১৭ জুন ২০১৯
সিলেট-২ আসন

'এ আসনে বিএনপির লুনা পাস'

এম ইলিয়াছ আলীর ও তাহসীনা রুশদীর লুনা - ছবি : এএফপি

লাঙ্গলের পক্ষে নেই আ’লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী



সিলেট-২ আসনে (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) ক্ষমতাসীন মহাজোট থেকে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী না থাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের মধ্যে রাজনৈতিক মাঠে দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ্ব থাকলেও এবারের নির্বাচনে মহাজোট থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না দেয়ায় দুই গ্রুপ দ্বন্দ্ব ভুলে একাট্টা হয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছে। এত কিছুর পরও কেন্দ্র থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শান্ত করার কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় তারা ২০১৮ সালের চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনের ব্যাপারে অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। 

লক্ষ করা যাচ্ছে এবার ওসমানীনগরে লাঙ্গলের পক্ষে নেই আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী। দলের মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এ আসনটি হাতছাড়া হবে বলে মন্তব্য করেন। এতে সরকারের বিরোধী বলয়ের প্রার্থী বিএনপির গুম হওয়া নেতা এম ইলিয়াছ আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর লুনা অনেকটা সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা যায়, সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট অনেকটা সমান সমান। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে হিসাব করলে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বেশির ভাগ সময় পাস করেছেন। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় থাকতে জাতীয় পার্টি এ আসনে একবার তাদের প্রার্থীকে পাস করিয়ে নেয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাহ আজিজুর রহমানকে হারিয়ে এ আসনে চমক সৃষ্টি করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিএনপি নেতা এম ইলিয়াছ আলী। সেবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হলে ইলিয়াছ আলী বালাগঞ্জ, ওসমাননীনগর ও বিশ্বনাথে অনেক উন্নয়ন করেন।

পরে দল তাকে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এম ইলিয়াছ আলীকে হারিয়ে এ আসনে নির্বাচিত হন যুক্তরাজ্য ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরী। নির্বাচনের পর শফিকুর রহমান চৌধুরী সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালের একদলীয় নির্বাচনে মহাজোট থেকে জাপা নেতা ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী এহিয়া প্রার্থী হতে চাইলে আওয়ামী লীগ শফিক চৌধুরীকে বাদ দিয়ে ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী এহিয়াকে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দিয়ে এমপি বানায়। নির্বাচনের পর ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী জাপার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।

এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের শফিক চৌধুরী বলয়ের সাথে এমপি ইয়াহইয়ার সম্পর্ক দা-কুমড়া পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সাথে অনেকটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে ইয়াহ্ইয়া চৌধুরীর। এবারের ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট থেকে আসন দাবি করেন তিনি। তিনি ছাড়াও সাবেক এমপি আওয়ামী লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক শফিক চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার চৌধুরীসহ কয়েকজন মনোনয়ন চান। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে সারা দেশে তাদের দলীয় প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হলে সিলেট-২ আসনে দলের কোনো প্রার্থীর নাম আসেনি। এতে ধরেই নেয়া যায় যে এখানে মহাজোট থেকে জাপার প্রার্থী ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী আবার নির্বাচন করবেন।

এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা একজোট হয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কোনো কোনো নেতাকর্মী এমপি ইয়াহ্ইয়াকে গাড়ি চোর বলতেও দ্বিধা করেননি। এত কিছুর পরও তিনি মহাজোটের প্রার্থী হওয়ায় তাকে নিয়ে প্রচার-প্রচারণা ও ভোট চাওয়া বিব্রতকর মনে হওয়ায় নির্বাচন থেকে অনেকটা দূরে রয়েছেন ওসমানীনগর আওয়ামী বলয়ের নেতাকর্মীরা। এক দিকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মান অভিমান, অন্য দিকে নেত্রীর মনোনয়ন মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের হতাশায় ফেলেছে বলে মন্তব্য অনেক নেতাকর্মী। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আমরা লাঙ্গলের পক্ষে নেই। গেল নির্বাচনে সেন্টারে একা একা লাঙ্গলের ওপর সিল মারতে মারতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এমপি বানানোর পর আমরা পাত্তা পাইনি। তাই ওসমানীনগরে এবার লাঙ্গলের জন্য নৌকা ডুবানোর দরকার নেই। এবারের নির্বাচনে সব আসনে তো আর পাস করা যাবে না। কিছু আসন তো বিএনপি পাবেই। তাই এ আসনে বিএনপির লুনা পাস।

উমরপুর ইউনিয়নের আনোয়ার চৌধুরী গ্রুপের এক যুবলীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মনে করেন আমরা এ আসন হারিয়েছি। ২০০৮ সালে এখানে সিটিং এমপিকে বাদ দিয়ে জাপাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এবার উচিত ছিল এ আসন নৌকাকে দেয়া। নৌকা নেই সুতরাং আসনও নেই।’ 

শফিক চৌধুরী গ্রুপের এক যুবলীগ নেতা বলেন, ‘এ আসন নৌকার। আমাদের সাবেক এমপি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। আমরা তো গাড়ি চোর আর চরিত্রহীনের জন্য ভোট চাইতে পারি না।’ 

উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘নির্বাচনে নৌকা নেই তো ভোট দিতে হিসাব আছে। নৌকার মানুষ যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন তাদের নমিনেশন বাতিল হয়েছে। দেখি আপিলে কী হয়। তবে লাঙ্গলে আমি নেই’।


আরো সংবাদ