১৫ নভেম্বর ২০১৮

বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রচারণা শেষ করলেন এরদোগান

বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রচারণা শেষ করলেন এরদোগান। ছবি - সংগৃহীত

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ইস্তাম্বুলে নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যেমে তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান শেষ করেছেন। তিনি দক্ষতার সাথে তুরস্কের প্রায় সব কয়টি বড় শহরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য এসব স্থানে ১২ টি বিশাল গণজমায়েতের আয়োজন করা হয়েছিল।

গত শুক্রবার দুপুর থেকে এরদোগান তুরস্কের এশিয়ান অঞ্চলের কারতাল, মালটেপ, আতসির এবং উসকোদার জেলা শহরগুলোতে নির্বাচনী প্রচারণা চলিয়েছেন। এরপর তিনি তুরস্কের ইউরোপীয় অঞ্চলের সারিয়ের, গাজী ওসমান পাশা এবং বেয়ুগলু জেলা শহরগুলোতে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন।

এরদোগান শনিবারে নির্বাচনী প্রচারণার সময় শেষ হওয়া আগ মুহুর্ত পর্যন্ত প্রচারাভিযান চালিয়ে যান। তিনি ইউরোপীয় সীমান্তঘেষা পশ্চিমাঞ্চলীয় এনেনুর্ট জেলায় নির্বাচনী প্রচরণা শুরু করেন। এরপর প্রতিবেশী বেলেকদুজু জেলায়ও তিনি তার প্রচার প্রাচারণা অব্যাহত রিখেন। এ দুটি অঞ্চলে যখাক্রমে আনুমানিক সাড়ে ৮ লাখ ও ৩ লাখের অধিক লোকের আবাসস্থল। এরপর তিনি নির্বাচনী প্রচারণা নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার পূর্বে আভচিল্লার ও কুকাকাকেকমেস জেলায় প্রচরণা চালন। আর আইইপ জেলায় তার নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করেন।

প্রতিটি সমাবেশই তাৎক্ষণিক হওয়ার পরেও হাজার হাজার মানুষ এসব সমাবেশে যোগদিয়েছিল।

ইস্তানবুল, যেখানে এরদোগান ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশব্যাপী দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।

রবিবার সারা দেশে ৫৬,৩২২,৬২৩ জন নিবন্ধিত ভোটাররা ১৮০,০৬৫ টি ব্যালট বাক্সে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবেন। ভোটগ্রহণ স্থানীয় সময় সকাল ৮.০০টা থেকে শুরু হবে এবং বিকাল ৬.০০ পর্যন্ত চলবে।

 

রজব তাইয়েব এরদোগান কি আগামীকালের সাধারণ নির্বাচনেও তার জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে পারবেন? তুরস্কের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। কিন্তু যখন এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়, তখন আসলে এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। হ্যাঁ, এরদোগান এবারেও জয়ী হবেন। কেননা এরদোগান জনগণের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এবং তার প্রতিশ্রুতিগুলো পূর্ণ করেন। তিনি মানুষের কথা শুনেন। জনগণ ও ভোটারের সাথেও তার সম্পর্ক খুবই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। 

যখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে একজন শক্তিশালী নেতার অভাব অনুভূত হচ্ছিল, ঠিক তখনই প্রভাবশালী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে এগিয়ে আসেন রজব তাইয়েব এরদোগান। অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা উভয় মিলে ধীরে ধীরে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছেন তিনি। ফলে বিরোধীপক্ষের মুখোমুখি হন তিনি বেশ শক্তি-সামর্থ্য নিয়েই। তবে প্রথমেই যে প্রশ্নটি উল্লেখ করা হয়েছে তার পেছনে ভিন্ন কারণ রয়েছে। আসলে প্রশ্ন হচ্ছে, অন্যরা কেন এরদোগানের মতো সফল হচ্ছেন না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পাশ্চাত্যের চশমা দিয়ে তুরস্ককে দেখেন তাদের উচিত ছিল এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় তুরস্কের সামাজিক-রাজনৈতিক দিকটি বিশ্লেষণ করা এবং বিগত পাঁচটি নির্বাচনে যে ফল হয়েছে তার বিপক্ষে অবস্থান না নেয়া। কিন্তু তারা তা না করে কেবল এরদোগান বিরোধী ফ্রন্টকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। 

মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো পাঁচ বছর ধরেই তুরস্কের নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে যারাই এরদোগানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তারা তাদেরকেই সমর্থন করছে। তারা সামাজিক কোনো বিষয়ে নয়, কেবল আদর্শগত বিষয় নিয়েই ব্যস্ত। আর এ কারণেই ‘কেন এরদোগান জিততে থাকবেন এবং তার বিরোধীরা হারতে থাকবে’ এ প্রশ্নটি কেবল কথার কথা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। 

নির্বাচনের এই মুহূর্তে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আশা করছে, মোহাররেম ইনজে নির্বাচনে জয়ী হবেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্চি (সিএইচপি) ইনজেকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত পাঁচ নির্বাচন ধরেই পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো একই জিগির তুলে আসছে, এরদোগান দুর্বল হয়ে পড়ছেন। এবার এরদোগানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন। বিগত পাঁচ নির্বাচনেই এরদোগানের বিরুদ্ধে তাদের সমর্থিত প্রার্থী পাল্টেছে। 

পশ্চিমা গণমাধ্যম এরদোগানকে ব্যর্থ করে দেয়ার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু তারা তুরস্কের সামাজিক পরিস্থিতির পরিপন্থী কাজে জড়িয়ে পড়েছে। এতে তুরস্কের জনগণের মধ্যে এখন পশ্চিমা সংস্কৃতিবিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর এরদোগান খুব সহজেই তুর্কি জনগণের পশ্চিমা বিরোধী মনোভাবের অবসান করতে সক্ষম হতেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, পশ্চিমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক তুরস্ককে আরও বেশি শক্তিশালী ও সুদক্ষ করে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। কিন্তু সেই এরদোগানই ২০০২ সালে মন্তব্য করেন, পশ্চিমাদের সাথে একতরফা নির্ভরতার সম্পর্ক দেশের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর এবং তখন থেকেই তিনি একতরফা নির্ভরশীল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত ১৬ বছরে তুরস্ক এতে অনেকটা সফল হয়েছে। তিনি পশ্চিমাদের থেকে নিজেদের সরিয়ে এনে নিজস্ব অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এরদোগানের নীতির এই গুরুত্বপূর্ণ দিককে অব্যাহতভাবে উপেক্ষা এবং তিনি পশ্চিমাদের থেকে আদর্শিকভাবে পৃথক হয়ে যাচ্ছেন বলে তত্ত্বের আরও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যারা প্রথমে এরদোগানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন তারা হলেন তার তুরস্কের বিরোধীরা। অথচ ২০০৩ সালে তারাই এরদোগানকে পশ্চিমামুখী বলতেন। আর এখন পাশ্চাত্যের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বিষয়ে এরদোগানের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তববাদী ও পুরোপুরি জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালিত।

তুরস্কে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল ২৪ জুন, রোববার। এদিন যদি এরদোগান সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যান, তাহলে তো তিনি জয়ী হবেনই। আর যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান তাহলে ভোট দ্বিতীয় দফায় গড়াতে পারে। আর এ নির্বাচনে এরদোগানই জয়ী হবেন, আর তাহলে পশ্চিমাদের উচিত হবে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, এরদোগানের বাস্তবতাসহ তুরস্ককে মেনে নেয়া। 

উল্লেখ্য, ২৪ জুনের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় জন প্রার্থী। তারা হলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান, সিএইচপির মোহাররেম ইনজে, ইয়ি বা গুড পার্টির মেরাল আকসেনার, কুর্দিশদের এইচডিপির সালাদিন দেমিরতাশ, ভাতান পার্টির ডোগু পেরিনজেক এবং সাদাত পার্টির তেমেল কারামুল্লাউলু। অপর দিকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট এবং কিছু রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এরদোগানের একেপির নেতৃত্বে ‘জুমহুর ইত্তেফাক’ নামক জোটে রয়েছে একে পার্টি, জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপি ও ইসলামিক জাতীয়তাবাদী দল বুয়ুক বির্লিক পার্টি। 


অপর দিকে আতাতুর্কের অনুসারী সিএইচপির নেতৃত্বে ‘মিল্লাতে ইত্তেফাক’ নামক জোটে সিএইচপি, জাতীয়তাবাদী দল থেকে ভেঙে নবগঠিত ইয়ি পার্টি বা গুড পার্টি, তুরস্কের ইসলামপন্থী দল সাদাত পার্টি এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।


আরো সংবাদ