২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
চীনা পত্রিকার ভাষ্য

কাশ্মির ‘দখল’ : যেসব ক্ষতির মুখে পড়বে ভারত

কাশ্মিরে মোতায়েন ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য - ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির একটি নির্দেশের মাধ্যমে ভারত সরকার দেশের সংবিধানে থাকা ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির বিশেষ মর্যাদা ভোগ করত। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়া দিল্লি জোর করে আন্তর্জাতিকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে স্বীকৃত অঞ্চলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে পরিণত করল। পাকিস্তানের কাছে এটা অগ্রহণযোগ্য এবং দুই দেশের মধ্যে মারাত্মক সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ভারত জম্মু ও কাশ্মিরকে দুটি অংশেও ভাগ করেছে। একটি অংশ হবে লাদাখ, অপরটি হবে জম্মু ও কাশ্মির। লাদাখও কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে পরিচালিত হবে। লাদাখের সাথে চীনা সীমান্ত রয়েছে। এখানকার সীমান্ত এখনো চিহ্নিত হয়নি। ফলে এই সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও প্রভাব বিস্তার করবে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চান একটি শক্তিশালী হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পরিকল্পনা করছিল। মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, জনমিতিক কাঠামো পরিবর্তন করা, এবং সবশেষে অবশিষ্ট ভারতের সাথে পরিপূর্ণভাবে একীভূত করা। মোদি সরকারের বিরোধপূর্ণ কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা পরিবর্তন করার পদক্ষেপটি অভ্যন্তরীণ ও বাইরের উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অভ্যন্তরীণভাবে এই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন মোদি। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের জন্য বিশেষ মর্যাদার জন্য এই অঞ্চলের বাইরের কোনো ভারতীয় সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারতেন না, ভূমি ক্রয় করতে পারতেন না, স্থানীয় সরকারের চাকরি পেতে পারতেন না। আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের উর্বরা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল এই অঞ্চলটি।

জম্মু ও কাশ্মিরে মুসলিমদের প্রাধান্যসূচক অবস্থানে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন মোদি। তিনি বিশ্বাস করছিলেন যে দেশের সাথে রাজ্যটির একীভূত হওয়ার পথে বাধা হতে পারে সংবিধান। বিজেপি ২০১৯ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে বলেছিল, তারা জয়ী হলে বিশেষ মর্যাদা বাতিল করবে। নির্বাচনে বিপুলভাবে তারা জয়ী হয়। ফলে অন্যান্য দলের বাধা দেয়ার কোনো অবস্থা ছিল না।
ভারতের অর্থনৈতিতে ভাটার টানও ভারতের কাশ্মির পদক্ষেপের একটি কারণ। অর্থনীতির সমালোচনা থেকে চোখ ফেরাতেও ভারত এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আর বাইরে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে বেশ ভালো অগ্রগতি হচ্ছে। আফগানিস্তান প্রশ্নে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক উষ্ণ হতে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে বৈঠককালে কাশ্মির প্রশ্ন সমাধানের জন্য মধ্যস্ততার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এতে উদ্বিগ্ন হয়েছে নয়া দিল্লি।
আফগানিস্তান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ভারত। পাকিস্তান যদি আফগানিস্তান সমস্যার সমাধান রতে পারে, তালেবান যদি আফগান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করে তবে আফগানিস্তানে ভারতের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তালেবানের জয় কাশ্মির অঞ্চলে ভারতবিরোধী শক্তিগুলোকে উদ্দীপ্ত করবে।
মোদি সরকারের একতরফা কাশ্মির পদক্ষেপের ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।

শুরুতেই বলা যায়, মোদি সরকারের পদক্ষেপের ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভক্তি বাড়বে, স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে গোলযোগের ঝুঁকি বাড়বে। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা যেভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে তা নীতিমালার লঙ্ঘন। ফলে অন্যান্য দলও এর সমালোচনা করেছে। এতে ভারতের রাজনীতিতে বিভাজন আরো বেড়েছে। মোদি সরকার ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদদের গৃহবন্দী করেছেন। এতে স্থানীয় জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থাবাদের উদয় ঘটে দীর্ঘ স্থায়ী গোলযোগের সৃষ্টি করতে পারে।
কাশ্মির হলো জাতিসঙ্ঘ-স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। ভারতের পদক্ষেপে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করার মানসিকতা প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। মোদি সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাও প্রকাশি পেয়েছে এতে। এর ফলে পাকিস্তান ও চীনের সাথে তার সম্পর্কেও আরো অবনতি ঘটবে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নস্যাৎ হবে।

ভারতের পদক্ষেপে সবচেয়ে বড় ধকল যাবে পাকিস্তানের ওপর দিয়ে। দুই দেশের জাতীয় শক্তির ব্যবধান ও অবনতিশীল অর্থনীতির কারণে পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাত উস্কে দিয়ে বা বাইরের কোনো শক্তির সমর্থন ছাড়া ভারতের সাথে যুদ্ধ করা পাকিস্তানের জন্য অসম্ভব হবে। কিন্তু সে কাশ্মিরের ভারতবিরোধী সশস্ত্র শক্তিগুলৈাকে সমর্থন দিয়ে যাবে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য।

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরকে দুটি ইউনিয়নভুক্ত ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার ফলে চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ নিয়ে ভারত যাতে চীনা ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ চালাতে না পারে চীনকে তা নিশ্চিত করতেই হবে। ১৯৮৮ সালে চীনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সফরের আগে ভারত ঘোষণা করে যে চীনের দক্ষিণ তিব্বত হলো ভারতের অরুনাচল প্রদেশ। এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
ভারত দীর্ঘ দিন ধরে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার আশা করছে। কিন্তু কাশ্মির প্রশ্নে একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কর্তৃত্ব পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছে দেশটি। ফলে দেশটি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনের জন্য দেশটি অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
গ্লোবাল টাইমস

 


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat Paykasa buy Instagram likes Paykwik Hesaplı Krediler Hızlı Krediler paykwik bozdurma tubidy