্তা করে তাহলে অনেকটাই চাপে পড়ে যাবে আরব বিশ্বের দেশগুলো। নানা দিক থেকেই ইরান-তুরস্ক-রাশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। ইরান-রাশিয়ার কৌশলগত সহযোগিতায় তুরস্ক যুক্ত হওয়ায় আমেরিকাও কিছুটা চিন্তিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ও তুরস্কের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং দু’দেশের মূল্যবোধ এক ও অভিন্ন। দুই দেশেই যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন সেসবের ঊর্ধ্বে উঠে ইরান ও তুরস্কের সম্পর্কের পথ চলা অব্যাহত রয়েছে। কারণ এ দুই জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও আত্মিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান হওয়ার পর দেশটির বৈধ সরকার ও জনগণের প্রতি ইরানের সমর্থন দেয়া থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে তুরস্ক ও ইরান অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বিস্তার সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ইরান ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকেই সব দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিকে ইরান ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশেরই অভিন্ন সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে।

আঞ্চলিক ইস্যু ছাড়াও বৈশ্বিক বা মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ইস্যুতে যৌথভাবে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে আঙ্কারা-তেহরান। সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের অসামরিকীকরণ জোনে ৫শ’ করে সামরিক পুলিশ মোতায়েনে সম্মত হয়েছে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান। আফগানিস্তানের বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করেছে চীন, ইরান ও তুরস্ক। রোহিঙ্গাদের রক্ষায় সিদ্ধান্ত জানায় ইরান-তুরস্ক-মালয়-ইন্দোনেশিয়া।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর হত্যা নির্যাতন বন্ধের বিষয়ে তুরস্ক-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, রোহিঙ্গাদের মতো নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ কালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে হতাশা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্যাতন হোক না কেন ইরান তা সহ্য করবে না।

সমরশক্তিতে প্রভাবশালী ইরান-তুরস্ক রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। তুরস্ক সরকার পাশ্চাত্য ঘেঁষা নীতি থেকে সরে এসেছেন। তেহরান ও আঙ্কারা মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার ঐক্য জোরদারের ক্ষেত্রে গঠনমূলক এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশাবাদী মুসলিম বিশ্ব। ইরান ও তুরস্ক দু’ দেশই বিশ্বাস করে- বিশ্বের যেকোনো দেশের জনগণ সেই দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, প্রতিটি দেশের ভৌগলিক অখ-তার প্রতি সম্মান করা উচিত, যুদ্ধ বন্ধ করা উচিত, উদ্বাস্তুদের জন্য ত্রাণ-সামগ্রী পাঠানো দরকার, আঞ্চলিক সমস্যা এ অঞ্চলের দেশগুলোকেই সমাধান করা দরকার। সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা ইরান-তুরস্ক মানবিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।


আরো সংবাদ