২৭ জুন ২০১৯

কেনার আগেই কৃষকের গোলাশূন্য : ধানের মাপে শুভঙ্করের ফাঁকি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

কেনার আগেই কৃষকের গোলাশূন্য : ধানের মাপে শুভঙ্করের ফাঁকি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক - সংগৃহীত

হাওরের কৃষকদের সারা বছরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল ধান বিক্রির সময় শুভঙ্করের ফাঁকিতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের আগেই কৃষকদের গোলা ধানশূন্য হচ্ছে। তারা নিজস্ব জমিতে ধান চাষ করে শ্রমিকের মজুরি দিয়ে উৎপাদিত ধানে লাভের মুখ দেখছেন না। মহাজনী ঋণ শোধ করতে ধান কাটার সাথে সাথেই উঠান থেকে কম দামে ধান বিক্রি করেন কৃষকেরা। সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরুর আগেই কৃষকেরা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ৫০০-সাড়ে ৫০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন স্থানীয় বেপারীদের কাছে। সরকার নির্ধারিত প্রতিমণ ধান এক হাজার ৪০ টাকা দরে ক্রয়ের কথা জানেন না গ্রামের কৃষকেরা। তারা সংসার চালাতে বৈশাখে উৎপাদিত ধান বিক্রিতে ঠকছেন, আবার কৃষি কাজের সময় জীবন বাঁচাতে চাল কিনতেও। এ যেন শাখের করাতে তাদের জীবন। বহুমুখী সমস্যা, ভোগান্তি ও প্রতারণা যেন পিছু ছাড়ছেনা হাওরবাসীকে।

জেলার পাকনা হাওরের কৃষক আ: মন্নান ও আমীরুল ইসলাম জানান, ৩৩ শতকে এক বিঘা জমিতে বিআর-২৮ ধান চাষ করে বীজ বপন থেকে শুরু করে প্রায় চার হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। চলতি বছর ধান উৎপাদন হয়েছে চার থেকে সর্বোচ্চ ১০ মণ। ধান কাটার সময় শ্রমিকের মজুরি আর ঋণ দিয়ে গড়পরতায় লোকসান হয়েছে। সরকারি ধান সংগ্রহের আগেই ধান মাপার দালাল বা কয়ালরা গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার মণ ধান মাপতে এক ধরনের বিশেষ গণনারীতি ব্যবহার করে। দেশের কোথাও এ ধরনের গণনারীতির প্রচলন নেই। সাধারণ গণনা হতে এ গণনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এ গণনা বুঝা খুবই কষ্টকর। দালালরা ধান মাপার সময় ‘নাক্কা সুরে গলায় ঘ্যান ঘ্যান করে একই সংখ্যা কথায় বার বার বলে একটা ধূম্্রজাল সৃষ্টি করে। কোনো সংখ্যাই তারা স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেন না। ধান মাপার শুরুতেই ‘লাভে রে লাভ, লাভে রে লাভ (এক), দুইয়া, তিনেরে, চাইরো এভাবে ‘নাইশা’ (উনিশ), ‘উনদিশা (ঊনত্রিশ),‘অইনচা (ঊনচল্লিশ), চাইলা (চল্লিশ), পর্যন্ত প্রত্যেকটা সংখ্যার একটা বিকৃত রূপ সৃষ্টি করে জোরে জোরে বার বার তা উচ্চারণ করে। ‘অইনচা (ঊনচল্লিশ) থেকে সহজেই ‘নাইশা (ঊনিশ)’ তে ফিরে আসলে কারো ভুল ধরার উপায় নেই। এমন ভেল্কিবাজি দিয়ে যুগের পর যুগ ধান বিক্রিতে হাওরের সহজ সরল কৃষকেরা প্রতিনিয়তই ঠকছেন।

