০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

লড়াই ছাপিয়ে সম্প্রতি ও বন্ধুত্ব বাড়ায় কুস্তিখেলা

-

হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলায় শতবর্ষের প্রাচীন কুস্তি খেলা এখনো বেশ জনপ্রিয়। কুস্তি লড়াই উপলক্ষ্য মাত্র, লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে সম্প্রতি ও বন্ধুত্বের দৃঢ় বন্ধন। বর্ষাকালে হাওর এলাকার মাঠ-ঘাট ডুবে যায় জলে। কর্মজীবীরা তখন অলস সময়ে গান-নাচের আসর বসায়, কোথাও যাত্রাপালা আবার কোথাও কুস্তি খেলা। এরপর আবার হাওরে বোরো আবাদে নেমে পড়েন কৃষকেরা।

জেলার সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর- এই পাঁচ উপজেলায় কুস্তি খেলার প্রচলন বেশি। কুস্তি উপলক্ষে বিশেষ ব্যবস্থা নেয় স্বাগতিক গ্রাম। আষাঢ়-শ্রাবণ খেইড়ের (কুস্তি খেলার) সময়। কার্তিক শেষে সমাপ্তি। তাই মালদের (খেলায় যারা অংশ নেন) ডেকে নিয়ে আসেন গ্রামের মাতব্বররা। কীভাবে জয়লাভ করা যায় চলে সেই বুদ্ধি-পরামর্শ। তারপর আমন্ত্রণ জানানো হয় অন্য গ্রামের মালদের। বহুকাল ধরে এভাবে খেলা হচ্ছে গ্রামে গ্রামে। নিমন্ত্রিত হয় প্রতিপক্ষ গ্রামবাসী। করা হয় গরু জবাই। রাতের খাবার একসাথে সারে দুই পক্ষ। দূর গ্রাম থেকে বাবার বাড়িতে নাইয়র আসে মেয়েরা। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে খেলা দেখতে আসে হাজার হাজার দর্শক। পরাজিত হলেও আপ্যায়নে কমতি হয় না। এমনও হয়েছে জয়ী মালের সাথে বিয়ে হয়েছে পরাজিত গ্রামের কোনো ধনবান ব্যক্তির মেয়ের। অথচ সেই কুস্তিগিরের সহায়-সম্বল নেই।

জানা যায়, খেলা চলে সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তিনটি দলে মুখোমুখি হন খেলোয়াড়রা। সবার আগে উৎসাহী তরুণরা যাদের আদতে তেমন খ্যাতি নেই। পরে ছানি দাগারা মুখোমুখি হন। তারা দ্বিতীয় স্তরের খেলোয়াড়। ভবিষ্যতে ভালো খেলোয়াড় হবেন এমন সম্ভাবনা আছে। সব শেষে ক্লান্ত দর্শক, নিস্তেজ মাঠে টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দাগার মালরা। তারাই গ্রামের সেরা বাছাই কুস্তিগির। দাগার মালদের লড়াইয়ের ওপরই নিভর্র করে চূড়ান্ত জয়-পরাজয়।

মালদের নানা কৌশল থাকে। এগুলোকে তারা বলেন 'প্যাঁচ'। আঞ্চলিক ভাষায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্যাঁচ হলো, ঘারি মুছকা (দুই হাতে কোমর ধরে ফেলে দেয়া), বাইম্যা প্যাঁচ (বাইম মাছের প্যাঁচ), বাল্লা (পায়ে পায়ে লড়াই), আউকরা (গোড়ালি দিয়ে পেঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে ফেলে দেয়া), বস্তাটান (হঠাৎ বিপক্ষকে ঘাড়ের ওপর তুলে ফেলা) ইত্যাদি। কোনো কুস্তিগিরের হাঁটু, মাথা, কোমর, হাত, পিঠ বা বুক মাটিতে পড়ে যাওয়া মাত্র তিনি হেরে যাবেন।

জয়ী কুস্তিগিরের বন্দনা, তার গ্রাম ও গ্রামের মানুষের প্রশস্তি। বিজয়গাথার তালে তালে নাচে হাজারো দর্শক। আঞ্চলিক ভাষায় তারা হলো 'তামিশকির'। ঢোল, করতাল, মন্দিরায় কান পাতা দায়। তামিশকিরভক্তদের কাঁধে জয়ী খেলোয়াড়। শ্লোগানে মুখর মাঠ। দর্শকের কাঁধে মাঠ ঘুরে নেমে এলেন। পরনে রঙচঙে প্যান্ট, কোমরে গামছা। পুরো মাঠ দৌড়ালেন অভিনন্দনের জবাবে। হাতে উড়ছে গামছা বা রুমাল। তিনি মোল। ভক্তরা মালের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে টাকার মালা, কেউ বা অন্য উপহার। নিচু হয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছেন সমর্থনের প্রত্যুত্তরে সালাম।

জেলার শক্তিয়ারখলা গ্রামে কামাল হোসেন (এক সময়ের মাল) জানান, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কুস্তি খেলার মৌসুম। খেলার জন্য এক গ্রামের মানুষ আরেক গ্রামের মানুষকে দাওয়াত দেন বলে এর নাম ভাইয়াপি কুস্তি বা দাওয়াতি কুস্তি খেলা। দাওয়াতি গ্রামের লোকদের থাকা-খাওয়ার আয়োজন করে যে গ্রাম দাওয়াত করে তারা।

যারা খেলা পরিচালনা করেন তাদের বলা হয় আমিন। তিনজন আমিন খেলা পরিচালনা করেন।

কুস্তির নিয়মানুসারে মাঠের লড়াইকে ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে ব্যবহার নিষিদ্ধ। বিরোধ-হিংসা পুষে রাখা যাবে না।

সুনামগঞ্জের গ্রাম এলাকার ঐতিহ্যবাহী কুস্তিখেলা এবার প্রথমবারের মতো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা শহরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কুস্তিখেলা টিকিয়ে রাখতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আপামর মানুষ।

যুবসমাজকে মাঠে ফেরাতেই এই উদ্যোগ বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। তিনি বলেন, কুস্তিখেলায় বিপুল দর্শকই প্রমাণ করে এর জনপ্রিয়তার কথা। আগামীতে আরো বড় কুস্তিখেলার আসর বসানো হবে।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik