২২ নভেম্বর ২০১৮

সুদহার নিয়ে ব্যাংকিং খাতে আরেক বিশৃঙ্খলা

সুদহার নিয়ে ব্যাংকিং খাতে আরেক বিশৃঙ্খলা - ছবি : সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে চলছে নানা অরাজকতা ও বিশৃংখলা লুটপাট, খেলাপি ঋণ। রিজার্ভ চুরি আরো কতকি। এর মধ্যে নতুন করে য্ক্তু হয়েছে সুদহার নিয়ে বিশৃঙ্খলা। ব্যাংকঋণের এই সুদহার নিয়ে চাপে পড়ে গেছেন এমডিরা। বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সিদ্ধান্ত কেউ মানছেন, আবার কেউ মানছেন না। যারা মানছেন না তারা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আর যারা মানছেন তাদের আমানত কমে যাচ্ছে। এটা তাদের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এভাবেই ব্যাংকিং খাতে নয়-ছয় সুদ নিয়ে আরেক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএবির সিদ্ধান্ত পরিপালন করেছেন দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের এমন একটি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সাথে সাথে প্রতিনিয়তই কমে যাচ্ছে আমানত। বিপরীতে বাড়ছে ঋণ চাহিদা। তিনি বলেন, বিএবির সিদ্ধান্ত ছিল তিন মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার হবে ৬ শতাংশ। বেশির ভাগ স্বল্পমেয়াদে আমানত রাখে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব আমানতে এত দিন ১০ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেয়া হতো। কিন্তু সুদ নামিয়ে ৬ শতাংশে আনায় অনেক প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক থেকে আমানত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এতে তার আমানত কমে যাচ্ছে। আমানত কমে গেলে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। কারণ, আমানত বেশি হলে বেশি হারে ঋণ দেয়া যায়। এতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়ে। অপর দিকে ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক বেঁধে দেয়া আমানতের অনুপাতের (এডিআর) মধ্যে রাখা যায়। যেমন, প্রচলিত ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত নিলে সাড়ে ৮৩ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত নিলে ৮৯ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারে। এখন বেশির ভাগ ব্যাংকেরই এডিআর বেশি হওয়ায় তারা ঋণ দিতে পারছে না। ফলে অনেকেই আমানত নিয়ে এডিআর কমানোর চেষ্টা করছে। এখন সুদহার কমানোর ফলে আমানত প্রত্যাহার হওয়ায় ঋণ আমানতের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম আরো থেমে যাবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএবির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না এ নিয়ে ত্রিমুখী নজরদারিতে আছে ব্যাংকগুলো। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ নজরদারি করা হচ্ছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। যেসব ব্যাংকের এমডি এখনই ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে অনীহা প্রকাশ করেছেন, তাদের সাথে উচ্চপর্যায় থেকে কথা বলা হয়েছে। এটা অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংককেও অবহিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএবির প থেকেও ব্যাংকের এমডিদের ওপর ঋণের সুদ কমাতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সাথে আলোচনা করতে গত ২ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিদের সাথে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে কয়েকটি ব্যাংকের এমডি ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে এখনই নামিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, ঋণের সুদের হার কমাতে হলে কম সুদে আমানত পেতে হবে। অথচ সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। বাজারে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে কম সুদে আমানত পাওয়া কঠিন হবে। এ কারণে তারা ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য আরো সময় দেয়ার পে মত দেন। ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প থেকে বলা হয়, ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। যত দ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

বৈঠকে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে কয়েকটি ব্যাংকের এমডির ভিন্নমত পোষণের কথা নানা সূত্র থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানাজানি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডিদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য সরকারের ওপর থেকে বলা হয়েছে। সেটি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। ব্যাংকের এমডিদেরও বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়টি তদারকির পাশাপাশি কোন খাতে কিভাবে কমানো যায় সেটিও বিশ্লেষণ করে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে ঋণের চড়া সুদকে অন্যতম দায়ী করা হচ্ছে। নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্েযই ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেও তদারকি করা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে করপোরেট করে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখার বিধান করা হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য ৬ শতাংশ সুদে বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর হিসাবে রাখার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তহবিলের খরচ কমে যাবে। এতে তারা সুদের হার কমাতে পারবে। সরকারি ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যেই ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

এ দিকে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশিÑ এই অজুহাতে এখনো বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেনি। তারা শিল্প মূলধন, সেবা খাতে ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৪ শতাংশে রাখছে। অন্যান্য খাতে সুদের হার আরো বেশি রাখছে। এর সাথে নানা চার্জ, ফি ও কমিশন আরোপ করে সুদের হার আরো ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তারা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া খাতগুলোতে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনছে। এর মধ্যে কৃষি, মসলা চাষ, নারী উদ্যোক্তা, রফতানি ঋণ ইত্যাদি খাতে ঋণের হার সিঙ্গেল ডিজিটে রয়েছে। বাকিগুলোতে ঋণের হার ডাবল ডিজিটেই রয়ে গেছে।


আরো সংবাদ