কৃষক আবুল ফজল বলেন, ধান কেনার দালালরা বিশেষ ধরনের সুরের তালে তালে দাড়িপাল্লা ভরে ঝাঁকি আর ধাক্কা দিয়ে ছন্দে ছন্দে ঢেউ ঢেউ তোলে ধান মেপে বস্তায় ফেলে। কোনো কোনো সময় এক পাল্লায় এক কেজি ধান অতিরিক্ত বেশি নেয়া কোনো ব্যাপারই না। ওজনে বেশি পরিমাণ ধান নেয়ার জন্য তারা বেশি দাম দেয়ার প্রলোভনও দেখায়। প্রতি মণে ২০-৩০ টাকা বেশি দাম দিলেও অতিরিক্ত ধান নিয়ে যায় হয়তো ১০০ টাকার। হাওর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামে গ্রামে ধান ক্রয়-বিক্রয়ে এখনো মান্ধাতার আমলের হাতে মাপা দাঁড়িপাল্লা ব্যবহৃত হয়। কেনার সময় সের এবং বিক্রির সময় কেজি ওজনের পাথর ব্যবহার করা হয়। পাঁচ সের করে ওজনের পাথর দিয়ে হাতে মাপা বিশেষভাবে তৈরি দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ধান মাপা হয়। এ ধান ক্রয়ের সাথে জড়িত এক শ্রেণীর দালাল, যারা স্থানীয়ভাবে ‘কয়াল বা দলাল’ নামে পরিচিত। তারা তাদের অর্ডার করা পাথর দিয়ে ধান মাপেন। এ পাথরের ছিদ্রে ঝালাই দিয়ে লোহা বা সিসা সংযুক্ত করে ওজন বাড়ানোর কথা কৃষকেরা অভিযোগ করেন। কৃষক হারুন মিয়া বলেন, ধান বিক্রির সময় পাল্লার মাঝখানে রশির ভেতর দিয়ে অনেক সময় লোহার রিং পরানো থাকে। ধান মাপার সময় কয়াল-দালাল এ রিং বা রশি হাতের মুঠিতে ধরে চাপ দিয়ে ডাণ্ডা এ দিক ও দিক করে সহজেই ওজনে হেরফের করতে পারে এমন অসংখ্য অভিযোগ কৃষকের মুখে মুখে।
কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, কয়াল-দালালরা এক তালে ‘চল্লিশ পাল্লা বা পাঁচ মণ ধান মাপার পর দৃশ্যমানভাবেই কেজি খানেক ধান অতিরিক্ত নেন। অনেক সময় ‘অইনচা (ঊনচল্লিশ) ছেড়ে ‘অনদিশা (ঊনত্রিশ) চলে আসার দেন দরবার শোনা গেছে। ধান কেনার বেপারির সাথে ‘কয়াল-দালালের দৃশ্যমান চুক্তি হচ্ছেÑ এক মণ ধান মাপে কয়াল-দালালরা দশ টাকা পান। বেশি পরিমাণ ধান দিতে পারলে ‘কয়ালি-দালালের টাকার পরিমাণও বেড়ে যায়। কোন বেপারিই কয়াল-দালাল ছাড়া সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করেন না। দালালরা বেশি দামে ধান কিনে আড়তে কম দামে বিক্রি করলেও ধান ক্রেতার (বেপারির) লাভ থাকে। হাওরের ধান, মৎস্য ও পাথর সম্পদ দিয়েই হাওরবাসী জাতীয় অর্থনীতিতে যে জোগান দেয়, তার আংশিক হাওর উন্নয়নে সঠিকভাবে ব্যবহার হলে হাওরবাসীর অনেক সমস্য সমাধান হতো বলে জানান কৃষকরা। বাংলার শস্য ভাণ্ডার হাওর-ভাটি অঞ্চল সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, সিলেট ও বি.বাড়িয়া জেলা নিয়ে গঠিত প্রায় পাঁচ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। এই হাওর এলাকায় প্রায় দুই কোটি লোক বাস করেন। হাওরে একটি মাত্র ফসল-ধান চাষ হয়। দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ধান এ হাওর এলাকায় উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত ধানের মাত্র এক-দশমাংশ ধান হাওরে ব্যবহৃত হয়। বাকি সব ধান দেশের অন্যত্র, সরবরাহ হয়ে থাকে। শুকনো মওসুমে উৎপাদিত ধান সারা বর্ষা জুড়ে বেপারি (ক্রেতা) কিনে নৌকায় করে দেশব্যাপী সরবরাহ করেন। হাওর অঞ্চলে বড় কোনো গুদাম না থাকায় কৃষকেরা তাদের ধান গুদামজাত করতে পারেন না। ফলে বড়-বড় ধানের বেপারি নৌকা, লঞ্চ কার্গো ভরে হাজার হাজার মণ ধান কিনে আশুগঞ্জ, ভৈরব, মদনগঞ্জ, সিলেটের আড়তে নিয়ে যান। এই ধান, চাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিছু অংশ আবার হাওরে ফিরে আসে। আসা-যাওয়ার দ্বিমুখী খরচ যোগ হয়ে চাল বিক্রি হয় অধিক দামে আর ধান বিক্রি ও চাল কেনা, এ দুই সময়ই কৃষক থাকেন ‘শাখের করাতে’।

ধান কেনার দালাল-কয়াল জব্বার মিয়া বলেন, আমরা মাপে কারচুপি করি না নিয়ম মতোই ধান মাপি। ধান কাটার সাথে সাথে আশুগঞ্জ-ভৈরব, ফতুল্লাসহ বেশ কয়েক জায়গার বেপারী আসে। এ সময় এলাকার কৃষকের হাতে টাকা থাকে না এ কারণে কম দামে ধান বিক্রি করে কৃষকেরা। ভৈরব থেকে আসা ধান কেনার বেপারী রহি উদ্দিন বলেন, আমরা নৌকা-শ্রমিক নিয়ে এলাকায় এসে ধান কিনে বড়-বড় আড়তে দিই, আমাদেরও তেমন লাভ থাকে না। তবে দাঁড়িপাল্লায় ও পাথরে কোনো কারচুপি নেই বলেও জানান তিনি। 

এ দিকে সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সংগঠন ও বিএনপি নেতারা ন্যায্যামূল্যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করতে মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফার কাছে এ বিষয়ে জানতে তার মোবাইল ফোনে বারবার কল দেয়া হলেও বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে মণপ্রতি এক হাজার ৪০ টাকা নির্ধারণ হয়েছে। সরকারিভাবে চিঠি আসার পরই ধান ক্রয় শুরু হয়েছে, কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাজারে যে দামেই ক্রয়-বিক্রয় হয় এতে তাদের করার কিছুই নেই।


আরো সংবাদ