২১ নভেম্বর ২০১৮

তুরস্কের নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের সাবধানী প্রতিক্রিয়া

গত বছর জার্মানিতে জি-২০ সম্মেলনের সময় জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান - ফাইল ছবি

আবারো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে রজব তাইয়েব এরদোগান। রোববারের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে বিজয়ের পর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অভিনন্দন জানিয়েছেন এরদোগান ও তার দল একে পার্টিকে। অবশ্য পশ্চিমা দেশগুলো এক্ষেত্রে সাবধানী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। অনেকদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্বের সাথে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ) সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে তুরস্কের। ইতোপূর্বে এরদোগানের নির্বাহী ক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে গণভোটেও অনেক দেশ বিরোধীতা করেছেন। রোববারের নির্বাচনের পর অনেক দেশই কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি, কেউ বা জানিয়ে কৌশলি প্রতিক্রিয়া।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ের পর এরদোগানকে অভিনন্দন জানিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এই বিশাল বিজয় প্রমাণ করে এরদোগানের নেতৃত্বে ও জনগনের সমর্থনে তুরস্ক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে কতটা অগ্রগতি লাভ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের অবস্থান জোরদার করেছে। রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে একথা জানিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো ঘনিষ্ঠভাবে মস্কো ও আঙ্কারা এক সাথে কাজ করবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন পুতিন।
আরেক পরাশক্তি চীন ও অভিনন্দন জানিয়েছে এরদোগানকে। চীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, তুর্কি জনগনের মতামতকে সম্মান করে চীন। সেই সাথে অভিনন্দন জানায় এরদোগানকে। মুখপাত্র বলেন, ‘তুরস্কের সাথে সম্পর্ক চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাষ্ট্রনেতার নেতৃত্বে সকল ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা দ্রুত উন্নতি করছে। এর ফলে অনেক ইতিবাচক অজর্নও সম্ভবে হয়েছে’।

যুক্তরাষ্ট্র কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি তুরস্কের নির্বাচন ও একে পার্টির বিজয়ের বিষয়ে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি কৌশলি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এই ইস্যুতে। বার্তা  সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, বার্লিনে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেলের মুখপাত্র স্টেফেন সেইবার্ট বলেছেন, তুরস্কের নতুন সরকারের সাথে ‘গঠনমূলকভাবে’ কাজ করতে আগ্রহী জার্মানি। মুখপাত্র বলেন, আমরা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল সম্পর্কে অবগত হয়েছি। নতুন সরকারের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী।
তবে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য এরদোগান বা একে পার্টিকে অভিনন্দন জানায়নি দেশটি। স্টেফেন সেইবার্ট বলেন, যথোপযুক্ত সময়ে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে অভিনন্দন জানাবেন।

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেনও একই ধরণের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারাও সরাসরি অভিনন্দন জানায়নি এরদোগানকে। লুক্সেমবুর্গ সফরে থাকা ইউরোপ ও আমেরিকা বিষয়ক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্যার অ্যালান ডানকান বলেন, তুরস্কের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী ব্রিটেন। এই ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, গতকালের নির্বাচনের ফলাফলের পর তুরস্কের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রাখার বিষয়ে আগ্রহী এবং আমার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর যেভাবে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি, একই রকমভাবে কাজ করে যাব।

অবশ্য ব্রিটিশ সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো অভিনন্দন জানিয়েছে এরদোগানকে। ন্যাটো প্রধান জেন্স স্টলটেনবার্গ এরদোগানকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার যে ভিত্তির ওপর ন্যাটে গঠিত হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রসঙ্গত ন্যাটো জোটের অন্যতম সদস্য তুরস্ক। জোটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

এছাড়া ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্কের কুর্দি নেতার কারবরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সার্বিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি এরদোগানকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

আরো পড়ুন : এরদোগানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কেমন ভোট পেলেন
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন রজব তাইয়েব এরদোগান। সংবিধান অনুযায়ী তিনি অর্ধেকের বেশি ভোট পাওয়ায় প্রথম দফা নির্বাচন শেষেই তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

এই নির্বাচনে এরদোগান ছাড়াও আরো ছয়জন প্রার্থী লড়েছেন। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হতো যে, ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে পড়বেন এরদোগান। তার বিরুদ্ধে অন্তত দুইজন প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়ে তুলতে পারেন বলেও বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। নির্বাচনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বীতাই গড়তে পারেনি অন্য প্রার্থীরা। যে ছয়জন প্রার্থী ছিলেন তারা কেবল প্রচার প্রচারণাতেই এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু ব্যালট বাক্সে তাদের ভরাডুবি হয়েছে। তাদের মধ্যে কেবল একজনই বলার মতো ভোট পেয়েছেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্টির পার্লামেন্টারি দলের নেতা মুহারেম ইঞ্চ। তিনি ভোট পেয়েছে ত্রিশ শতাংশের কিছু বেশি। সংখ্যার হিসেবে তার ভোট এক কোটি তিপ্পান্ন লাখের কিছু বেশি। যেখানে এরদোগানের প্রাপ্ত ভোট দুই কোটি বাষট্টি লাখের বেশি।

আরেকজন আলোচিত প্রার্থী ছিলেন মেরাল আকসেনার। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী প্রার্থী। ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা না থাকলেও পশ্চিমা মিডয়ায় তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তার দলের নাম ‘ইই পার্টি’ যার ইংরেজি করলে নাম দাঁড়ায় গুড পার্টি। মেরালের দল রাজনীতিতে নতুন হলেও মেরালের এর আগে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৯৭ সালে আট মাস তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেরাল আকসেনার। কিন্তু তৃণমূল ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তা কেমন সেটা বোঝা গেল ভোটের ফলাফলে, মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তার অবস্থান ছয় প্রার্থীর মধ্যে চার নম্বরে। কিছু মিডয়া ভোটের আগে তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, মনে হয়েছে তিনি শক্তিশালী কোন প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। 
তৃতীয় অবস্থানে থাকা সেলাহদিন দেমিরতাস পেয়েছেন ৮ শতাংশের সামান্য কিছু ভোট। পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রার্থী তেমেল কারামোল্লাগলু পেয়েছেন এক শতাংশেরও কম ভোট। আর সর্বশেষ অবস্থানে থাকা প্রার্থীর ভোট শূন্য দশমিক দুই শতাংশ মাত্র।

অর্থাৎ অন্য পাঁচজন প্রার্থীর সবাই মিলে মিলে যে ভোট পেয়েছেন, তার চেয়ে প্রায় ২৬ লাখ ভোট বেশি পেয়েছেন একে পার্টির নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। তার মানে ভোটের আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শক্ত চ্যালেঞ্জের যে খবর পরিবেশন করা হয়েছিলো, বাস্তবে তার কোন দেখাই মিলেনি।

দেখুন:

আরো সংবাদ